আলু-পেঁয়াজ-চাষীর ঈদ

দিকে দিকে শুনি ঈদের সাজ সাজ রব,
বাজারে, শপিং মলে মানুষের উপচে-পড়া ভিড়।
প্রিয় জিনিসটি কিনবে বলে ছুটছে সবাই ঊর্ধ্বশ্বাসে,
আড়ং-এর আড়ংবাজি নিয়ে তোলপাড় নেটদুনিয়া।

পত্রিকার পাতাজুড়ে শুধুই ঈদের খবর,
নাড়ির টানে জীবন হাতে ঘরমুখো মানুষের মিছিল।
ভবনে ভবনে আলোসজ্জা, চারদিকে পটকার শব্দ—
আজ ঈদ, বাংলার ঘরে ঘরে উৎসবের আমেজ।

কিন্তু কেমন কাটল লাখো আলুচাষীর ঈদ
কিংবা সেইসব হতভাগ্য পেঁয়াজচাষীর?
যাদের পরিবার বুকভরা আশা নিয়ে ভেবেছিল—
আলু বেচে, পেঁয়াজ বেচে এবার হবে নতুন শাড়ি, লুঙ্গি, জামা;
ঘি-ভাত না হোক, অন্তত জুটবে সেমাই-চিনি,
আর হাঁড়িতে উঠবে একটুখানি মাংসের ঝোল।

কেমন হলো আজ তাদের ঈদ?
জুটল কি নতুন জামা, একটু ভালো খাবার?
চাষীর ঘরের ছোট্ট শিশুটির মনে
জেগেছে কি ঈদের খুশির হিল্লোল?
সে কি নতুন সাজে, চকচকে চোখে,
হেসে-খেলে দল বেধে গিয়েছে ঈদগাহে?

আমি নিশ্চিত জানি—
‘সবই কপালের লিখন’ মনে মনে বলে
কাকভোরে উঠে গোয়ালঘর ঝাড় দিয়েছে সে।
পাশের খালের নোংরা হাঁটুজলে সেরে নিয়েছে স্নান,
নুন-লংকা দিয়ে পান্তাভাত মুখে তুলে
পুরোনো লুঙ্গি, আধছেঁড়া জামা
যা ছিল ঘরে, তাই গায়ে এঁটে
ছুটে গেছে ঈদগাহে—
সৃষ্টিকর্তার শুকরিয়া আদায় করতে।

এটাও নিশ্চিত জানি, সেই চাষীবউ
কাকভোরে উঠে ঘরদোর দিয়েছে ঝাড়,
গরু-ছাগল-কুঁকড়োগুলোকে খাইয়ে
বসে গেছে উনুনের ধারে।
হয়তো হাঁড়িতে নেই তেমন কিছুই,
তবু সন্তানের মুখের দিকে চেয়ে
চোখের জল গোপন করে জ্বালিয়েছে আগুন।
হয়তো একমুঠো চাল, একটু ডাল,
অথবা শাকপাতা দিয়ে
ঈদের দিনের রান্না সাজিয়েছে কোনোমতে।

হয়তো সেই চাষী ঈদগাহ থেকে ফিরে
চুপচাপ উঠোনের এক কোণে বসে
আবার কষেছে বেচে থাকার হিসেব-নিকেষ
আবার বুনেছে নতুন কোন ফসলের স্বপ্ন
হয়তো সন্তানের মাথায় হাত রেখে বলেছে –
“মন খারাপ করিস না, বাপ,
আগামী বছর আল্লাহ নিশ্চয় ভালো করবেন।”

এই আশাতেই বেঁচে থাকে চাষী,
এই আশাতেই কেটে যায় তার ঈদ,
এই আশাতেই বাংলার মাটি আজও
শস্যে শস্যে ভরে ওঠে।

তবু প্রশ্ন থেকে যায়—
যে মানুষটা সবার মুখে অন্ন তুলে দেয়,
তার ঘরেই কেন উৎসবের দিনে
এত অভাব, এত হাহাকার?
যে চাষীর ঘামে বাঁচে দেশ,
তার ঈদ কেন আজও
শুকনো পান্তা, আধছেঁড়া জামা
আর নীরব কান্নার ঈদ হয়ে থাকে?