তনু সমন্বিত কৃষি খামার: বাংলাদেশের ভবিষ্যত কৃষির রূপরেখা
মো: শহীদুল ইসলাম

খামারের উদ্যোক্তা: কৃষিবিদ খন্দকার মোসাদ্দেক আল মামুন
ভূমিকা
বর্তমান বিশ্ব খাদ্য নিরাপত্তা ও জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় গভীর সংকটের মুখোমুখি। বিশ্বের চারটি সবচেয়ে বেশি জলবায়ু ঝুকিঁপূর্ণ দেশের অন্যতম বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ সংকট আরও বেশি ঘনীভূত। আধুনিক প্রযুক্তিবিদ ও নীতিনির্ধারকগণ এরূপ সংকটের প্রযুক্তিগত সমাধান খুঁজছেন। এটা সত্য যে, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ সাধনের ফলে এদেশে দানাদার খাদ্যের উৎপাদন ও প্রাপ্যতা অনেক বেড়েছে যাকে এদেশের নীতিনির্ধারক মহল খাদ্য নিরাপত্তা বলে প্রচার করে থাকেন। কিন্তু গত চার-পাঁচ দশকের অভিজ্ঞতা থেকে এটা প্রমাণিত যে, সবুজ বিপ্লব প্রযুক্তির ঢালাও প্রবর্তন সংখ্যাগরিষ্ট দরিদ্র কৃষককে যেমন খুব একটা উপকৃত করেনি তেমনি মানুষের জন্য নিরাপদ ও পুষ্টিসম্মত খাদ্য যা খাদ্য নিরাপত্তার অপরিহার্য শর্ত, উৎপাদনেও তা ব্যর্থ হয়েছে। বর্তমান খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা শুধু যে খাদ্য নিরাপত্তার জন্যই হুমকিস্বরূপ তা নয় বরং তা আমাদের স্বাস্থ্য পরিস্থিতিকে নাজুক করার পাশাপাশি মাটি, পরিবেশ ও ইকোসিস্টেমকে ধ্বংস করেছে। উপরন্তু বর্তমান খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা বাংলাদেশ তথা সারা বিশ্বের খাদ্য শিকলের উপর কর্পোরেশনের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পথকে সুগম করছে। আমাদের হাজার বছরের নিজস্ব সমন্বিত কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থাকে ত্যাগ করে আমরা অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক আখ্যা দিয়ে একক ফসলভিত্তিক আধুনিক চাষাবাদ ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছি যেখানে সমন্বিত কৃষি ব্যবস্থার অর্থনৈতিক লাভালাভ মূলত বৈচিত্র্যের উপর নির্ভরশীল। সবুজ বিপ্লব পূর্ববর্তী সময়ে এরূপ বৈচিত্র্যই অনেকটা আমাদের অজান্তেই আমাদের সুষম পুষ্টি নিশ্চিত করত। এরূপ বৈচিত্র্য শুধু খাদ্য নিরাপত্তার জন্যই নয় পরিবর্তনশীল জলবায়ুর সাথে টিকে থাকার জন্যও জরুরী। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, আমরা আমাদের সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের জন্য কার্যত তেমন কোন প্রচেষ্টাই গ্রহন করছি না যা জলবায়ু পরিবর্তনের ইকোসিস্টেমভিত্তিক অভিযোজনের জন্য জরুরী।
বর্তমান প্রযুক্তিবিদগণ খাদ্য নিরাপত্তা ও জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রযুক্তিগত সমাধানের অংশ হিসেবে হাইব্রিড ও জিএম শস্য প্রবর্তন করছেন যা এদেশের কৃষির নিয়ন্ত্রণ কৃষকের হাত থেকে কেড়ে নিয়ে দেশি-বিদেশি কোম্পানির একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পথকে সুগম করছে। কিন্তু বিশ্বের সবচেয়ে দক্ষ কৃষি হিসেবে পরিচিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি থেকে আজ এটা প্রমাণিত সত্য যে, কৃষি থেকে যদি দশ টাকা আয় হয় তবে কৃষক পায় মাত্র এক টাকা, আর বাকী নয় টাকাই যায় বাজারজাতকারী ও উপকরণ কোম্পানির পকেটে (জন ইকার্ড, ১৯৯৬)। অতএব, এই প্রশ্ন উত্থাপনের এখনই উপযুক্ত সময় যে, কৃষি উন্নয়ন কার জন্য? অধিক খাদ্য উৎপাদন কার জন্য? উন্নয়নই বা কার জন্য? আমরা যদি সত্যিকারভাবে এদেশের মানুষের মুখের অন্ন যোগাদাতা কৃষকের উন্নয়নকেই প্রাধান্য দেই তবে আমাদের কৃষিকে সংস্কার করে একটি সমন্বিত কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা প্রবর্তনের কোন বিকল্প নেই।
হাজার বছর ধরে আমাদের কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা ছিল একটি সমন্বিত উৎপাদন ব্যবস্থা। গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি, মাছ, রকমারী কাঠ, ফল ও ঔষধি গাছ-গাছড়া, বৈচিত্র্যময় শাক-সব্জি এবং বিভিন্ন ধরনের মাঠ ফসল ছিল এই সমন্বিত ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা, জীববৈচিত্র্য, পরিবেশ এমনকি আমাদের সংস্কৃতির উপর ক্ষতিকর প্রভাবকে বিবেচনায় না নিয়েই আমাদের কৃষি ব্যবস্থাকে একক ফসলভিত্তিক আধুনিক কৃষি দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। আজ আমরা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি। আমাদের সমৃদ্ধ বাঙ্গালি সংস্কৃতি আজ আমরা হারাতে বসেছি। আর আমরা এসব এই বিশ্বাস থেকে করেছি যে, বিদেশি প্রযুক্তি গ্রহণ করা ছাড়া আমাদের আর কোন বিকল্প নেই। কিন্তু আশার কথা হচ্ছে আমাদের সব হারিয়ে যায়নি। তনু সমন্বিত কৃষি খামার আমাদেরকে এই আশার বাণী শুনাচ্ছে। খাদ্য নিরাপত্তা ও জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের ভবিষ্যতের কৃষি কিরূপ হওয়া উচিত সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য এই খামারটি আমাদের নীতিনির্ধারক মহলের জন্য একটি দিকনির্দেশনা দিতে পারে।
