বাণিজ্যিক বিশ্বায়ন ও বাংলাদেশের কৃষি  (অধ্যায়-১: ভূমিকা)

বাণিজ্যিক বিশ্বায়ন ও বাংলাদেশের কৃষি (অধ্যায়-১: ভূমিকা)

ভূমিকা:

বাংলাদেশ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি ক্ষুদ্র কৃষিপ্রধান দেশ। হিমালয়ের পাদদেশে নদীবিধৌত পলিমাটি দিয়ে গঠিত কৃষি উপযোগী উর্বর জমি ও জলবায়ু নিয়ে এই ভূখন্ড গঠিত। একসময় এ দেশের কৃষকের ঘরে ঘরে ছিল গোলাভরা ধান, পুকুরভরা মাছ আর গোয়ালভরা গরু। “মাছে-ভাতে বাঙালী” একটি সর্বজনবিদিত প্রবাদ। এ দেশের ইতিহাস স্বনির্ভর কৃষি ও জুম চাষের এক সফল ইতিহাস। স্বাধীন ও স্বয়ংসম্পূর্ণ অর্থনীতির উপর নির্ভরশীল ছিল এ দেশের গ্রামীণ সমাজ ব্যবস্থা। কৃষক ছিল স্বনির্ভর। কেবলমাত্র কেরোসিন ও লবণ জাতীয় দ্রব্য ছাড়া জীবন ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় কোন দ্রব্যের জন্য তাঁদেরকে পরমুখাপেক্ষি হতে হত না। খাঁটি সোনার চেয়েও খাটি ছিল এ দেশের মাটি। সহজে ও অল্প পরিশ্রমেই জমিতে ফসল ফলাতো এ দেশের কৃষক।

পদ্মা-মেঘনা-যমুনা বাহিত পলিমাটিতে কৃষি উৎপাদন সহজ ছিল বিধায় ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ জীবনধারণের জন্য বাংলায় এসে স্থায়িভাবে বসবাস করতে আরম্ভ করে। যার ফলে, ভারতের অন্যান্য অংশের চেয়ে এ অঞ্চলের জনসংখ্যার ঘনত্ব ছিল সব সময় বেশি। বাংলার সমৃদ্ধির যুগে কৃষকরা শুধু খাদ্যই উৎপাদন করত না, তারা নিজেদের ও স্থানীয় চাহিদা পূরণের জন্য কৃষি উপকরণাদি, কৃষি ভিত্তিক শিল্পজাত দ্রব্য এবং ভোগ্যপণ্যও উৎপাদন করত। এ দেশের বস্ত্র শিল্প ও মসলিন ছিল পৃথিবীবিখ্যাত। তা ছাড়া, কামার, কুমার, তাতী, ছুতারসহ নানা পেশার মানুষ মিলে গ্রামে-গঞ্জে গড়ে তুলেছিল নানা ধরণের ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প। এই ভূখন্ডের অঢেল সম্পদের লোভে এবং এ দেশের মানুষের সরলতা, বিভিন্ন ধর্ম-বর্ণ-গোত্রে বিভক্তি এবং অসংগঠিত অবস্থার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তুর্কী, মোঘল, পাঠান, পর্তুগীজ, মারাঠী, ওলন্দাজ, ফরাসী এবং ব্রিটিশ বেনিয়ারা এ দেশে এসে কায়েম করে জুলুম, নির্যাতন, শোষণ ও লুটপাটের রাজত্ব। আর তখন থেকেই এ দেশের কৃষকের ভাগ্যে নেমে আসে সীমাহীন দুর্ভোগ। এর পর থেকে এ দেশের কৃষকের ইতিহাস শোষণ ও বঞ্চণার এক করুণ ইতিহাস।

