ভূমিকা
বাংলাদেশের কৃষি আবারও এক গুরুতর সারসংকটের মুখোমুখি। কৃষিপ্রধান এই দেশে ফসল উৎপাদনের ব্যয়, কৃষকের আয় এবং দেশের খাদ্যনিরাপত্তা – সবকিছুর সঙ্গে সারের সরবরাহ ও মূল্যের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে দেশে রাসায়নিক সারের ব্যবহার ক্রমাগত বেড়েছে এবং প্রয়োজনের বড় একটি অংশ আমদানিনির্ভর হয়ে পড়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার বিঘ্ন এবং ভূরাজনৈতিক সংঘাতের মতো বহিরাগত কারণের প্রভাব সরাসরি দেশের কৃষকের ওপর পড়ছে। অন্যদিকে, সময়মতো সার না পাওয়া কিংবা বেশি দামে সার কিনতে বাধ্য হওয়া কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে চাষাবাদের সিদ্ধান্তকেও অনিশ্চিত করে তুলছে। তাই বর্তমান সারসংকটকে শুধু সাময়িক সরবরাহের সমস্যা হিসেবে না দেখে এর পেছনে থাকা আমদানিনির্ভরতা, অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহার, দেশীয় উৎপাদনের সীমাবদ্ধতা এবং মাটির দীর্ঘমেয়াদি উর্বরতা হ্রাসের ঝুঁকি – সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা জরুরি।
যাহোক, বাংলাদেশের সার সংকট নতুন কোন বিষয় নয়। ২০০৭ সালে দেশের সার সংকটের কারণ ও সমাধানের পথ অনুসন্ধান করতে গিয়ে অনেক কিছুই জানা গিয়েছিলো। এই অনুসন্ধান করা হয়েছিলো মূলত সেসময় অক্সফাম পরিচালিত “স্থায়িত্বশীল গ্রামীন জীবনযাত্রার জন্য প্রচারাভিযান”-এর অংশ হিসেবে একটি “সামগ্রিক কৃষি সংস্কার কর্মসূচি” প্রণেয়নের কাজে ব্যবহার করার জন্য। প্রায় দুই দশকের ব্যবধানে বর্তমানে হয়তো অবস্থার কিছুটা ঘটেছে। অবশ্য আদৌ কোন পরিবর্তন ঘটেছে কিনা সেটা নিয়ে আরও অনুসন্ধান/গবেষণা আবশ্যক। একটা পরিবর্তনের কথা অবশ্য জেনেছি সেটা হচ্ছে বর্তমানে ডিলার সংখ্যা আগে যেখানে ছিলো এক বা একাধিক ইউনিয়নের জন্য একজন সেই সংখ্যাটা এখন অনেক বেড়েছে। কিন্তু সার সংকটের সমাধান না হয়ে সংকটগুলো ঠিক একই জায়গায় ঘুরপাক খাচ্ছে। কাজেই এই নিবদ্ধটি অদ্যাবধি সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। এমন প্রাসঙ্গিকতা প্রমাণ করে যে, আমরা আমাদের সমস্যার সমাধানে অনিচ্ছুক অথবা অক্ষম। অবশ্য সমস্যাটার ভূক্তভোগী একমাত্র কৃষক, আর সারের সাপ্লাই-চেইনের সাথে জড়িত বাকী সম্ভবত সবাই সুবিধাভোগী। অথচ সার সংকট দেশের খাদ্য নিরাপত্তার সাথে সরাসরি জড়িত। কাজেই সংকটের আদ্যোপান্ত অনুসন্ধান এবং সমস্যাগুলোর আশু সমাধান করা অত্যন্ত জরুরী।
সার সংক্রান্ত সমস্যাসমূহঃ
১. সারের চাহিদা নিরূপন ও বরাদ্দের ক্ষেত্রে সমস্যা
চলমান সার সংকটের একটি অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চাহিদা নিরূপন ও বরাদ্দের ক্ষেত্রে বেশকিছু পদ্ধতিগত ক্রুটি লক্ষ করা যায়। নিন্মে সারের চাহিদা নিরূপন ও বরাদ্দ দেওয়ার পদ্ধতি এবং এসব ক্ষেত্রে যেসব ক্রুটি-বিচ্যুতি সার সংকটকে বাড়িয়ে তুলে তা সংক্ষেপে তুলে ধরা হল।
ক. চাহিদা নিরূপন পদ্ধতি ও তৎসংশ্লিষ্ট সমস্যা
