কৃষি ও রবীন্দ্রনাথ

কৃষি ও রবীন্দ্রনাথ

“তোরা যে যাই বলিস ভাই, আমার সোনার হরিণ চাই।”
“গ্রামছাড়া ওই রাঙামাটির পথেই হেঁটে যেতে চাই।”

আমাদের সৌভাগ্য যে, কবিগুরু, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন আমাদেরই বঙ্গদেশের কবি। তাঁর লেখা অসাধারণ সব কবিতা, গল্প, প্রবন্ধের মর্মার্থ পুরোপুরি না বুঝলেও সেগুলো পড়ার অবারিত সুযোগ আমাদের আছে। তাঁর অসংখ্য অসাধারণ গানগুলোর মর্মকথা হৃদয়ঙ্গম করতে না পারলেও কারণে-অকারণে সেগুলো শুনি—আর তাঁর সুর ও কথার দোলায় আমার হৃদয়ও দুলে ওঠে।

কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য হলো, শতবর্ষ পরেও আমরা তাঁর কবিতা পড়ি, গান শুনি, অথচ তাঁর অনেক গভীর ভাবনা হৃদয়ঙ্গম করতে পারি না। তাঁর দুর্লভ চিন্তাগুলো জানতে চাই না; আর সেগুলোকে কাজে লাগানোর কথা তো আরও দূরের।

আমরা জানতে চাই না তাঁর কৃষিভাবনা, পল্লীভাবনা ও সমবায় ভাবনা সম্পর্কে—যে ভাবনার কেন্দ্রে ছিল দেশের দরিদ্র কৃষক ও গ্রামীণ মানুষের উন্নয়ন, আত্মনির্ভরতা ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন।

রবীন্দ্রনাথ কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নে সমবায়কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে দেখেছিলেন। শিলাইদহ-পতিসর ও পরে শ্রীনিকেতনের কর্মযজ্ঞে তিনি কৃষি, শিক্ষা, ঋণ, স্বাস্থ্য, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং গ্রামীণ সংগঠনকে একটি সমন্বিত উন্নয়নচিন্তার অংশ হিসেবে দেখেছিলেন। সমবায়ের ধারণা ও প্রয়োগ সম্পর্কে তিনি ইউরোপ ও আমেরিকার অভিজ্ঞতা থেকেও শিক্ষা নিয়েছিলেন। কৃষকদের ঋণনির্ভরতা ও মহাজনী শোষণ থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে কৃষি ব্যাংক ও সমবায়ভিত্তিক উদ্যোগসহ যে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা তিনি করেছিলেন, তার অন্তর্নিহিত দর্শন আজও বিস্ময়করভাবে প্রাসঙ্গিক।

রবীন্দ্রনাথের এই পল্লী ও সমবায় ভাবনার সঙ্গে পরবর্তী সময়ে আখতার হামিদ খানের কুমিল্লা মডেলের কিছু গুরুত্বপূর্ণ সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। কুমিল্লা মডেল অবশ্য সরাসরি রবীন্দ্রনাথের ভাবনারই সম্প্রসারণ—এমন সরল দাবি করা ঠিক হবে না। কিন্তু কৃষক সংগঠন, সমবায়, স্থানীয় প্রতিষ্ঠান, প্রশিক্ষণ ও উৎপাদন বৃদ্ধিকে একসঙ্গে নিয়ে গ্রামীণ উন্নয়নের যে প্রয়াস আখতার হামিদ খান করেছিলেন, তার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের পল্লী পুনর্গঠন ভাবনার একটি তাৎপর্যপূর্ণ সাদৃশ্য অবশ্যই আছে।

পরবর্তী সময়ে কুমিল্লা মডেল মূলত আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ও উৎপাদন বৃদ্ধির একটি কার্যকর সম্প্রসারণ কৌশল হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে। এর মাধ্যমে উচ্চফলনশীল জাত, সেচ, রাসায়নিক সারসহ সবুজ বিপ্লবের প্রযুক্তি কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়েছিল। ফলে বাংলাদেশের কৃষির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে এর ভূমিকা অস্বীকার করার উপায় নেই।

হয়তো তখন সেটাই প্রয়োজন ছিল।
হয়তো বলছি কেন—প্রয়োজনীয় ছিল বৈকি।

কারণ, তখন ম্যালথাসের জনসংখ্যা তত্ত্বকে ঘিরে বিজ্ঞানী ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ছিল। খাদ্যসংকট ও দুর্ভিক্ষ ছিল নিত্যদিনের বাস্তবতা। খাদ্যকে কেন্দ্র করে রাজনীতি, সংঘাত ও যুদ্ধবিগ্রহও ছিল প্রবল। এর পেছনে ঔপনিবেশিক শোষণ ও সম্পদ লুণ্ঠনের ভূমিকা যে ছিল, অমর্ত্য সেনের গবেষণাসহ পরবর্তী বহু গবেষণা আমাদের তা আরও পরিষ্কার করে দেখিয়েছে।

এমন এক প্রেক্ষাপটে নরম্যান বোরলগের উচ্চফলনশীল, খাটো জাতের গম উন্নয়ন যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা করে। ১৯৬০-এর দশকে এই প্রযুক্তি ভারত ও পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং খাদ্য উৎপাদন নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়। ১৯৭০ সালে বোরলগ সবুজ বিপ্লবের মাধ্যমে বিশ্ব খাদ্য উৎপাদনে অবদানের জন্য নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন।