আজও এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ কৃষক জনগোষ্ঠী নানাবিধ সংকটে আকন্ঠ নিমজ্জিত। দেশের বিশাল জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা মিটানোর দায়ভার কৃষকের কাধে চাপিয়ে দিয়ে উৎপাদন বাড়ানোর নামে এমন এক কৃষি ব্যবস্থার বেড়াজালে কৃষককে ধীরে ধীরে জড়িয়ে ফেলা হয়েছে যেখান থেকে বেরুনোর আর কোন পথই যেন খোলা নেই। গত কয়েক দশক ধরে ফসলের প্রধানত দানাশস্যের ফলন বাড়াতে গিয়ে দেশীয় কৃষি উপকরণনির্ভর স্থায়িত্বশীল কৃষি প্রযুক্তির উদ্ভাবন এবং ব্যবহারের দিকে যথেষ্ট গুরুত্ব না দিয়ে ক্রমবর্ধমান হারে সেচ, রাসায়নিক সার, বালাইনাশক এবং অন্যান্য বাজারনির্ভর এবং আমদানিনির্ভর কৃষি উপকরণের ব্যবহারকে ঢালাওভাবে উৎসাহিত করা হয়েছে। ফলে, একদিকে যেমন ফসলের উৎপাদন ব্যয় এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের সাধ্যের বাইরে চলে গেছে অন্যদিকে তেমনি মাটির উর্বরতা ও উৎপাদন ক্ষমতা হ্রাস, ফসল চাষের ঝুঁকি বৃদ্ধি, সেচ সংকট, সার সংকট, বীজ সংকট, ভেজাল বীজ-সার-বালাইনাশক এবং জলবায়ুগত পরিবর্তনের ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বৃদ্ধিসহ নানাবিধ সংকট ও সমস্যায় কৃষক আজ দিশেহারা হয়ে পড়েছে। তা ছাড়া মানবস্বাস্থ্য, পরিবেশ এবং জীববৈচিত্র্যও আজ মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন। সর্বোপরি ধ্বংস হচ্ছে এ দেশের হাজার বছরের স্বনির্ভর, সমন্বিত ও স্থায়িত্বশীল কৃষি ব্যবস্থা।

একথা সত্য যে, বর্তমান কৃষি ব্যবস্থায় দানাদার শস্যের উৎপাদন অনেকগুণ বেড়েছে কিন্তু তার সুফল কৃষকের ঘরে উঠছেনা। মুক্ত বাজারের কারসাজিতে অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদন খরচের চেয়ে কম মূল্যে কৃষককে তার উৎপাদিত পণ্য বিক্রী করে দিতে হচ্ছে। এভাবে ভর্তুকী দিয়ে, নিজে না খেয়ে কৃষক এ জাতির মুখে অন্ন তুলে দিচ্ছে। অন্যদিকে, ক্রমবর্ধমান হারে  রাসায়নিক সার ও বালাইনাশক প্রয়োগ করা সত্ত্বেও গত প্রায় দুই দশক ধরে দেশের প্রধান শস্য ধান ও অন্যান্য শস্যের ফলনে স্থবিরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অথচ, একই সময়ে সেচ, বালাইনাশক ও রাসায়নিক সারের ব্যবহার বেড়েছে বহুগুণ। ধানের উৎপাদন আমাদের চাহিদা অনেকাংশে মেটাতে সক্ষম হলেও ডাল, তেল, মশলা ও ফল উৎপাদনে যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে যা প্রচুর পরিমান বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে আমদানি করতে হচ্ছে। তা ছাড়া, অধিক ফলনের আশায় এ ধরণের চাষাবাদের ফলে আমাদের বীজের নিয়ন্ত্রণ তথা খাদ্যের নিয়ন্ত্রণ চলে যাচ্ছে দেশী-বিদেশী কোম্পানির হাতে যা আমাদের খাদ্য নিরাপত্তাকে আরও হুমকির মুখে ফেলে দিবে।