গবেষণা এলাকার আর্থ-সামাজিক চিত্র
তনু সমন্বিত কৃষি খামারটি কুড়িগ্রাম শহর থেকে মাত্র ২.৫ কি.মি দূরে মৃতপ্রায় ধরলা নদীর তীরে আরাজিপলাশবাড়ি নামক গ্রামে অবস্থিত। এই এলাকাটি দেশের মঙ্গা (এক ধরণের মৌসুমী দুর্ভিক্ষ) আক্রান্ত এলাকা হিসেবে সুপরিচিত যেখানে মানুষের খাদ্য ও জীবিকার নিরাপত্তার চরম অভাব বিরাজমান। মাটির অতি নিম্ন উৎপাদন ক্ষমতা, আকস্মিক বন্যা ও খরা এই এলাকার মাটি ও জলবায়ুর অবস্থার সাধারণ চিত্র। কয়েক দশক আগে এই এলাকার প্রধান ফসল বলতে ছিল কাউন (এক প্রকার দানাশস্য), পাট, সরিষা, মসুর এবং স্থানীয় জাতের আউশ ও আমন ধান। সেসময় কৃষকরা সাধারণত মালশিরা, গাঞ্জা ইত্যাদি স্থানীয় জাতের আউশ ও আমন ধান চাষ করতেন যেগুলো বন্যা ও খরা অবস্থা মোকাবিলা করতে পারত। কিন্তু একদিকে এসব ফসলের ফলন ছিল কম এবং অন্যদিকে কৃষকরা তাদের প্রধান অর্থকরী ফসল পাট চাষ থেকেও লাভ পাচ্ছিলেন না। অধিকন্তু কৃষকরা উচ্চফলনশীল আধুনিক প্রযুক্তিও অর্থাভাবে গ্রহন করতে পারে নি যা তাদেরকে শহুরে মহাজনদের কাছে তাদের জমি বিক্রি করে দিতে বাধ্য করল যারা এই এলাকায় অতি মুনাফার জন্য আলু, ভুট্টা ইত্যাদি ফসলের একক চাষ চালু করল। এরূপ পরিতর্তিত অবস্থার সাথে তাল মিলাতে না পেরে অধিকাংশ কৃষক কৃষি পেশা ছেড়ে দিয়ে হয় এলাকা ত্যাগ করল অথবা ভ্যান, রিক্সা চালকের পেশায় নিয়োজিত হল অথবা তাদের নিজেদের জমিতেই কৃষি শ্রমিকে পরিণত হল। কৃষির এরূপ রূপান্তর মঙ্গার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। এই মঙ্গা মোকাবিলায় সরকার ও বিভিন্ন বেসরকারী সংস্থা সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীসহ বিভিন্নমুখী কর্মসূচি মূলত বিভিন্ন সেবা বিতরণ কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে মানুষের খাদ্য কেনার ক্ষমতা ও আয় বৃদ্ধিতে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও এসব কর্মসূচির স্থায়িত্ব প্রশ্ন-সাপেক্ষ। শিক্ষার অভাব, নাজুক স্বাস্থ্য ও পয়নিষ্কাশন পরিস্থিতি এবং সেসাথে উচ্চ হারে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, বাল্য বিবাহ, বহু বিবাহ, যৌতুক, নারী নির্যাতন ইত্যাদি সমস্যাগুলো এই এলাকায় অদ্যাবধি প্রকটভাবে বিরাজমান। এলাকার সংখ্যাগরিষ্ট মানুষ মুসলমান যাদের অনেক কুসংস্কার ও অন্ধ বিশ্বাস রয়েছে। তবে সাধারণভাবে এই এলাকার মানুষ সহজ-সরল ও পরিশ্রমী।
গবেষণার উদ্দেশ্য
গবেষণার প্রধান উদ্দেশ্য হল খাদ্য নিরাপত্তা ও জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় চলমান কৃষির বিকল্প হিসেবে তনু সমন্বিত কৃষি খামারের সম্ভাব্যতা যাচাই করা এবং মাটি, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, ইকোসিস্টেম-এর উপর প্রভাবসহ খামারের আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাবসমূহ মূল্যায়ন করা।
খামারের কার্যক্রমের বর্ণনা
খন্দকার মোছাদ্দেক আল মামুন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃষি শিক্ষায় উচ্চ শিক্ষিত একজন কৃষিবিদ কৃষক ২০০০ সালে দুই একর জমিতে তনু সমন্বিত খামারের কাজ শুরু করেন। যখন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় একক ফনসলের চাষ এদেশের কৃষির প্রধান বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছে তখন মামুন শ্রোতের বিপরীতে এই সমন্বিত খামারটি প্রতিষ্ঠা করেছেন। একজন কৃষিবিদ হিসেবে তিনি উপলব্ধি করেন যে, কৃষিতে তার টিকে থাকতে হলে সমন্বিত খামার অপরিহার্য। তার সামনে এমন অনেক উদাহরণ ছিল যে, অনেক আধুনিক কৃষক মাছ, হাঁস, মুরগী, আলু, ভুট্টা, ইত্যাদির একক চাষের মাধ্যমে প্রচুর মানাফা অর্জন করছে। কাজেই তিনি সে ধরণের খামারের দিকে যেতে পারতেন। কিন্তু তিনি উপলব্ধি করলেন যে, কৃষির এই ধারা স্থায়িত্বশীল নয়, কারণ এরূপ কৃষি অল্প কিছু মানুষকে অল্প সময়ের জন্য লাভবান করলেও দীর্ঘদিন টিকে থাকার প্রশ্নে সমন্বিত খামার আবশ্যক।
অধিকন্তু তিনি লক্ষ করেন যে, ভোক্তাগণ দেশী জাতের মাছ, দেশি মৌসুমী ফল, দেশী মুরগী, ইত্যাদি অধিক পছন্দ করেন। তিনি আরও উপলব্ধি করেন যে, খামারকে সমন্বিত করা গেলে এটি দীর্ঘ সময়ের জন্য অনেক বেশী লাভজনক হবে। খামার স্থাপনের জন্য প্রথমে ২০০০ সালে দুই একর জমি কেনেন যা একটি সমন্বিত খামারের জন্য যথেষ্ট ছিল না। তাই যখনই সম্ভব কেনা অব্যাহত রাখলেন এবং সে জমিতে বিভিন্ন ফসলের এবং প্রযুক্তির পরীক্ষা নিরীক্ষা শুরু করলেন, মূলতঃ নিজের জ্ঞান ও অভিজ্ঞাতে সমুদ্ধ করার জন্য এবং ঐ এলাকায় যে সব ফসলের জাত ও প্রযুক্তি বেশি মানানসই তা খুঁজে বের করার জন্য। তিনি খামারের কাজ শুরু করেন ২০০৫ সালে যখন জমির পরমিান দাঁড়ায় ১০ একর। প্রথমে তিনি দুই একর জমিতে বৃক্ষ রোপন করলেন এবং পুকুর খননের কাজ শুরু করলেন। ২০০৬ সালে পুকুর খননের কাজ শেষ হলে তিনি মাছ চাষ এবং উঁচু মাটিতে ফলের বাগান শুরু করলেন। এভাবে তিনি ২০০৯ সাল নাগাত খামারটিকে উৎপাদন পর্যায়ে নিয়ে যেতে সক্ষম হন। একটি খামারের উৎপাদনীলতার ক্ষেত্রে মাটি খুব গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, বেলে মাটি হওয়ার কারণে এই এলাকার মাটিতে তেমন ফসল হতো না এবং প্রায় প্রতি বছর বন্যা হতো। এটা মাথায় রেখে মামুন তাঁর খামারকে পরিকল্পিতভাবে প্রতিষ্ঠা করেন। পুকুরের বেলে কাদামাটি এক সাথে মিশিয়ে তিনি মাটির বুনট উন্নত করেন। তিনি মাটিতে নিয়মিত গোবর সার ও কচুরিপানা পচানো সার প্রয়োগ করে মাটি জৈব পদার্থের পরিমাণ উন্নয়ন করেন। এখন এই খামারে প্রায় সব ধরণের ফসল ফলানো সম্ভব।