এই চাহিদা নিরূপনের জন্য প্রতি বছর ডিসেম্বর মাসে একটি জরিপ করা হয়। প্রত্যেক উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাকে কৃষকের বাড়ি বাড়ি গিয়ে এই জরিপ করার কথা। কিন্তু বাস্তবতা হল, উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা প্রত্যেক কৃষকের বাড়ি বাড়ি গিয়ে বা সাক্ষাৎকার নিয়ে এই কাজটি করেননা। সাধারণতঃ পূর্ববর্তী বছরের ফসলভিত্তিক জমির যে পরিমান ছিল সেটিকেই অনুমানের ভিত্তিতে হালনাগাত করে জরিপকার্য সমাধা করেন। কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, অধিকাংশ কৃষকই এরূপ কোন জরিপ কখনও হয়েছে কি-না তা জানেন না। পক্ষান্তরে, এটাও বাস্তবতা যে, বেশ কয়েকটি গ্রাম মিলে একটি কৃষি ব্লক গঠিত হয় এবং প্রত্যেক ব্লকের দায়িত্বে নিয়োজিত একজন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার আওতাধীন প্রায় ২০০০-২৫০০ কৃষক পরিবার থাকে। ফলে, উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা সাধারণতঃ যেসব গ্রামে বা যে এলাকায় তার পক্ষে যোগাযোগ করা সহজতর সেখানেই বেশি যাতায়াত করে এবং সময় দেয়। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা এলাকাতেই অবস্থান করেন এবং সপ্তাহে ১ দিন উপজেলা কৃষি অফিসে হাজিরা দেন। তার কাজের মনিটরিং করার ব্যবস্থাও যথেষ্ট নয়। কাজেই তিনি এই জরিপ কাজটি কতটা সঠিকভাবে সমাধান করেন তা বেশিরভাগক্ষেত্রে তার নিজের ইচ্ছা, আন্তরিকতা, সততা ও দায়িত্বশীলতার উপর নির্ভর করে।
একটি ব্লকে নির্দিষ্ট মৌসুমে সম্ভাব্য যে সব ফসল চাষ করা হবে সেসব ফসলের সারের মোট চাহিদা হিসেব করা হয়। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল কর্তৃক প্রণীত ‘ফার্টিলাইজার রিকমেন্ডেশন গাইডে’র মধ্যম ফলন লক্ষ্যমাত্রার জন্য সারের যে সুপারিশ রয়েছে সে অনুযায়ী ফসলভিত্তিক সারের চাহিদা হিসেব করা হয়। কিন্তু বাস্তবতা হল উক্ত সুপারিশ ও কৃষকের সারের ব্যবহারের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য থাকে। সাধারণতঃ কৃষকরা কোন কোন সার (বিশেষ করে ইউরিয়া ও সালফার) প্রদত্ত সুপারিশের চেয়ে অনেক বেশি পরিমান ব্যবহার করেন। কোন সারের কি কাজ সে সম্পর্কে সম্যক ধারণা না থাকার কারণে কৃষকরা সব সারকে এক করে দেখেন। ফলে যেসব সার তুলনামূলকভাবে কম দাম এবং সহজলভ্য সেসব সার অধিক মাত্রায় ব্যবহার করেন। এক্ষেত্রে ইউরিয়া ও সালফার সারের দাম ফসফেট বা পটাশ সারের চেয়ে অনেক কম হওয়ায় কৃষকরা এ দুটি সার অধিক পরিমানে ব্যবহার করেন। কাজেই প্রাক্কলিত চাহিদা ও বাস্তব চাহিদার মধ্যে বিস্তর ব্যবধান বিরাজ করে।
সুতরাং সারের চাহিদা নিরূপনের জন্য পরিচালিত জরিপ থেকে কতটা সঠিকভাবে চাহিদা নিরূপিত হয় তা নিয়ে সন্দেহের যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। তাছাড়া এই জরিপও নিয়মিত হয়না। উল্লেখ্য যে, ঝিনাইদহ জেলায় ‘কৃষক পরিবার সার্ভে’ নামে একটি বিস্তারিত জরিপ হয়েছিল ২০০৭ সালে এবং পূর্ববর্তী জরিপ হয়েছিল ২০০৪ সালে।
খ. সার বরাদ্দের পদ্ধতি ও তৎসংশ্লিষ্ট সমস্যা
সারাদেশ থেকে উপজেলা ও জেলাভিত্তিক সারের যে চাহিদা নির্ধারিত হয় তার ভিত্তিতে কৃষি মন্ত্রণালয় কৃষি ও সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আভ্যন্তরীন বৈঠকের মাধ্যমে ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা, ফসল চাষ এলাকা এবং সারের প্রাপ্যতা অনুসারে চাহিদা পূনর্বিবেচনা ও চূড়ান্ত করে সারের বরাদ্দের জন্য সুপারিশ করে। এই সুপারিশের ভিত্তিতে কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্য এবং অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি এবং কৃষি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান প্রধানদের সমন্বয়ে গঠিত একটি আন্ত-মন্ত্রণালয় কমিটির বৈঠকে জেলাভিত্তিক সারের বরাদ্ধ দেওয়া হয়। দেশীয় ফ্যাক্টরীগুলোর সম্ভাব্য উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা এবং আমদানীর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থসংস্থানের উপর সার বরাদ্দের পরিমান অনেকাংশে নির্ভর করে।