কৃষি এখনও এ দেশের গ্রামের মানুষের প্রধান পেশা। দেশের জাতীয় আয়ের প্রায় এক পঞ্চমাংশের উৎস হল কৃষি। শতকরা ৬০ ভাগেরও বেশি মানুষ সরাসরি কৃষির উপর নির্ভরশীল। কিন্ত এ দেশের কৃষির সেই সমৃদ্ধ অতীত ঐতিহ্য আজ কালের গর্ভে বিলীন হয়েছে। বদলে গেছে কৃষকের গোলা ও গোয়ালের মালিকানা। অধুনা বাণিজ্যিক বিশ্বায়ন ও বহুজাতিক কোম্পানির বাণিজ্যিক আগ্রাসনের কবলে পড়ে এ দেশের কৃষি ও কৃষক অতিক্রম করছে এক কঠিন ক্রান্তিকাল। আগামী দিনগুলো হবে আরও আধার ঘেরা, আরও ভয়ংকর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তরকালে বৃটিশ বেনিয়া শাসকগোষ্ঠী এ দেশ থেকে বিতাড়িত হলেও নব্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিরূপী বহুজাতিক কোম্পানিগুলো এ দেশের প্রায় ১৭ কোটি মানুষের বিশাল বাজার দখলের লক্ষ্যে আজ এক ভয়াবহ নীল-নকশা বাস্তবায়নের পথে সাফল্যের সাথেই এগিয়ে চলেছে। প্রকৃতপ্রস্তাবে, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর বিশাল বাজার দখলের লক্ষ্যকে সামনে রেখেই গঠন করা হয়েছে বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার কৃষিচুক্তি ও ট্রিপস চুক্তির সহায়তায় এ দেশের কৃষিপণ্য ও স্থানীয় প্রযুক্তির বাজারকে ধ্বংস করে দিয়ে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো তাদের কৃষিপণ্য এবং প্রযুক্তির একচেটিয়া বাজার প্রতিষ্ঠার সবরকম ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করছে। এতে যে শুধু এ দেশের কৃষি ও কৃষকই ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে তাই নয়, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বও আজ হুমকির মুখে পড়ছে। কারণ, দেশের নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে দাতা দেশ ও সংস্থাসমূহের নগ্ন হস্তক্ষেপ আজ সর্বজনবিদিত।

দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, এ দেশের কৃষি, কৃষক এবং সর্বোপরি দেশের এরূপ সংকট মোকাবিলায় স্বাধীনতা পরবর্তী সরকারগুলোর ভূমিকা ও উদ্যোগ অত্যন্ত হতাশাব্যঞ্জক। স্বাধীনতার পূর্বে ক্ষমতাসীন শাসকগোষ্ঠী এ দেশের কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নকে স্বাভাবিকভাবেই অবজ্ঞার চোখে দেখেছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, স্বাধীনতা অর্জনের পরও আজ পর্যন্ত এ দেশের কোন সরকারই সংখ্যাগরিষ্ঠ গ্রামীণ দরিদ্র কৃষক জনগোষ্ঠীর বিশেষ করে ভূমিহীন, ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের (যারা মোট কৃষক জনগোষ্ঠীর শতকরা প্রায় ৮৭ ভাগ) স্বার্থ রক্ষায় কার্যকর কোন ভূমিকা রাখে নি। যে মুক্তির স্বপ্ন নিয়ে এ দেশের আপামর গণমানুষ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ কায়েম করেছিল, সে মুক্তি আজও সুদুর পরাহত। স্বাধীনতার পর বহুল আকাংখিত ভূমি সংস্কারে কোন সরকারই কার্যকর কোন উদ্যোগ গ্রহণ করে নি। স্বাধীনতা লাভের অব্যবহিত পরে বাংলাদেশের প্রথম পরিকল্পনা কমিশন ভুমি সংস্কারের একটি খসড়া সুপারিশমালা প্রণয়ন করে এবং তা বিবেচনার জন্য তৎকালীন মন্ত্রী পরিষদে পেশ করে যা গ্রহণ করা হয় নি। তা ছাড়া, এ সুপারিশমালায় ভূমিহীন, ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের উন্নয়নের জন্য সমবায় ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রস্তাব রাখা হয়েছিল, তাও বিবেচনা করা হয় নি।

পক্ষান্তরে, স্বাধীনতাত্তোরকালের সরকারগুলো বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও এডিবিসহ বিভিন্ন দাতা দেশ ও সংস্থার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ চাপের মুখে অথবা কায়েমি স্বার্থে যে কাঠামোগত সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছে তা কার্যত ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষককে কৃষি থেকে বিতারণের পথকেই সুগম করেছে। এরূপ কাঠামোগত সংস্কার কৃষিতে দেশী-বিদেশী কর্পোরেশনের অবাধ বাণিজ্যের দ্বার অবারিত করেছে। আর এ দেশের পিছিয়েপড়া কৃষক জনগোষ্ঠী দিন দিন বাজারের দাসে পরিণত হচ্ছে। বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর অসম বাণিজ্যের বেড়াজালে কৃষক সমাজ আজ দিশেহারা হয়ে পড়ছে। অথচ বাণিজ্য উদারিকরণের নামে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর বাণিজ্যিক আগ্রাসনের নির্মম শিকারে পরিণত হলেও এ দেশের কৃষকদের মধ্যে তার স্বরূপ উপলব্ধি করার মতো প্রয়োজনীয় তথ্য ও জ্ঞানের যথেষ্ট অভাব রয়ে গেছে।