খামারের বর্তমান উপাদানসমূহ
১. বৃক্ষরোপন
শুরু থেকেই মামুন উপলব্ধি করেন যে, তাঁর খামারের স্থায়িত্বশীলতা এবং লাভ নিশ্চিত করার জন্য বৃক্ষ রোপন করা অত্যন্ত জরুরী। যখন আশেপাশের অন্যান্য কৃষকরা আকাশমনি ও ইউক্যালিপটাসের মত গুটিকয়েক বৃক্ষ এমনকি ফসলের জমির আইলে পর্যন্ত রোপন করছেন তখন মামুন প্রায় ৪০ স্থানীয় প্রজাতির ৪০০০-এরও বেশি কাঠের গাছ রোপন করেছেন যেখানে দেশী নিম ও বাঁশ দুটি প্রধান উপাদান। তিনি নিম লাগিয়েছেন কারণ তিনি বর্তমান বিশ্বে নিমের গুরুত্ব এবং নিমের বহুবিদ ব্যবহার সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। অন্যদিকে, খামারে সাধারণত: কেউ বাঁশ লাগানোর কথা চিন্তা করেন না। কিন্তু মামুন বাঁশ লাগিয়েছেন কারণ তিনি দেখেছেন তাঁর খামারে বিভিন্ন কাজে বাঁশের অনেক প্রয়োজন রয়েছে। আর বৃক্ষ রোপনের ক্ষেত্রে মানুন যে কৌশল অবলম্বন করেছেন তা হল তিনি বিভিন্ন ধরণের গাছ সুপরিকল্পিতভাবে মিশ্র আকারে লাগিয়েছেন যাতে একদিকে তাঁর জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার হয় এবং সব গাছ সমানভাবে বেড়ে উঠতে পারে।
২. ফলবাগান:
ফলবাগান খামারটির আর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাাদান। যখন অন্যান্য কৃষকরা বসতভিটায় স্থানীয় জাতের ফলগাছের পরিবর্তে আকাশমনি ও ইউক্যালিপটাস গাছ লাগাচ্ছেন এবং অল্প দিনে অধিক লাভের আশায় বাউকুল ও আপেলকুল-এর মত ফল গাছ ফসলের জমিতে পর্যন্ত রোপণ করছেন তখন মামুন তাঁর বাগানে বাংলাদেশের প্রায় সব ধরনের মৌসুমী ফলের গাছ এমনকি তাল, খেজুর, নারিকেল, কাঁঠাল ইত্যাদি বাণিজ্যিকভাবে লাভ করার উদ্দেশ্যে রোপন করেছেন। তাঁর বাগানে রয়েছে ৩০ প্রজাতির এবং ৮০ জাতের (৬৫ ধরণের স্থানীয় এবং ১৫ ধরণের উন্নত জাত) ২৪৭৮টি ফলের গাছ। এসব ফল গাছের মধ্যে রয়েছে ৩৭০টি পেঁপে গাছ, ৭০০টি কলা গাছ, ২৩ জাতের ৩৫০টি আম গাছ (যেখানে ২০০টি গাছই জনপ্রিয় স্থানীয় হাড়িভাঙ্গা জাতের), ১২০টি লিচু গাছ (তিন জাতের যথা: চায়না-৩, বোম্বাই ও মোজাফ্ফরী), ৫০০ টি বরই গাছ (চার জাতের যথা: বাউকুল, আপেলকুল, তাইওয়ানি কুল ও নারিকেলী কুল (স্থানীয় বিলুপ্তপ্রায় জাত) এবং ১০০টি কাঁঠাল গাছ। পাশাপাশি আরও অনেক ধরনের ফলের গাছ রয়েছে যেগুলো আপেল, আঙ্গুর, কমলার মত গুটিকয়েক বিদেশী ফলের আগ্রাসনে বাংলাদেশ থেকে দিনে দিনে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। এখানে উল্লেখ্য যে, এই ফলবাগানটি অত্র এলাকার প্রথম ও একমাত্র ফলের বাগান যেখানে অন্য কেউ ফল বাগান করার কথা ভাবতেও পারে না। আরও উল্লেখ্য যে, অত্র এলাকার মধ্যে সর্বপ্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র এই বাগান থেকেই স্থানীয় জনপ্রিয় তিনটি জাত যথা: হাড়িভাঙ্গা, কোপাহারি ও কপিলবাঙ্গরি জাতের আম বাজারজাত করা হচ্ছে যা অন্যরা কল্পনাও করতে পারে নি।
এটা সর্বজনবিদিত যে, আধুনিক কলম প্রযুক্তিতে লাগানো ফলগাছ থেকে ফলন পেতে হলে কমপক্ষে তিন বছর সময় লাগে এবং পরবর্তী বছরগুলোতে ফলগাছ থেকে আয় ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। এই বাগানের আম, বড়ই, লিচু, পেয়ারা, জামরুল ইত্যাদি ফলগাছগুলো গত ২-৩ বছর যাবৎ ফল দেওয়া শুরু করেছে। এখানে শুধু বড়ই ও আম থেকে গত তিন বছরের আয় যথাক্রমে গ্রাফ-১ ও ২ তে দেখানো হল।
যদিও এটা একটা বাণিজ্যিক খামার কিন্তু গাছের বৈচিত্রময় সংগ্রহের কারণে এটিকে একটি জার্মপ্লাজম সেন্টার বললে অত্যুক্তি হবে না। বাংলাদেশে পাওয়া যায় বা একসময় পাওয়া যেত এমন প্রায় সব ধরনের ফল ও কাঠের গাছের সমাহার এ খামারটিতে রয়েছে। একদিকে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ মোকাবিলার কৌশল হিসেবে এবং অন্যদিকে ভোক্তাদের সারা বছরের ফলের চাহিদা মিটানোর উদ্দেশ্যে কৃষক মামুন ফলগাছের এই বৈচিত্র্য গড়ে তুলেছেন। ফলস্বরূপ, তাঁর খামারের স্থায়ী কর্মীদের সারা বছরের কাজের সুয়োগও সৃষ্টি হয়েছে।
৩. মিনি-নার্সারী
নার্সারী এই খামারের ছোট একটি উপাদান। মূলত: খামারের প্রয়োজনীয় চারা এই নার্সারী থেকে উৎপাদন করা হয়। তবে অর্ডার পেলে বাইরেও চারা সরবরাহ করা হয়ে থাকে। উদাহরণস্বরূপ, এবছর দিনাজপুর (বাংলাদেশের অন্য একটি জেলা) জেলার জনৈক ব্যক্তি টেলিভিশনে এই খামারের উপর প্রচারিত সচিত্র প্রতিবেদন দেখার পর ২০০০ আমের চারার অর্ডার দিয়েছে যদিও দিনাজপুরেই এরূপ চারা সহজলভ্য। মূলত: উৎকৃষ্ট মানের চারা ও কারিগরি সহায়তা পাওয়ার আশায় আশেপাশের অনেক ব্যক্তিও এই খামার থেকে ফলের চারা সংগ্রহ করে থাকে। বর্তমানে নার্সারীতে বিভিন্ন ফলগাছের প্রায় ১০০০ চারা রয়েছে।