বাস্তবে, অনেক ক্ষেত্রেই চাহিদার তুলনায় বরাদ্দের পরিমান কম থাকে। উদাহরণস্বরূপঃ ২০০৭-০৮ সালে ঝিনাইদহ জেলার ৫৯০০০ মে. টন সারের চাহিদার বিপরীতে বরাদ্ধ দেওয়া হয় ৫৫৫৫০ মে. টন। অন্যদিকে বরাদ্ধ থেকেও কম পরিমাণে সার সরবরাহ করা হয়। উদাহরণস্বরূপঃ ২০০৬-০৭ সালে ঝিনাইদহ জেলার জন্য বরাদ্দকৃত ৫৫০০০ মে. টন সারের বিপরীতে সরবরাহ করা হয় ৫২০০০ মে. টন।
সার বরাদ্দের ক্ষেত্রেও দুর্ণীতি, অনিয়ম ও ক্ষমতার প্রভাব লক্ষ করা যায়। উদাহরণস্বরূপ মাগুরা জেলার সারের চাহিদা ও বরাদ্দের কথা উল্লেখ করা যায়। খোঁজ নিয়ে জানা যায় মাগুরা জেলার অনেক ডিলারের জন্য বরাদ্দকৃত সার উদ্বৃত্ত থেকে যায়। এর কারণ হিসেবে জানা যায় যে, জনাব মাজেদুল হক কৃষি মন্ত্রী থাকাকালে মাগুরা জেলার সারের যে চাহিদা ও বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল তা বাস্তবের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে, মাগুরা জেলার জন্য সেসময়কার অনিয়মকে জায়েজ করতে এবং নিজেদের সুবিধার কথা বিবেচনা করে বর্তমানে দায়িত্বপালনরত কৃষি কর্মকর্তরাও সঠিক চাহিদা নিরূপন না করে পূর্বের চাহিদার সাথে সামঞ্জস্য বজায় রেখেই অদ্যাবধি চাহিদা নিরূপন করে থাকেন। এরূপ অনিয়ম আরও অনেক জেলার ক্ষেত্রেও পাওয়া যাবে।
২. সার সরবরাহ ও মনিটরিং পদ্ধতি এবং তৎসংশ্লিষ্ট সমস্যা
জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি যার সভাপতি দায়িত্ব পালন করেন জেলা প্রশাসক এবং সদস্য সচিবের দায়িত্বে থাকেন উপপরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, জেলা পর্যায়ে বরাদ্ধকৃত সারের বিতরণ কার্যক্রম ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং করে থাকেন। উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি যার সভাপতি ইউএনও ও সদস্য সচিব উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা উপজেলা পর্যায়ে সার বিতরণ কার্যক্রম ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং করে থাকেন।
জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি বিসিআইসির অনুমোদিত ডিলারদের নামে সার বরাদ্ধ দেয়। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় ডিলার সংখ্যা অপ্রতুল। উদাহরণস্বরূপঃ ঝিনাইদহ জেলার ৬ টি উপজেলার ৭৬ টি ইউনিয়নের জন্য এরূপ ৭০ জন ডিলার আছে। ইউনিয়ন সংখ্যার ভিত্তিতে প্রতি উপজেলায় ১০-১৫ জন ডিলার অনুমোদন দেওয়া হয়। ডিলারদের জন্য ইউনিয়ন নির্দিষ্ট করা আছে এবং একজন ডিলার ১ টি বা ২ টি ইউনিয়নে সার বিতরণের দায়িত্ব পালন করে থাকে।
জেলার জন্য বরাদ্ধকৃত সার ডিলারদের মাঝে বন্টন করার ক্ষেত্রে মারাত্নক সমস্যা দেখা যায়। যদিও সব এলাকার সারের চাহিদা সমান নয় কিন্তু কোন ডিলারই সাধারণতঃ কম বরাদ্ধ নিতে রাজি হয়না। যেহেতু সব ডিলারই সমান টাকা (২ লক্ষ টাকা) জমা দিয়ে ডিলারশীপ নেয় তাই সবাই সমান বরাদ্দ দাবী করে ফলে, এই সার বরাদ্দ নিয়ে দলাদলি ও ক্ষমতার লড়াই দেখা যায় যা এমনকি মারামারির ঘটনাও ঘটে থাকে।
সার বরাদ্দপ্রাপ্ত ডিলাররা সরাসরি মিল থেকে সার সংগ্রহ করে নির্দিষ্ট গো-ডাউন-এ স্টোর করে। ইউএনও ও উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এই সার মজুদের হিসাব সরেজমিনে দেখে ডিলারের স্টক রেজিস্টারে প্রত্যয়নপত্রসহ বিক্রীর অনুমোদন দেয়। এছাড়াও প্রতি জেলায় বিসিআইসির নিজস্ব বাফার গো-ডাউন আছে। বরাদ্ধকৃত সারের একটা অংশ এই গো-ডাউনে জমা রাখা হয় যাতে তাৎক্ষণিক সংকট ও জরুরী অবস্থা মোকাবিলা করা যায়। এ সারও সংকটকালীন সময়ে ডিলারদেরকে বরাদ্ধ দেওয়া হয়।