এমতাবস্থায়, এই কঠিন সংকট মোকাবিলা করতে হলে এ দেশের কৃষকদেরকেই উঠে দাঁড়াতে হবে। কারো মুখাপেক্ষি না হয়ে দলমত নির্বিশেষে কৃষকদেরকেই একমঞ্চে এসে দাঁড়াতে হবে এবং বর্তমান কৃষি ব্যবস্থা ভেঙেচুরে নতুন করে গড়ে তুলতে হবে এক স্বনির্ভর ও স্থায়িত্বশীল কৃষি ব্যবস্থা। খাদ্য ও কৃষির উপর বহুজাতিক কোম্পানির বাণিজ্যিক আগ্রাসন মোকাবিলা এবং খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনে আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও কৃষ্টির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি স্থায়িত্বশীল কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলার কোন বিকল্প নেই। ক্ষতিকর রাসায়নিক সার, বালাইনাশক এবং ব্যয়বহুল কৃষি প্রযুক্তির উপর নির্ভরশীলতা ক্রমশ কমিয়ে এনে স্থানীয় ও প্রাকৃতিক সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার মাধ্যমে এবং শস্য, মৎস্য, প্রাণিসম্পদসহ কৃষির সমস্ত খাতগুলোকে সমন্বিত করে একটি স্থায়িত্বশীল কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য আমাদের রয়েছে প্রচুর সুযোগ ও সম্ভাবনা। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে সবার আগে প্রয়োজন আমাদের সকলের সর্বোপরি নীতিনির্ধারক মহলের সুদৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং অব্যাহত প্রচেষ্টা। এই গ্রন্থে এসব সমস্যার বিশ্লেষণ ও সমাধান খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হয়েছে যা নীতি নির্ধারক মহল, গবেষক, কৃষি উন্নয়ন কর্মী এবং সংশ্লিষ্ট সকলের কাজে লাগবে বলে আশা করি।

#বাণিজ্যিক #বিশ্বায়ন #কৃষি #ক্ষুদ্র কৃষক

বায়োডাইনামিক এগ্রিকালচারঃ জৈব কৃষির নতুন পাঠ

বায়োডাইনামিক এগ্রিকালচারঃ জৈব কৃষির নতুন পাঠ

বাংলাদেশের মত দেশে জৈব কৃষির মত প্রায় অসম্ভব এক কাজের পিছনে প্রায় পুরো কর্মজীবনটা ব্যয় করে ফেললাম। অর্জন বা সফলতার খাতায় আশাব্যঞ্জক খুব বেশি কিছু যুক্ত না হলেও অভিজ্ঞতার ঝুলিটা মুটেও ফেলনা নয়। যদিও অভিজ্ঞতার সবটুকু এখনো কাজে লাগানো যায়নি। এর পিছনে বহুবিদ কারণ রয়েছে। প্রথম ও প্রধান কারণটি হলো গত কয়েক দশক ধরে রাসায়নিক কৃষির চর্চার ফলে আমাদের মাটি, পরিবেশ ও জীববৈচিত্রের যে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ সম্পন্ন হয়েছে সেখান থেকে জৈব কৃষিতে ফেরাটা প্রায় অসম্ভব একটা ব্যাপার। এটা মূলত একটা টেকনিক্যাল কারণ। আরেকটা প্রধান আর্থসামাজিক কারণ হচ্ছে – আমাদের স্বল্প এবং ক্রমহ্রাসমান জমিতে ক্রমবর্ধমান মানুষের বর্তমান খাদ্যচাহিদা মিটাতে হলে বর্তমান রাসায়নিক কৃষির কোন বিকল্প নেই বলেই নীতি-নির্ধারক-মহলসহ দেশের বেশিরভাগ মানুষের এমনকি খোদ কৃষকেরও বদ্ধমূল ধারণা। আপাতদৃষ্টিতে এই ধারণা হয়ত পুরোপুরি অমূলক নয়। জৈব কৃষি বাস্তবায়নে শ্রীলংকার সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা থেকে এই ধারণা আরও বদ্ধমূল হয়েছে বলেই মনে হচ্ছে যদিও এক্ষেত্রে শ্রীলংকান পন্থা মুটেও বাস্তবসম্মত ছিলনা। জৈব কৃষি চর্চার বাস্তবায়ন যতই কঠিন হউক না কেন তাই বলে মাটি, পরিবেশ, মানবস্বাস্থ্য ইত্যাদি সবকিছুকে হুমকিতে ফেলে আমাদের অবিবেচনাপ্রসূত খাদ্য চাহিদা মিটাতে হবে সেটা মেনে নিতে মন সায় দেয়না বলেই এই অসম্ভবের পিছে নিরন্তর ছুটে চলা।