৪. ঔষধি গাছ-গাছড়া
বিলুপ্তপ্রায় ওষধি গাছ-গাছড়া আধুনিক বাণিজ্যিক খামারে কল্পনাও করা যায়না। কিন্তু তনু সমন্বিত খামারে ঔষধি গাছ-গাছড়াও রয়েছে যেগুলো মূলত: ভবিষ্যত সম্প্রসারণের জন্য মাতৃগাছ হিসেবে লাগানো হয়েছে। বর্তমানে খামারে নিম, আমলকি, হরতকি, বহেড়া, অর্জুন, তুলসি ইত্যাদি ২৯ প্রকারের ঔষধি গাছ-গাছড়া রয়েছে। ভবিষ্যতে খামারে ঔষধি গাছ-গাছড়ার বাণিজ্যিক উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের পরিকল্পনা রয়েছে।
৫. মাছ চাষ
মাছ চাষ শুরু থেকেই এই খামারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য যে, মৎস্য খাতকে কৃষি খাত থেকে আলাদা করার নীতিনির্ধারক মহলের সিদ্ধান্ত থেকে একক চাষের প্রতি সরকারের অনুকূল নীতির নিদর্শন বহন করে। এটা সত্য যে, গত কয়েক দশক ধরে মৎস্য খাতের প্রবৃদ্ধি এবং জিডিপিতে এ খাতের অবদান তাৎপর্যপূর্ণ। কিন্তু প্রধানত: প্রাকৃতিক জলাশয়ে পানির স্বল্পতা কারণে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম প্রভাবে হতে পারে, প্রাকৃতিক মাছ প্রায় বিলুপ্তির পথে। যাহোক, মৎস্য চাষের বর্তমান প্রবণতা হল গুটিকয়েক বিদেশি জাত যেমন: তেলাপিয়া, পাঙ্গাস ইত্যাদির একক চাষ যা দূর্লভ ফসলি জমিতে পুকুর খনন করে প্রচুর পরিমাণে কৃত্রিম খাদ্য প্রয়োগ করে চাষ করা হচ্ছে যা কৃষকের জন্য মুটেও স্থায়িত্বশীল নয় যদিও অল্প কিছু মানুষ বিশেষ করে বড় বিনিয়োগকারীরা এবং খাদ্য সরবরাহকারী কোম্পানিগুলো এরূপ চাষ থেকে প্রচুর মুনাফা অর্জন করছে। কিন্তু আধুনিক কৃষি শিক্ষায় শিক্ষিত কৃষক মামুন এটা অনুসরণ করেনি কারণ তিনি মনে করেন যে, এটা স্বল্প সময়ের জন্য লাভজনক হলেও দীর্ঘ সময়ের জন্য লাভজনক নয়। এরূপ চাষে প্রচুর পরিমান বিনিয়োগ প্রয়োজন হয় কিন্তু এক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তন এবং অন্যান্য ঝুঁকির কারণে লাভ অনেকাংশেই অনিশ্চিত। অধিকন্তু, ভোক্তাগণ এসব বিদেশি জাতের মাছ খুব একটা পছন্দ করেন না। মামুন তাঁর খামারে লাভজনকভাবে গতানুগতিক মাছ চাষের জন্য পুকুরের ধরণ কি হবে তার একটি উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন। বিগত চার বছরে মাছ চাষ থেকে তাঁর আয় চিত্র-৩ এ উপস্থাপন করা হল। গ্রাফ থেকে দেখা যাচ্ছে যে, মাছ চাষ থেকে তাঁর আয় উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে কারণ তিনি মাছ চাষের জন্য মূলত: খামারের উপজাত দ্রব্য যেমন: গোবর, খৈল ইত্যাদি ব্যবহার করছেন। বর্তমানে তিনি তাঁর পুকুরগুলোতে রুই, কাতর, মৃগেল, সিলভার কার্প, কার্ফু, সরপুটি, টাকি, পুটি, চেলা, শোল, শিং, মাগুর ইত্যাদি প্রজাতির মাছের চাষ করছেন।
৬. গবাদি পশুপাখি পালন
গবাদি পশুপাখি একটি সমন্বিত খামারের অবিচ্ছেদ্য অংশ যা শুধু লাভের জন্য নয় বরং খামারের মাছ ও গাছের জন্য খাদ্য সরবরাহ করার জন্য প্রয়োজনীয় গোবর যোগান দেওয়ার জন্য এটা অত্যন্ত জরুরী। বর্তমানে খামারে আটটি বড় গরু এবং আটটি বাছুর রয়েছে। এগুলো মূলত: দেশি জাতের এবং অল্প কয়টি শংকর জাতের গরুও রয়েছে যেগুলো দেশের পরিবেশের সাথে উত্তমভাবে অভিযোজিত। তিনি ২০০৫ সালে মাত্র ১২০০০ টাকায় কেনা মাত্র একটি এড়ে ও একটি বকনা বাছুর দিয়ে গরু পালন শুরু করেন। এক বছর পর তিনি এড়ে বাছুরটি ১৩০০০ টাকায় বিক্রী করেন এবং বকনা বাছুর থেকে তিনি এ পর্যন্ত চারটি বাছুর পেয়েছেন। ইতোমধ্যে, তিনি আরও দুটি বকনা গরু কিনেছেন। এ পর্যন্ত গরু পালনে তিনি প্রায় ১০০০০০ টাকা ব্যয় করেছেন যেখানে দুধ এবং গোবরের মূল্য ছাড়াই তাঁর গরুগুলোর বর্তমান বাজারমূল্য কমপক্ষে ৩০০০০০ টাকা। তাঁর খামারে পাঁচটি ছাগল আছে যেগুলোর বর্তমান বাজার মূল্য কমপক্ষে ১৫০০০ টাকা। এসব গুর-ছাগল পালন করতে তাঁকে বাইরে থেকে তেমন কোন খাবার ক্রয় করতে হয় না বরং খামারের উপজাতদ্রব্য খাইয়ে এগুলো পালন করা হয় যা খামারের স্থায়ি কর্মীদের জন্য কর্ম সৃষ্টিতেও সহায়ক। অতিসত্ত্বর খামারে দেশি মুরগি ও কবুতর পালন শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
৭. শাক-সব্জি চাষ
বর্তমানে খামারের সীমিত জমিতে স্বল্প পরিসরে মৌসুমী শাক-সব্জি চাষ করা হচ্ছে। এবছর শীত মৌসুমে মাত্র ৩৫ শতক জমিতে গাজর চাষ করা হয়েছে যাতে শ্রমিক খরচ বাদে ব্যয় হয়েছে মাত্র ১২০০০ টাকা এবং এযাবৎ প্রায় ৪৫০০০ টাকার গাজর বিক্রী করা হয়েছে যা মৌসুম শেষে ৬০০০০-৭০০০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। অত্র এলাকার অন্যান্য কৃষকরা সব্জি চাষ করেন মূলত: বাজার চাহিদার উপর ভিত্তি করে এবং অল্প সময়ে অধিক লাভের আশায় কিন্তু কৃষক মামুন সব্জি নির্বাচন করেন বাজার চাহিদা ও লাভের পাশাপাশি মাটির অবস্থা, পরিবেশ ও জলবায়ুর অবস্থা এবং তার খামারের পশুদের খাদ্যের কথা বিবেচনা করে।