এই ডিলাররা তাদের নিজস্ব প্রতিনিধির মাধ্যমে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার উপস্থিতিতে একটি মাস্টাররোল অনুসারে ইউনিয়নের ২-৫ টি স্পটে বরাদ্দপ্রাপ্ত সার বিক্রী করে থাকে। কোন কৃষক কতটুকু সার পাবে তা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা নির্ধারণ করে দেয়। ঝিনাইদহ জেলায় ২০০৬ সালে কোন জরিপ করা হয়নি বিধায় চেয়ারম্যান-মেম্বারদের স্লিপের ভিত্তিতে সার বিতরণ করা হত কিন্ত এবার (২০০৭ সালে) জরিপ মোতাবেক উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা প্রত্যেক কৃষকের জন্য সার বরাদ্দ দেয় এবং সেমত বন্টন ব্যবস্থা তদারকি করে থাকে।
ফ্যাক্টরী থেকে ইউনিয়ন পর্যায়ে সার পৌছানো পর্যন্ত মনিটরিং ব্যবস্থা জোড়ালো নয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের জনবল, পরিবহন সুবিধা ও লজিস্টিকস-এর অভাব এ জন্য প্রধানতঃ দায়ী।
সরবরাহ পর্যায়ে আরও যেসব সমস্যা দেখা যায় সেগুলো হল-
- বরাদ্দকৃত সার ও বরাদ্দপত্র যথাসময়ে যথাস্থানে পৌছেনা।
- ডিলাররা বরাদ্দপত্র অন্যত্র বেশি দামে বিক্রী করে দেয়। সমান দাম পেলেও ডিলাররা বিক্রী করে দিতে আগ্রহী কারণ এতে তাদের পরিবহন ও বিতরণের ঝামেলা পোহাতে হয়না।
- সময়মত ট্রাক পাওয়া যায়না এবং ভাড়া বেশি নেওয়া হয়।
- পূর্বে একটি ট্রাকে ১৬ টন সার বহন করা হত। কিন্তু যৌথ বাহিনী নামার পর ১০ টনের বেশি নিতে দেয়না। ফলে, পরিবহন খরচ বেশি পড়ে এবং সারের দামও বেড়ে যায়।
- পরিবহন চাঁদাবাজির কারণে সারের মূল্য বেড়ে যায়। সাধারণতঃ পেশাদার চাঁদাবাজ ও ট্রাফিক পুলিশ এরূপ চাঁদাবাজিতে লিপ্ত।
- ডিলাররা পরিবহনে কালক্ষেপন করে থাকে।
- কারখানা থেকে ডেলিভারি পেতে ডিলারকে ২/৩ দিন সিরিয়াল দিয়ে বসে থাকতে হয়।
- অনেক সময় পরিবহন খরচ কমানোর জন্য ট্রাকে না এনে নদীপথে আনে ফলে সময় বেশি লাগে।
- ফ্যাক্টরী থেকে যে বস্তায় সার সরবরাহ করা হয় ডিলাররা অনেক সময় তা রিপ্যাকিং করে। এসময় সারের সাথে ভেজাল দ্রব্য মেশানো হয় এবং ওজনে কম দেওয়া হয়।
- নিয়মানুযায়ি প্রত্যেক ডিলারকে সারের মূল্য তালিকা তার বিক্রয়কেন্দ্রে প্রদর্শনের কথা যা তারা কখনও করেনা।
- বর্তমানে সার বিতরণের একমাত্র এজেন্ট হল ডিলার। কিছু কিছু ক্ষেত্রে তারা কিছুসংখ্যক প্রতিনিধির মাধ্যমে সার বিতরণ করলেও এসব প্রতিনিধি নির্বাচন সম্পূর্ণভাবে তার ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল। পূর্বের খুচরা বিক্রেতারা ছিল মূলতঃ ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারী কিন্তু এসব প্রতিনিধি সাধারণতঃ ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারী নয়। খুচরা বিক্রেতারা কৃষককে মৌসুমে বাকীতে সার দিত কিন্তু এরা তা দেয়না। ফলে, গরীব কৃষকের পক্ষে সার কেনা খুব কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ গরীব কৃষকের পক্ষে নগদ টাকা জোগাড় করা কঠিন।
- ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা বিত্তবান মানুষেরা সহজে সার পেলেও দরিদ্র ও নিরীহ কৃষকদের পক্ষে সার পাওয়া অত্যন্ত কঠিন।
৩. সার উৎপাদনের ক্ষেত্রে সমস্যাঃ