আমাদের খাদ্য ব্যবস্থা যে ভুল পথে পরিচালিত হচ্ছে একটি উদাহরণ দিলেই বিষয়টি কিছুটা স্পষ্ট হতে পারে। আমাদের সুষম পুষ্টির জন্য একজন মানুষের দৈনিক কতটুকু শর্করা প্রয়োজন সেটা জানা খুব জরুরি। কিন্তু আমরা কয়জন তা জেনেবুঝে খাদ্য গ্রহণ করি? একজন প্যুর্ণবয়স্ক মানুষের দৈনিক ২০০০-২২০০ কিলোক্যালরি খাদ্যশক্তি দরকার হয় তার ৪৫-৬৫% শর্করা থেকে আসতে হবে। তার মানে হলো, সর্বোচ্চ পরিমাণটা ধরা হলেও শর্করা থেকে আসতে হবে ১৪৩০ কিলোক্যালরি খাদ্যশক্তি। আবার ১ গ্রাম শর্করা সমান ৪ কিলোক্যালোরি শক্তি। অর্থাৎ ১৪৩০ কিলোক্যালরি খাদ্যশক্তি পেতে হলে প্রায় ৩৫৮ গ্রামের মত শর্করা জাতীয় খাদ্য লাগবে। চালে শর্করা থাকে ৮০% এবং সে হিসেবে শর্করার পুরোটাই চাল থেকে পেতে চাইলে আমাদের প্রতিজনের প্রতিদিন চাল লাগে ৪৪৮ গ্রামের মত। কিন্তু আমরা শুধু ভাতই খাইনা আলু, বিস্কুট, চিনি, চিড়া-মুড়ি এমনকি শাকসব্জী ও ফলমূলও খাই যেখান থেকেও শর্করা পেয়ে থাকি। জাতিসংঘের WHO/FAO এর হিসেব অনুযায়ী আমাদের ভাত গ্রহণ করা উচিত সর্বোচ্চ ৪০০ গ্রাম। বাকি ক্যালরি আসবে গম, গোলআলু এবং অন্যান্য খাবার থেকে। তার মানে, আমাদের প্রায় ১৭ কোটি মানুষের জন্য বছরে চাল লাগে মুটামুটি ২.৫ কোটি টন বা তার একটু বেশি যেখানে ২০২১ সালে দেশে চাল উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৩.৭৬ কোটি টন।

তদুপরি আমাদেরকে প্রতিবছরই চাল আমদানি করতে হয়। চালের উচ্চমূল্যসহ নানান সংকটতো লেগেই আছে। অন্যদিকে, খাদ্য নিরাপত্তার সংঙা থেকে আমরা জানি যে, তিনবেলা পেটপুরে পোলাও-মাংস-বিরিয়ানি খেলেই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়না যদি না সেই খাদ্য স্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ হয় এবং মানবদেহের পুষ্টি চাহিদা মিটাতে সক্ষম হয়। কাজেই দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করাসহ এসব সংকট মোকাবিলায় আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানের বিবেচনায় মানুষের পুষ্টিজ্ঞান ও সচেতনতা সৃষ্টি করতে সর্বশক্তি নিয়োগ করা উচিত ছিল। অথচ এই বিষয়টিকে অগ্রাধিকার না দিয়ে চালের উৎপাদন বৃদ্ধিকে অধিক গুরুত্ব দিতে গিয়ে আমারা আমাদের কৃষি ও খাদ্যববস্থাকে প্রতিনিয়ত বিপন্ন করে চলেছি।