৮. মসলা জাতীয় ফসল
এই খামারে পেঁয়াজ, রসুন, হলুদ সুপরিকল্পিতভাবে এবং সঠিক প্রযুক্তি ও সময়ে চাষ করা হয়ে থাকে। উদাহরণস্বরূপ, এবছর দেশের অধিকাংশ কৃষকই পেঁয়াজ ও রসুনের লাভজনক দাম না পেয়ে যেখানে এসব চাষে নিরূৎসাহিত হয়ে পড়েছে এবং অন্য ফসলের দিকে ঝুঁকছে সেখানে কৃষক মামুন তাঁর জমিতে পেঁয়াজ ও রসুন লাগিয়েছেন এবং তিনি লাভের ব্যাপারে আত্নবিশ্বাসী কারণ যদি মাড়াই মৌসুমের সময় দাম কমে যায় তবে এগুলো সংরক্ষণ করার পরিকল্পনা রয়েছে। অধিকন্তু অন্যান্য কৃষকের তুলনায় তাঁর বাজার যাচাই করার সক্ষমতা অধিক।
৯. অন্যান্য মাঠ ফসল
এই খামারে বিভিন্ন মাঠ ফসলও চাষ করা হয়ে থাকে। বর্তমানে তাঁর সীমিত জমি ও বিনিয়োগের অর্থের কারণে এই খামারে স্বল্প পরিসরে নির্বাচিত কিছু ফসলের চাষ হচ্ছে। এবছর, এই খামারে পাট, মসুর, ধান এবং সরিষার চাষ করা হয়েছে প্রধাণত: পারিবারিক ভোগ এবং খামারের জন্য উপজাত দ্রব্যের প্রয়োজনে। যেমন: খামারে সরিষা চাষ করা হয়েছে মূলত পরিবারের তেলের চাহিদা মিটানোর পাশাপাশি মাছ ও গরুর খাদ্য হিসেবে খৈল পাওয়ার জন্য। মসুর ও ধান চাষের পিছনেও একই উদ্দেশ্য কাজ করেছে যা থেকে সে নিজের পরিবার এবং গবাদি পশু ও মাছের জন্য খাদ্য পেয়েছেন। অন্যদিকে, এবছর যখন অন্যান্য কৃষকরা পাটের ভাল দাম পায়নি সেখানে কৃষক মামুন মূলত: সময়মত রোপন ও মাড়াই এবং উৎকৃষ্ট মানের আঁশ হওয়ায় তিনি পাটের খুব ভাল দাম পেয়েছেন। মাঠফসল চাষের ক্ষেত্রে তিনি সবসময় বাংলাদেশের বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক আবিষ্কৃত উন্নত জাত, উৎকৃষ্ট মানের বীজ এবং উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকেন যার ফলে তিনি সর্বনিম্ন ব্যয়ে সর্বোচ্চ ফলন পেয়ে থাকেন। এছাড়াও তিনি অত্র এলাকার মাটি ও জলবায়ুর সাথে সবচেয়ে বেশি খাপ খায় এমন ফসল বিন্যাস অবলম্বন করে থাকেন।
বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা
বিরাজমান বাজার ব্যবস্থা কৃষকের জন্য অত্যন্ত বড় সমস্যাগুলোর একটি কারণ কৃষকরা সাধারণত: তাদের পণ্যের লাভজনক মূল্য পায় না যা তাঁদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে একটি বড় প্রতিবন্ধক। বর্তমানে কৃষি আর কৃষকের জন্য লাভজনক বিবেচনা করা হয় না। কৃষিতে অত্যাধিক ঝুঁকি যা জলবায়ু পরিবর্তনজণিত কারণে আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। এতদসত্ত্বেও মামুনের খামারে উৎপাদিত বিভিন্ন পণ্যের লাভ বিশ্লেষণ করে দেখা যায় তিনি প্রায় প্রতিটি পণ্য থেকে যথেষ্ট লাভ পেয়েছেন। বাস্তবতা এই যে, কৃষির সম্পূর্ণ লাভটাই মধ্যস্বত্বভোগিরা গ্রাস করে নিচ্ছে। যাহোক, বর্তমান বাজার ব্যবস্থা কৃষক মামুনকে খুব বেশি প্রভাবিত করে না কারণ তার সঠিক পরিকল্পনা এবং ভোক্তাদের সহিত তাঁর সরাসরি যোগাযোগ থাকার ফলে মূলত: তিনিই বাজার ও মধ্যস্বত্বভোগিদেরকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। তাঁর উৎপাদিত পণ্যের উৎকৃষ্টতর গুণগত মানের কারণে ভোক্তাগণ তাঁর পণ্য অধিক পছন্দ করেন। ফলে, কমিউনিটির মধ্যে তাঁর একটি ভোক্তাদল সৃষ্টি হয়েছে যাদের কাছে তিনি তাঁর পণ্য সরাসরি পৌছে দেন এবং যেখান থেকে তিনি নিজে এবং ভোক্তাগণ উভয়ই উপকৃত ও সন্তুষ্ট হচ্ছেন। ভোক্তাগণ তাঁর কাছ থেকে বাজারমূল্য থেকে কম মূল্যে উৎকৃষ্টতর মানের পণ্য পেয়ে থাকেন যেখান থেকে তিনি পণ্যভেদে ৭০-৩০০% পর্যন্ত লাভ পেয়ে থাকেন। কমিউনিটিতে পণ্য বাজারজাত করার ক্ষেত্রে তাঁর স্ত্রী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকেন কারণ ভোক্তাগণ বিভিন্ন পণ্য বিশেষ করে ফলের জন্য তাঁর স্ত্রীর কাছে অর্ডার দিয়ে থাকে। এই চ্যানেলের মাধ্যমে মামুন কর্তৃক উৎপাদিত ফল বিদেশেও চলে যাচ্ছে। এই সরবরাহ চেইনে বর্তমান মধ্রস্বত্বভোগিরা কেবল তাঁর সরবরাহকারীর ভূমিকা পালন করে থাকে এবং তারাও বহুলকথিত সিন্ডিকেট তৈরি করে সব মুনাফা হাতিয়ে নেওয়ার পরিবর্তে যুক্তিসঙ্গত লাভ করছেন। তাঁর স্ত্রীর ভবিষ্যতে শহরে একটি বিপণিকেন্দ্র গড়ে তুলার পরিকল্পনা রয়েছে।
এরূপ একটি সমন্বিত খামারের আয় ব্যয়ের সঠিক হিসাব বের করা অত্যন্ত কঠিন ব্যাপার কারণ এক দিকে যেমন খামারের বিভিন্ন উপাদানের আয়-ব্যয়ের পারষ্পরিক যোগসূত্র রয়েছে অন্যদিকে তেমনি খামারের সকল আয়ব্যয়ের সঠিক হিসাবও রাখা হয় না। এখানে উল্লেখ্য যে, খামারটি এখনও প্রতিষ্ঠা পর্যায়ে রয়েছে এবং মাত্র ২০০৯ সাল থেকে আয় হওয়া শুরু হয়েছে। যাহোক, তবুও ২০১১ সালে মোটা দাগে খামারের আয়-ব্যয়ের একটি হিসাব কষার চেষ্টা করা হয়েছে যা নীচের ছক-১ এ উপস্থাপন করা হল। ছকে উপস্থাপিত তথ্য থেকে দেখা যায় যে, ২০১১ সালে খামারের মোট ব্যয় ছিল মুটামুটি ৬৮০৯০০ টাকা এবং আয় ছিল মুটামুটি ৮১৭০০০ টাকা অর্থাৎ ঐ বছরে নীট লাভ হয়েছে ১,৩৬,১০০ টাকা। আর্থিক বিবেচনায় এ লাভ হয়ত খুবই নগণ্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে একটি সমন্বিত খামারের লাভ-ক্ষতি দীর্ঘমেয়াদে হিসাব করতে হবে। যাহোক, খামারের বর্তমান শুধু দৃশ্যমান কিছু সম্পদের আর্থিক মূল্য এবং প্রক্ষেপিত ভবিষ্যত মূল্য ছক-২ এবং ৪ ও ৫ নং লেখচিত্রে উপস্থাপিত হল।