বর্তমানে বাংলাদেশ রসায়ন শিল্প সংস্থার অধীন ৭ টি সার কারখানা (৬ টি ইউরিয়া ও ১ টি টিএসপি কারখানা) এবং যৌথভাবে পরিচালিত কর্ণফুলি ফর্টিলাইজার কোম্পানি থেকে রাসায়নিক সার উৎপাদিত হচ্ছে যা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। ২০০৪-০৫ সালে প্রায় ২২.৪৩ লাখ মে.টন সার উৎপাদিত হয়। এখানে লক্ষনীয় যে, সারের ক্রমবর্ধমান চাহিদা ও সংকট সত্ত্বেও ১৯৯৫-৯৬ সাল পর্যন্ত সারের উৎপাদন বাড়লেও বর্তমনে তা ক্রমহ্রাসমান যা দেশের সার সংকটকে ভবিষ্যতে আরও তীব্র করে তোলার ইঙ্গিত বহন করে। কারণ, বহুল কথিত মুক্তবাজারে সারের মূল্য লাগামহীনভাবে বেড়ে যাবে এতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু কৃষকের ক্রয়ক্ষমতার অভাবে একদিকে যেমন কৃষি উৎপাদন ব্যহত হবে অন্যদিকে কৃষকের জীবন-জীবিকা মারাত্নক হুমকির মধ্যে পড়বে। অথচ, যে ইউরিয়া ও ফসফেট সারের সংকট সবচেয়ে তীব্র সে দুটি সারই বাংলাদেশে তৈরির যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। ইউরিয়া তৈরির কাাঁচামাল প্রাকৃতিক গ্যাস আমাদের রয়েছে। অথচ, গ্যাস রপ্তানি নিয়ে যতটা মাথা ঘামানো হচ্ছে তার ছিটেফোটাও হচ্ছেনা এই গ্যাস ব্যবহার করে ইউরিয়া সার উৎপাদন করার ক্ষেত্রে। আন্তর্জাতিক বাজারে ইউরিয়া সারের বস্তাপ্রতি মূল্য যেখানে প্রায় ৮০০ টাকা সেখানে এদেশের কারখানায় তার উৎপাদন খরচ পড়ে মাত্র ৪০০ টাকা।
৪. আমদানির ক্ষেত্রে সমস্যাঃ
১৯৯৫-৯৬ সাল পর্যন্ত সার আমদানী সীমিত আকারে থাকলেও বর্তমানে তা অত্যন্ত দ্রুত হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এসময়কালে সারের আমদানী দ্বিগুনেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। সার আমদানির ক্ষেত্রেও নানাবিধ সমস্যা বিরাজমান যা সার সংকটের জন্য অনেকাংশে দায়ী। এসব সমস্যার মধ্যে রয়েছে –
- সারের আন্তর্জাতিক বাজার মূল্যের চরম অস্থিতিশীলতা।

- পরিমান নির্ধারণে সিদ্ধান্তহীনতা ও দীর্ঘসুত্রিতা।
- এলসি’র ক্লিয়ারেন্স সময়মত না পাওয়া।
- রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বন্দর সমস্যার কারণে শিপমেন্ট সময়মত না হওয়া।
- আমদানিকারক নির্বাচনে স্বজনপ্রীতি ও অস্বচ্ছতা। কিছু অসাধু আমলা আমদানিকারকদের সাথে যোগসাজস করে আমদানির কোটায় কারচুপি করে টাকা হাতিয়ে নেয়।
- ভেজাল ও নিন্মমানের সার আমদানি। শিল্পবর্জ্যকেও সার হিসেবে আমদানির অনেক নজির আছে। যেমনঃ ২০০২ সালে মার্কিন যুক্তরাস্ট্র থেকে একটি শিল্পবর্জ্যকে পটাশ সার হিসেবে আমদানি করা হয়। এ সার মাটিতে দিলে ফসল পুড়ে যেত। ঔসময় এটি নিয়ে ব্যাপক লেখালেখি ও প্রতিবাদের মুখে আমদানি বাতিল করা হয়। পরবর্তীতে ২০০৫ সালে চীন থেকে একটি শিল্পবর্জ্যকে ডিফিউজড ম্যাগনেশিয়াম ফসফেট সার নামে আমদানি ও বাজারজাত করা হয়। এ সার জমিতে প্রয়োগ করার পর ৬ মাসেরও অধিক সময় ধরে পাথরের মত অবিকৃত থাকতে দেখা গেছে। এটি নিয়েও তখন ব্যাপক প্রতিবাদের মুখে এর আমদানি বাতিল করতে বাধ্য হয় সরকার।
৫. সার বিতরণের ক্ষেত্রে সমস্যাঃ
- বর্তমান ডিলারশিপ ব্যবস্থায গুটিকয় ডিলারদের একচেটিয়া মুনাফা লাভের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। পক্ষান্তরে, লাখ লাথ খুচরা বিক্রেতার ব্যবসা বন্ধ হওয়ার ফলে তাদের উপার্জনের পথও রুদ্ধ হয়ে গেছে যা তাদেও জীবন জীবিকার উপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে।
- অনেকসময় ডিলাররা বেশি পরিবহন খরচের দোহাই দিয়ে সারের দাম বাড়িয়ে দেয়।