সবুজ বিপ্লবের পেছনে শুধু একজন বিজ্ঞানীর আবিষ্কার নয়—গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং Rockefeller Foundation-এর মতো প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ও ভূমিকা ছিল। বোরলগ নিজেও তাঁর কাজকে একটি বৃহত্তর বৈজ্ঞানিক দলের সম্মিলিত প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দেখেছেন।

তখন খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো ছিল মানবসভ্যতার এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। তাই সবুজ বিপ্লবকে শুধু কর্পোরেট স্বার্থের চোখে দেখলে এর ঐতিহাসিক প্রয়োজনীয়তা ও অর্জনকে খাটো করা হবে। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও অস্বীকার করার উপায় নেই যে, উৎপাদন বৃদ্ধির এই মডেলের সঙ্গে কৃষি উপকরণ, বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ ও যন্ত্রপাতির একটি বিশাল বাণিজ্যিক বাজারও গড়ে উঠেছে।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ক্ষুদ্রঋণ যেমন দরিদ্র মানুষের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির একটি শক্তিশালী মডেল হিসেবে বিশ্বব্যাপী পরিচিত হয়েছে, তেমনি এর বাজারগত ও সামাজিক প্রভাব নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। একইভাবে সবুজ বিপ্লব খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও কৃষকের প্রকৃত উন্নয়ন, পরিবেশগত স্থায়িত্ব এবং কৃষি-বাণিজ্যের সম্প্রসারণ—এই তিনটি বিষয়কে একই পাল্লায় মাপা যায় না।

আমি আসলে বলছিলাম কবিগুরুর কৃষিভাবনার কথা।

রবীন্দ্রনাথ তাঁর সময়ের কৃষকের দুরবস্থা দেখেছিলেন খুব কাছ থেকে। তিনি বুঝেছিলেন, শুধু উৎপাদন বাড়ালেই কৃষকের মুক্তি হবে না। কৃষকের সংগঠন দরকার, শিক্ষা দরকার, সুলভ ঋণ দরকার, স্থানীয় নেতৃত্ব দরকার, সমবায় দরকার এবং সর্বোপরি দরকার নিজের শক্তির ওপর দাঁড়ানোর সক্ষমতা।

এখানেই রবীন্দ্রনাথ আজও আমাদের জন্য প্রাসঙ্গিক।

তিনি যদি আজ বেঁচে থাকতেন, তাহলে নিশ্চয়ই কৃষির উৎপাদন বৃদ্ধির প্রয়োজন অস্বীকার করতেন না। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি প্রশ্ন করতেন—এই উৎপাদন কার জন্য? কৃষক কতটা লাভবান হচ্ছে? মাটি ও পানি কতটা নিরাপদ থাকছে? কৃষকের স্বাধীনতা কতটা বাড়ছে? গ্রাম ও প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কোথায় গিয়ে দাঁড়াচ্ছে?

আজ আমরা কৃষিকে এমন এক ব্যবস্থার দিকে ঠেলে দিয়েছি যেখানে কৃষি উপকরণ ও প্রযুক্তির বাজার ক্রমেই বড় হচ্ছে, কিন্তু কৃষকের স্বাধীনতা ও আয় সবসময় সেই অনুপাতে বাড়ছে না। এমনকি অনেক দেশে নিষিদ্ধ বা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত কৃষি রাসায়নিকও আমাদের বাজারে সহজলভ্য।

কাজেই প্রশ্ন হলো—আমরা কি কৃষি উন্নয়ন নিয়ে কয়েক বছর, কয়েক দশক, কয়েক শতাব্দী বা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা ভাবছি? নাকি শুধু আজকের উৎপাদন, আজকের বাজার এবং আশু লাভের কথা ভাবছি?

আমার দৃঢ় বিশ্বাস, রবীন্দ্রনাথ আজ বেঁচে থাকলে তিনি কৃষির উৎপাদন বৃদ্ধির বিরুদ্ধে নয়, কৃষিকে তার প্রকৃতি, কৃষক ও মানুষের জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলার বিরুদ্ধে দাঁড়াতেন।

তিনি হয়তো আবার আমাদের মনে করিয়ে দিতেন—গ্রামকে উন্নত করতে হবে, কিন্তু গ্রামকে ধ্বংস করে নয়; কৃষিকে আধুনিক করতে হবে, কিন্তু কৃষককে তার নিজের জমিতে পরাধীন করে নয়; উৎপাদন বাড়াতে হবে, কিন্তু মাটি, পানি, জীববৈচিত্র্য ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বন্ধক রেখে নয়।

আর তাই আজ কবিগুরুর প্রয়াণ দিবসে তাঁকে স্মরণ করার সবচেয়ে বড় উপায় হয়তো তাঁর কবিতা পড়া কিংবা গান শোনা নয়—তাঁর কৃষি, পল্লী ও সমবায়ের ভাবনাগুলো নতুন করে বোঝা এবং আমাদের সময়ের বাস্তবতায় সেগুলোকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করা।