উপস্থাপিত ছক ও লেখচিত্র থেকে দেখা যাচ্ছে যে, অদূর ভবিষ্যতে খামারটি একটি অত্যন্ত লাভজনক খামারে পরিণত হতে যাচ্ছে যা খামারটির স্থায়িত্বশীলতার নির্দেশকও বটে। ইতোমধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২০০০-২০১০ সালের মধ্যে ৫,৬০,০০০ টাকা ব্যয়ে খামারের জমি ক্রয় করা হয়েছিল যার বর্তমান আর্থিক মূল্য দাড়াবে কমপক্ষে ১,২০,০০০,০০ টাকা মূলত: জমির উৎপানশীলতা বৃদ্ধির কারণে। আশা করা যায় যে, আগামী পাঁচ ও দশ বছরের মধ্যে জমির মূল্য দাড়াবে যথাক্রমে ১,৫০,০০০,০০ ও ১,৮০,০০০,০০ টাকা।
যাহোক, কাঠের গাছ, গরু, ছাগল এরূপ মাত্র কয়েকটি হিসাবযোগ্য উপাদানগুলোর মূল্য হিসাব করলে দেখা যায় যে, খামারের বর্তমান মূল্য দাড়াবে প্রায় ৮৩,০৬,০০০ টাকা যা আগামী পাঁচ ও দশ বছরে বৃদ্ধি পেয়ে দাড়াবে যথাক্রমে ১,২৫,৮০,০০০ টাকা ও ১,৬৮,২৫,০০০ টাকা। অধিকন্তু,পরিবারের সদস্যগণ সারা বছর ধরে খামার থেকে উৎপাদিত ফসল, শাক-সব্জি ও ফলমূল, দুধ ইত্যাদি খাচ্ছেন। পাশাপাশি, খামারের স্থায়ি কর্মী ও প্রতিবেশিরাও খামার থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ শাক-সব্জি ও ফলমূল বিনামূল্যে খেয়ে থাকেন।
খামারের অভিঘাতসমূহ
গবেষণা এলাকা ও সেখানকার কমিউনিটিতে খামারের ইতিবাচক অভিঘাতসমূহ নিম্নে তুলে ধরা হল।
ক. কর্মসংস্থান সৃষ্টি
বর্তমানে খামারে সাতজন (চারজন পুরুষ ও ৩জন নারী) স্থায়ি কর্মীর সারা বছর জুড়ে নিশ্চিত কাজের সুযোগ এবং ভরা মৌসুমে আরও কমপক্ষে ২০০ শ্রমদিবস কাজের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে যা অত্র এলাকার মঙ্গা দূরীকরণের একটি কার্যকর মডেল হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। এখানে উল্লেখ্য যে, গবেষকগণ অত্র এলাকার মঙ্গা দূরীকরণের জন্য মাত্র ১০০ দিনের কর্মসৃজনের সুপারিশ করছেন। অধিকন্তু গত পাঁচ বছর ধরে পুকুর খননসহ এই খামারে যত কাজ হয়েছে এবং যত অর্থ ব্যয় করা হয়েছে তার অধিকাংশই মঙ্গা আক্রান্ত মানুষের জন্য কর্মসৃজনে সহায়তা করেছে। এখন এটা হিসাব করা আবশ্যক যে, প্রায় ১৫ একরের এরূপ একটি খামারে সর্বোচ্চ কত লোকের কর্মসংস্থান সম্ভব। তবে এটা নিশ্চিত করে বলা যায় যে, খামারের সম্ভাব্য সবগুলো উপাদান যখন সম্পন্ন হবে এবং পুরোমাত্রায় উৎপাদন শুরু হবে তখন কর্মসংস্থান আরও অনেক বৃদ্ধি পাবে। কাজেই এটা নিঃসন্দেহে বলা চলে যে, মঙ্গা উপদ্রুত এই এলাকায় বছরব্যাপী নিশ্চিত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হলে তনু সমন্বিত খামারের মত খামার স্থাপন করা জরুরী।
খ. খাদ্য নিরাপত্তা
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, খামার এলাকাটি একটি মঙ্গাপীড়িত এলাকা যেখানে বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে খাদ্যের চরম অভাব লক্ষ্যণীয়। এখানে আরও উল্লেখ্য যে, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে খাদ্য বৈচিত্র্য অত্যন্ত জরুরী। এই খামার থেকে ভোক্তাগণ সারা বছর ধরে টাটকা, নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য যেমন: ফলমূল, শাক-সব্জি, মাছ ও অন্যান্য খাদ্যদ্রব্য পাচ্ছেন যা অবশ্যই অত্র এলাকার খাদ্য নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি, খামারের আশেপাশের লোকজন এবং খামারের কর্মীরা সারা বছর ফলমূল ও সব্জিসহ যখন তখন বিভিন্ন খাদ্য দ্রব্য বিনামূল্যে নিয়ে খাচ্ছে যা তাদের খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও কমবেশি ভূমিকা রাখছে।
গ. জলবায়ু পরিবর্তন এডাপটেশন ও মিটিগেশন
ইতোপূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, খামারটি একটি প্রাকৃতিক দূর্যোগপূর্ণ এলাকায় অবস্থিত যেখানে জলবায়ু পরিবর্তন দুর্যোগের মাত্রাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। কৃষক মামুন গত প্রায় এক যুগ ধরে এই এলাকার সাধারণ বা জলবায়ু পরিবর্তনজণিত দুর্যোগগুলোর সাথে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করার মধ্য দিয়ে টিকে থাকার কৌশল রপ্ত করেছেন। প্রকৃতপক্ষে, এই খামারের বিস্তৃত বৈচিত্র্যই দুর্যোগ মোকাবিলার প্রধানতম কৌশল যাকে প্রতিবেশভিত্তিক অভিযোজন বলা চলে। ফলে, সাধারণ বা জলবায়ু পরিবর্তনজণিত দূর্যোগ এই খামারকে খুব বেশি প্রভাবিত করে না। গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে যে, কোন একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ খামারের কোন একটি উপাদানের জন্য ক্ষতিকর হলেও অন্যান্য উপাদানসমুহের জন্য তা উপকারী হয়ে থাকে। উদাহরণস্বরূপ, যদি অতিবৃষ্টি ফলচাষের জন্য ক্ষতিকর হয় তবে তা পক্ষান্তরে মাছ চাষের জন্য উপকারী হয়ে থাকে। অধিকন্তু, এই খামারের প্রচুর পরিমাণ বৃক্ষরাজি জলবায়ু পরিবর্তন মিটিগেশনে স্বল্প পরিমানে হলেও ভূমিকা রাখছে।