- অনেকসময় ডিলাররা সিন্ডিকেট করে সারের দাম বাড়িয়ে দেয়। এক্ষেত্রে প্রতিযোগিতার সুযোগ না থাকায় তারা এ সুযোগ পাচ্ছে।
- জেলা ও উপজেলাভিত্তিক সারের যে বরাদ্দ দেওয়া হয় তা অন্য জেলা ও উপজেলায় স্থানান্তর নিষিদ্ধ। ফলে, দেখা যায় কোথাও সার উদ্বৃত্ব থাকছে আবার কোথাও সারের তীব্র সংকট সৃষ্টি হচ্ছে। অথচ উদ্বৃত সার স্থানান্তরের সুযোগ নেই।
- কৃষকের কাছাকাছি ডিলার বা খুচরা বিক্রেতা নেই ফলে কৃষককে সার সংগ্রহ করতে প্রচুর সময়, শ্রম ও অর্থ ব্যয় করতে হয়।
- ধর্মঘট ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে সময়মত সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটে।
- আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সময়মত সার সরবরাহ হয়না। যেমনঃ জেলাভিত্তিক সার বরাদ্দের চিঠি কারখানায় সময়মত পৌছেনা ফলে ডিলাররা হয়রানির শিকার হয়।
- মিলের সাথে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ের অভাব, কারখানার সার সরবরাহ করতে পারবে কি-না তা না জেনেই অনেক সময় চিঠি দেওয়া হয় তখন অন্য মিলে চিঠি স্থানান্তর করতে হয়, এতে সময় নষ্ট হয়।
- পরিবহন ধর্মঘট বা সংকটের কারণে অনেক সময় সঠিক সময়ে সার সরবরাহ করা সম্ভব হয়না।
- তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় পরিবহন ভাড়া বেড়ে যায় ফলে সারের মূল্যও বেড়ে যায়।
- পূর্বে ১ ট্রাকে ১৫/১৬ টন বহন করত এখন যৌথ বাহিনী ১০ টনের বেশি বহন করতে দেয়না এতে পরিবহন ব্যয় বেশি হয় এবং ট্রাকেরও সংকট দেখা দেয়।
সার বিতরণের সমস্যা দূর করার জন্য সরকার কার্ড সিস্টেম চালু করার উদ্যোগ গ্রহন করেছে। যেভাবে এই সিস্টেমটি চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তাতে কিছু সুবিধা নিঃসন্দেহে পাওয়া যাবে তবে যথেষ্ট অসুবিধাও সৃষ্টি হবে। যেমন-
সুবিধাঃ
- চাহিদা নিরূপন সহজতর ও সুবিধাজনক হবে।
- প্রকৃত কৃষক চিহ্নিত হবে।
- চাহিদা ও সরবরাহের তথ্য পাওয়া যাবে।
- সারের ভর্তুকী সরাসরি কৃষকের হতে পৌছার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
অসুবিধাঃ
- বিতরণ ব্যবস্থা আরও জটিল হবে। কারণ, অশিক্ষিত কৃষকের পক্ষে তথ্য সংরক্ষণ করা সহজ হবেনা।
- ডিলারের কাজ বেড়ে যাবে। কার্ড হারানো, নতুন কার্ড ইস্যু ইত্যাদি জটিলতা বাড়বে। ফলে, দরিদ্র কৃষক নানাবিধ সংকটে পড়বে।
- উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার দাপ্তরিক কাজ বেড়ে যাবে ফলে তাদের দেয় সেবার মান বর্তমানের চেয়েও কমে যাবে।
- ফসল চাষের হিসাব সঠিক হওয়ার সম্ভাবনা কম।
- তাৎক্ষণিক প্রয়োজনে ফসল চাষের সিদ্ধান্ত্র পরিবর্তন করার ক্ষেত্রে কৃষক সমস্যায় পড়বে।
৬. কৃষক পর্যায়ে সমস্যা
- ইউরিয়া সার সাধারণতঃ পুরু মৌসুমে তিনবারে প্রয়োগ করা হয়। ফসলের বিভিন্ন স্তরে সারের চাহিদা অনুসারে সারের বরাদ্দ দেওয়া ও বিতরণ করা হয়। কিন্তু কৃষকের সাধারণ প্রবণতা হল তারা সময়মত সার পাবে কি-না এই দুশ্চিন্তা থেকে এবং বার বার সার সংগ্রহের ঝামেলা এড়াতে ও সময় বাচাতে পুরু মৌসুমের জন্য প্রয়োজনীয় সব সার একসাথে সংগ্রহ করতে চায়। ফলে, একটি নির্দিষ্ট সময়ে সারের বরাদ্দের সাথে কৃষকের চাহিদার বিস্তর ব্যবধান তৈরি হয়। তাছাড়া, এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তিরা বিশেষকরে বড় কৃষক ও অনুপস্থিত কৃষকরা (যারা নিজেরা চাষ করেনা) সাধারণতঃ তাদের প্রাপ্য সারের চেয়ে অনেক বেশি এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে পুরু মৌসুমের জন্য প্রয়োজনীয় সব সার মজুত করে। ফলে, দরিদ্র ও ক্ষুদ্র কৃষকরাই সাধারণতঃ সার থেকে বঞ্চিত হয়।
- ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক যাদের জমির পরিমান খুবই কম তাদের পক্ষে সার সংগ্রহ করা সবচেয়ে কঠিন। কারণ যেহেতু তাদের সারের চাহিদা কম তাই অল্প পরিমান সার সংগ্রহের জন্য তারা সাধারণতঃ ডিলারের কাছে গুরুত্ব পায়না। ডিলাররা যেহেতু প্রভাবশালী সুতরাং তাদের সার পাওয়া না পাওয়া ডিলারের মর্জিও উপর নির্ভর করে।
- কৃষক ঘন্টার পর ঘন্টা লাইনে দাড়িয়ে থেকে সার সংগ্রহ করে খুচরা দোকানদারদের হাতে তুলে দিয়ে সেই সার বেশী মূল্যে বাকীতে কিনে নিয়ে যায়। কারণ, নগদে সার কেনার মত টাকা কৃষকের হাতে থাকেনা।
- খুচরা সার বিক্রেতারা কৃষককে ভাড়া করে সার সংগ্রহ করে কৃষকদের কাছেই বেশি দামে বিক্রী করে।
- নকল ও ভেজাল সার কিনে কৃষকরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, জমিও নষ্ট হচ্ছে।
৭. সার সংক্রান্ত নীতিমালা ও আইনকানুনগত সমস্যা
- সার সাংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ কোন নীতিমালা নেই। কিছু এ্যাক্ট ও রুলস এর ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম চলছে যা যথেষ্ট নয়।
- ফার্টিলাইজার এ্যাক্ট ২০০৬-এ সার মজুদের মেয়াদকাল নির্দিষ্ট করা নেই। তাছাড়া, দীর্ঘ সময় মজুদ রাখার কারণে সারের মানের অবনতি ঘটলে তার জন্য শাস্তির বিধানও নেই।
- কোন ডিলার বা খুচরা বিক্রেতা বা পরিবেশকের নিকট ভেজাল বা নিন্মমানের বা কম ওজনের সার পাওয়া গেলে সেই সারের উৎপাদনকারী বা আমদানীকারকের রিরূদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি অষ্পষ্ট, জটিল এবং বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই অকার্যকর। ফলে, ভেজাল বা নিন্মমানের বা কম ওজনের সার উৎপাদন, বিপণন ও বিক্রয় রোধ করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষে প্রায় ক্ষেত্রেই সম্ভব হয়না।
- পরিদর্শক কোন ডিলার বা কারখানার মালিককে অভিযুক্ত করে মামলা করা হলে সে মামলা কার্যকরী হয়না। কারণ, মামলা পরিচালনার জন্য উকিল নিয়োগের জন্য কোন বাজেট বরাদ্ধ নেই। তাছাড়া আদালত কর্তৃক পরিদর্শককে সাধারণতঃ সাক্ষ্য গ্রহনের জন্য ডাকা হয়না ফলে মামলার মেরিট থাকেনা এবং মামলা তামাদি হয়ে যায়।
- সাধারণতঃ আসামিরা বিত্তশালী হওয়ায় মামলা স্তানান্তর করে উচ্চ আদালতে নিয়ে যায় ফলে বাদীর পক্ষে মামলা পরিচালনা করা সম্ভব হয়না।
- থানা থেকে চার্জশীট দিতে দীর্ঘ সময় নেয়। তাছাড়া, ঘুষ ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সার সংক্রান্ত অপরাধ করেও আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে অপরাধীরা বেড়িয়ে যায়।
৮. ভর্তুকী সংক্রান্ত সমস্যা
সারের ক্ষেত্রে যে ভর্তুকী দেওয়া হয় তার সুফল কৃষকের কাছে পৌছায় না। ২০০৭ সালে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত প্রতিবস্তা ইউরিয়া সারের উৎপাদন খরচ পড়ে প্রায় ৪০০ টাকা যা সরকার বিক্রী করে ২৪০ টাকায়। অর্থাৎ বস্তাপ্রতি প্রায় ১৬০ টাকা (টন প্রতি ৩২০০ টাকা) ভর্তুকী দেওয়া হয়। অন্যদিকে, আমদানিকৃত ইউরিয়া সারে বস্তাপ্রতি ৫৬০ টাকা (টন প্রতি ১১২০০ টাকা) ভর্তুকী দেওয়া হয় যাতে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সারের সমান দরে বিক্রয় করা যায়। অথচ সে সার কৃষককে ৩৫০-৪০০ টাকায় কিনতে হয়। শুধু তাই নয়, আমদানি মূল্য বেশি দেখিয়েও আমদানিকারকরা প্রচুর টাকা হাতিয়ে নেয়। ২০০৫ ও ২০০৬ সালে এরূপ ঘটনার খবর পত্র-পত্রিকায় প্রচুর দেখা যায়। অর্থাৎ ভর্তুকীর সুফল পাচ্ছে মূলতঃ আমদানিকারক ও ডিলাররা।