ঘ. পরিবেশ ও বাস্তুসংস্থানগত প্রভাব
যেকেউ এই খামারে পাখির কলরব ও ফুলের মৌ মৌ গন্ধে ভরপুর সবুজ, নির্মল ও স্বস্থ্যকর পরিবেশ উপভোগ করতে পারেন। এই বাগানে সারা বছর ধরে প্রচুর পরিমাণে মৌসুমী ফল পাওয়া যায় যা পোকামাকড়, পাখি এবং গবাদি ও বুনো পশুর জন্য খাদ্যও বটে। অধিকন্তু এই বাগানের প্রচুর বৃক্ষরাজি পোকা-মাকড় ও পশুপাখির জন্য সুন্দর বাসস্থানের সুয়োগ সৃষ্টি করেছে। ফলে, এ খামারে পশুপাখি ও পোকামাকড়ের প্রাপ্যতা অনেকাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে যা একক ফসলভিত্তিক আধুনিক চায়াবাদের ফলে ধ্বংসপ্রাপ্ত ইকোসিস্টেম পূণঃপ্রতিষ্ঠার ইঙ্গিত বহন করে। এই খামারের মাটির অবস্থার উন্নয়ন ঘটেছে এবং জীববৈচিত্র্য ও ইকোসিস্টেম অনেকটাই পূণঃপ্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। অধিকন্তু, এই খামারের প্রচুর পরিমাণ বৃক্ষরাজি পরিবেশের উপর নিঃসন্দেহে অনুকূল প্রভাব ফেলছে ।
ঙ. সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব
কৃষক মামুনের সহিত আশেপাশের অন্যান্য কৃষকদের সাথে ভালবাসা ও বিশ্বাসের একটি সুন্দর সামাজিক সম্পর্ক সৃষ্টি হয়েছে। আশেপাশের কৃষকরা প্রয়োজনে তাঁর কাছে পরামর্শের জন্য আসেন এবং মামুনও তাঁদের কাছ থেকে পরামর্শ নেন। এই খামারের ফলমূল ও শাকসব্জি আশেপাশের মানুষরা দাম দিয়ে বা বিনামূল্যে খেয়ে থাকেন। কমিউনিটিভিত্তিক বাজারজাতকরণের ফলে মামুনের সহিত সবার একটি সামাজিক সুসম্পর্ক সৃষ্টি হয়েছে। আত্নীয়-স্বজনদের মধ্যে মৌসুমী ফলের বিনিময় আমাদের গ্রামীণ সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ যা বর্তমানে হারিয়ে যেতে বসেছে। এই খামারের ফল-ফলাদি মামুন নিজে, খামারের কর্মচারীগণ এবং কমিউনিটির অন্য অনেকে দেশে এমনকি বিদেশে তাঁদের আত্নীয়-স্বজনদের কাছে পাঠিয়ে থাকে যা সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধন সুদৃঢ় করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে।
চ. প্রযুক্তি সম্প্রসারণ
আশেপাশের কৃষকদের জন্য এই খামারটি কারিগরি জ্ঞান ও তথ্যের একটি বাস্তব ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। যদিও অধিকাংশ কৃষক তাদের অনেক সীমাবদ্ধতার কারণে এই খামারের সমন্বিত কাঠামোটিকে হুবহু অনুসরণ করতে পারেন না তথাপিও তাঁরা মামুনের কাজগুলোকে যথাসম্ভব অনুসরন করে থাকেন। তাঁরা প্রয়োজনে মামুনের কাছে পরামর্শের জন্য আসেন। অন্যান্য কৃষকরা এটাও লক্ষ্য করেছেন যে, অন্যান্য কৃষকরা যখন বাজারের খেলোয়াড়দের দ্বারা উপকরণ কেনার সময় এবং তাঁদের উৎপাদিত দ্রব্য বিক্রী করার সময় উভয় ক্ষেত্রেই ঠকেন তখন মামুনকে তাঁরা ঠকাতে পারে না মূলত: আধুনিক প্রযুক্তি সম্পর্কে তাঁর জ্ঞান থাকার কারণে। এটা দেখে অনেক কৃষক তাঁর কাছে আসেন পরামর্শের জন্য। মামুন জ্ঞান বিস্তারের দ্বিমুখী প্রক্রিয়া হিসেবে তাঁদের কাছ থেকেও অনেক কিছু শিখে থাকেন।
ছ. জেন্ডার উন্নয়ন
বর্তমানে খামারে চারজন পুরুষ ও তিনজন নারী স্থায়িভাবে একটি পারিবারিক পরিবেশে কাজ করছেন। যদিও দেশের প্রচলিত মজুরী কাঠামো অনুসারে নারীরা কম মজুরী পাচ্ছে কিন্তু নারীদের এখানে সারাবছরের জন্য নিশ্চিত কাজের সুযোগ আছে যা দিয়ে তারা তাদের নিজেদের পরিবার পরিচালনা করতে পাচ্ছেন। ফলে, এই নারীদের তাঁদের নিজেদের পরিবারে সিদ্ধান্ত গ্রহন ক্ষমতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।
এযাবৎ প্রাপ্ত স্বীকৃতি
এই খামারটি আশেপাশের মানুষদের কাছে একটি বিষ্ময় হিসেবে প্রতিভাত হয়েছে যাকে “ধরলার চরে সবুজ বিপ্লব” হিসেবে দেখা হচ্ছে যেখানে কৃষিকাজ খুবই কঠিন। বর্তমানে খামারটি গণমাধ্যম ও গবেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। ইতোমধ্যে এই খামারের উপর প্রতিবেদন চ্যানেল আই, বাংলাভিশনসহ স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচার করা হয়েছে। দৈনিক ডেসটিনি ও বাংলাদেশ প্রতিদিন এবং স্থানীয় গণকথা প্রত্রিকা এই খামারটিকে “চরে সবুজ বিপ্লব” হিসেবে প্রচার করা হয়েছে। সম্পতি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড: এম এ রহিম একটি গবেষক দল নিয়ে এই খামারটি পরিদর্শন করে এটাকে একটি অসাধারণ কাজ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। সম্প্রতি অক্সফাম “গ্রামীণ জীবনযাত্রার স্থায়িত্বশীল উন্নয়নের জন্য প্রচারাভিযান”-এর অংশ হিসেবে খাদ্য নিরাপত্তায় কৃষক মামুনের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে “স্থানীয় খাদ্যবীর” খেতাবে ভূষিত করে পুরস্কৃত করেছে।
খামারের সীমাবদ্ধতাসমূহ
বর্তমানে খামারটি যেসব চ্যালেঞ্জ ও অসুবিধা মোকাবিলা করছে সেগুলো নিম্নরূপঃ
- কোন সংযোগ সড়ক না থাকায় বর্ষাকালে খামারটি একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মত হয়ে পড়ে যদিও কৃষক মামুন তাঁর নিজস্ব উদ্যেগে একটি মাটির সরু সড়ক নির্মাণের কাজে হাত দিয়েছেন।
- খামারে বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকায় নিরাপত্তার অভাবসহ নানান সমস্যা হচ্ছে।
- খামারের ব্যবস্থাপনায় পর্যাপ্ত জনবলের অভাব। প্রকৃতপ্রস্তাবে এই খামারটি আর দশজন কৃষকের খামারের মতই যেখানে খামারের আয়-ব্যয়ের হিসাব সংরক্ষণ ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং খামারের সার্বিক ব্যবস্থাপনার জন্য কোন বিশেষায়িত কোন কর্মী নেই। ফলে খামার আয়-ব্যয়ের সঠিক হিসাব পাওয়া দুষ্কর। তাছাড়া, বর্তমান বাজারে কোম্পানি ও মধ্যস্বত্বভোগিদের সাথে পাল্লা দিয়ে টিকে থাকতে হলে ব্যবস্থাগত দক্ষতা বাড়ানোর কোন বিকল্প নেই।
- বিনিয়োগের জন্য দরকারী অর্থের অভাব।
ভবিষ্যত পরিকল্পনা
ইতোপূর্বে বলা হয়েছে যে, খামারটি এখনও পূর্ণতা পায়নি। এ খামারটিতে দেশি মুরগীর বাণিজ্যিক চাষ, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সৃবিধাসহ বাণিজ্যিকভাবে শাক-সব্জি চাষ, দেশি হাঁস ও মাছের মিশ্র চাষ, ঔষধি গাছ-গাছড়ার বাণিজ্যিক উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ, মৌ চাষ, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তোলা, বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপন, আধুনিক জৈব কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার করে জৈব ফসল উৎপাদন ইত্যাদি কাজগুলো পর্যায়ক্রমে সম্পাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।
উপসংহার
শুরুতেই এই খামারের জমির পরিমাণ ছিলো মাত্র দুই একর যা কৃষি খামারের শ্রেণিবিভাজনের নিরীখে একটি ক্ষুদ্র খামার এবং কৃষক মামুন একজন ক্ষুদ্র কৃষক হিসেবেই যাত্রা শুরু করেন। খামারের আয় পূণর্বিনিয়োগ করে এবং মাত্র আঠারো লাখ টাকার বাহ্যিক পুঁজি বিনিয়োগ করে খামারের আকার এখন প্রায় ১০ একর যা এখন বড় খামারের আওতাভূক্ত। মামুন কৃষি শিক্ষায় উচ্চশিক্ষিত একজন কৃষক হলেও বাংলাদেশের অন্য দশজন সাধারণ কৃষকের মতই তিনি জলবায়ু পরিবর্তনসহ এদেশের কৃষির সবধরণের চ্যালেঞ্জ বাস্তবে মোকাবিলা করে এই খামারটি প্রতিষ্ঠা করছেন। যদিও খাদ্য নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, মঙ্গা এসব উন্নয়ন পরিভাষাগুলোর সাথে কৃষক মামুনের তেমন কোন প্রত্যক্ষ পরিচয় ছিল না কিন্তু একজন কৃষক হিসেবে অজান্তেই তিনি এসব সমস্যা মোকাবিলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। বিচিত্র ধরণের ফল-ফলাদি, শাক-সব্জি, বিভিন্ন ফসল, মাছ, গরু-ছাগল ও গাছ-গাছড়ার যে সমাহার এই খামারে ঘটানো হয়েছে তা সত্যি বিস্ময়কর। খামারের এমন পরিকল্পনার পিছনে চালিকা শক্তি হিসেবে যে জিনিসটি সবচেয়ে বেশি কাজ করেছে তা হল পারিবারিক খাদ্য চাহিদা এবং খামারকে বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক ও স্থায়িত্বশীল করা।
তিনি এমন একটি সময়ে কৃষিকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন যখন কৃষিপ্রধান এদেশের কৃষকরা কৃষিতে টিকে থাকার জন্য নিরন্তর সংগ্রাম করে যাচ্ছেন। প্রকৃত বাস্তবতা এই যে, কৃষকরা কৃষি পেশার কোন ভবিষ্যত দেখেন না তাই কোন কৃষক নিতান্ত নিরূপায় না হলে তাঁর সন্তানকে কৃষিতে আসতে দিতে চাননা। অন্যদিকে, অত্যন্ত পরিতাপের ব্যাপার এই যে, ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও ভূমিহীন যারা এদেশে সংখ্যাগরিষ্ট খাদ্য উৎপাদক তারাই খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় সবচেয়ে বেশি ভোগে থাকেন। যদিও মামুন এই তিন শ্রেণীভূক্ত কৃষক নন, কিন্তু তিনি অজান্তেই এসব কৃষক, যারা আধুনিক বাণিজ্যিক কৃষির আগ্রাসনের সবচেয়ে বেশি ভূক্তভোগি, তাঁদের জন্য একটি আদর্শ হিসেবে দাড়িয়েছেন। এখন প্রয়োজন ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও ভূমিহীন কৃষকদেরকে সমৃক্ত করে এটাকে একটি কমিউনিটিভিত্তিক খামার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। এটা দেশের নীতিনির্ধারকদের জন্যও একটি মডেল যা দেখে তাঁরা উপলব্ধি করতে পারেন যে, আমাদের দেশের হাজার বছরের পরিবেশ ও প্রতিবেশগতভাবে সুস্থ সমন্বিত কৃষির মডেল অনূসরণ করেও স্থায়িত্বশীলভাবে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়। পাশাপাশি, কৃষিকেও কৃষকের জন্য একটি লাভজনক, সন্মানজনক ও আদর্শ পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা যায়। এই খামারটি ইতোমধ্যেই একক ফসলভিত্তিক আধুনিক কৃষির এমন একটি বিকল্প মডেল খামার হিসেবে অনেকটাই দাড়িয়ে গেছে। পরিকল্পনা অনুয়ায়ি বাকী কাজগুলো দ্রুত সমাধান করে এটিকে স্থায়িত্বশীল কৃষির একটি আদর্শ মডেল হিসেবে গড়ে তোলা প্রয়োজন যাতে খাদ্য নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার পাশাপাশি ভবিষ্যত প্রজন্মকে দেখানো যায় যে কৃষিই সর্বোৎকৃষ্ট কৃষ্টি।