৯. সারের মূল্য সংক্রান্ত সমস্যাঃ
- আমদানি নির্ভরতা সারের উচ্চমূল্যের একটি বড় কারণ। আন্তর্জাতিক বাজার মূল্যের অস্থিতিশীলতা এবং সরকারি মনিটরিং ব্যবস্থার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে আমদানিকারক ও ডিলাররা সারের মূল্য ইচ্ছামত বাড়িযে দেয়। গত তিন বছর ধরে যে টিএসপি সারের মূল্য বস্তাপ্রতি ৬৫০-৭৮৫ টাকা ছিল এ মাসেই তা অবিশ্বাস্যভাবে বেড়ে দাড়িয়েছে ১২০০-১৫০০ টাকা। হঠাৎ করে এরূপ মূল্য বৃদ্ধির কোন যৌক্তিক কারণ ছিলনা।
- ডিলাররা বরাদ্দের সব সার কৃষকের মাঝে বিতরণ না করে বেশি দামে বাইরে বিক্রী করে দেয়। খুচরা বিক্রেতারা এ সার ইচ্ছেমত উচ্চমূল্যে বিক্রী করে। ডিলারের কাছ থেকে সার না পেয়ে কৃষকরা উচ্চমূল্যে এই সার কিনতে বাধ্য হয়।
- ডিজেলের মূল্য বৃদ্ধির কারণে পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় সারের মূল্য বেড়ে যায়।
সমস্যা সমাধানের জন্য কিছু সুপারিশ
- সার সংক্রান্ত একটি পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা প্রয়োজন যেখানে জৈব সারকেও অত্যাবশ্যক সার হিসেবে বিবেচনা করে এর উৎপাদন ও ব্যবহার বৃদ্ধির সুষ্পস্ট দিকনির্দেশনা থাকবে। জৈব সারের উৎপাদন বৃদ্ধি ও ব্যবহারে সরকারকে ব্যাপক উদ্যোগ নিতে হবে, বিনিয়োগ করতে হবে এবং প্রনোদনা দিতে হবে। রাসায়নিক সারের সাথে জৈব সারের ব্যবহারকে বাধ্যতামূলক করতে হবে।
- দেশে সারের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য নতুন নতুন কারখানা স্থাপন করা। পাশাপাশি পুরাতন কারখানাগুলোর অত্যন্ত পুরনো ও ক্রুটিপূর্ণ যন্ত্রপাতিগুলো প্রতিস্থাপন ও সময়মত মেরামতের উদ্যোগ গ্রহন করা।
- সারের চাহিদা নিরূপন সঠিকভাবে করার জন্য আরও লোকবলসহ সঠিকভাবে জরিপকাজ পরিচালনা করতে হবে।
- ডিলারের বর্তমান সংখ্যা আরও বৃদ্ধি করতে হবে। প্রতিবছর একই ডিলার সার সরবরাহ করলে একচেটিয়া বাজার নিয়ন্ত্রণের কারণে তার স্বেচ্ছাচারি হয়ে উঠার সুযোগ তৈরি হয়। তাই, প্রত্যেক গ্রামে সৎ ও দক্ষ ব্যবসায়িদের নিয়ে ৮/১০ জন ডিলারের একটি প্যানেল তৈরি করতে হবে যারা বছরানুক্রমে সার সরবরাহ করবে। ডিলারশীপের জন্য সিকিউরিটি মানির পরিমান আরও কমাতে হবে যাতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও ডিলারশীপ পেতে পারে।
- ডিলারদের সার সংগ্রহ ও বিতরণ ব্যবস্থা কঠোরভাবে মনিটরিং এবং কোন অনিয়মের জন্য তাৎক্ষণিক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
- খুচরা বিক্রয় ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন যাতে কৃষক প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে হাতের কাছে সার পায়। তবে, পাশাপাশি মনিটরিং ব্যবস্থা জোড়দার করা প্রয়োজন। এই মনিটরিং ব্যবস্থা উৎপাদন ও আমদানি থেকে শুরু করে কৃষকের হাতে পৌছানো পর্যন্ত সর্বক্ষেত্রে প্রয়োজন।
- সারে দেয় ভর্তুকী সরাসরি কৃষককে দেওয়া প্রয়োজন।
- সারের পর্যাপ্ত মজুদসহ প্রত্যেক জেলায় অন্ততঃ একটি করে বাফার গো-ডাউন স্থাপন করা প্রয়োজন।
- কার্ড পদ্ধতি যেটা চালু করা হচ্ছে সেটি আরও সময় নিয়ে এবং সঠিকভাবে জরিপকার্য সমাধা করে নিয়ে তারপর করা উচিত।
- সর্বেপরি ঘুষ, দুণীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ইত্যাদি দূর করতে হবে।