আমি কর্মজীবনের শুরু থেকে অদ্যাবধি যতজন কৃষিবিদ ও কৃষিবিজ্ঞানির মুখোমুখি হয়েছি তাঁদের বেশিরভাগেরই কথা হচ্ছে জৈব কৃষি আমাদের জন্য বিলাসিতা। কারণ, আমাদের এক নম্বর চ্যালেঞ্জ হচ্ছে প্রায় ১৭ কোটি মানুষের ক্ষুধার অন্ন যোগান দেওয়া। চ্যালেঞ্জ যেখানে, গবেষণার প্রয়োজন এবং উদ্ভাবনের সুযোগও সেখানে। কৃষি ও মৃত্তিকা বিজ্ঞানের একজন ছাত্র হিসেবে যে বিষয়টা আমাকে সর্বাধিক ভাবিয়ে তুলে সেটা হচ্ছে আমাদের মাটির বেহাল অবস্থা। এককালের “খাটি সোনার চেয়েও খাটি আমার দেশের মাটি” আজ প্রাণহীন মৃত মাটিতে পরিণত হয়ে গেছে। কারণ, জৈব পদার্থ হচ্ছে মাটির প্রাণ। একটি সুস্থ ও সজীব মাটিতে কমপক্ষে ৫% জৈব পদার্থ থাকা প্রয়োজন যা আমাদের অধিকাংশ মাটিতে ১% এরও নীচে নেমে গেছে। ফসলের অত্যাবশ্যক ১৭টি পুষ্টি উপাদানের যে ১৩ টি উপাদান মাটি থেকে আসে তার ৬-৭ টির ঘাটতি ইতোমধ্যে আমাদের মাটিতে প্রকট থেকে প্রকটতর হচ্ছে যেগুলো ত্রমবর্ধমান হারে রাসায়নিক সার প্রয়োগ করে পূরণ করতে হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে একসময় যখন মাটি জৈবপদার্থশূণ্য হয়ে পড়বে তখন তা মৃত মাটিতে পরিণত হবে। তখন এই মাটিতে ১৩ প্রকার রাসায়নিক সার দিয়েও ফসল ফলানো সম্ভব হবেনা। কারণ এই সারকে ফসলের জন্য গ্রহণোপযোগি করতেও জৈব পদার্থ অত্যাবশ্যক।

এটা হচ্ছে আমাদের সংকটের একটা দিক। অন্যদিকে আছে রাসায়নিক বালাইনাশক যা ফসল রক্ষায় ব্যবহৃত হয়। রাসায়নিক বালাই দমন ব্যবস্থায় পোকাকে পেস্ট বা শত্রুজ্ঞান করে হত্যা করা হয়। কিন্তু আমরা ভুলে যাই যে, এই পোকারাও এই ইকোসিস্টেমের অংশ। এই ইকোসিস্টেমই জীবজগতের চালিকাশক্তি। বিষয়টি সহজে বুঝার জন্য একে একটি রেডিওর সাউন্ডসিস্টেমের সাথে তুলনা করা যেতে পারে। রেডিওর সাউন্ড সিস্টেমের কোথাও কোন একটি আইসি নষ্ট হলে যেমন গোটা রেডিওটাই বিকল হয়ে পড়ে তেমনি আমরা যাকে পেস্ট বা বালাই বলি সেগুলো না থাকলে ইকোসিস্টেমও বিকল হয়ে পড়ে। আমাদের ইকোসিস্টেমের খাদ্য-শিকল অক্ষুণ্ণ রাখতে পোকামাকড় অত্যাবশ্যক। কারণ, এই পৃথিবীতে একমাত্র সবুজ উদ্ভিদই নিজের খাদ্য নিজে উৎপাদন করতে পারে যেখানে মানুষসহ বাকী সকল প্রাণিই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে উদ্ভিদের উপর নির্ভরশীল। এই খাদ্যকে ইকোসিস্টেমে পৌছে দিতে এই পোকামাকড়ই হলো প্রাথমিক পোষক। অবশ্য সমাজের দুষ্টু মানুষদের মত ক্ষতিকর পেস্টকে দমন করতে হবে, নির্মূল নয়। প্রাকৃতিক ইকোসিস্টেম অক্ষুন্ন থাকলে হয় এমনিতেই দমন হয় নয়তো কিছু প্রাকৃতিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে খুব সহজেই দমন করা সম্ভব হয়।

এই সিস্টেমের আরেকটি কম্পোনেন্ট হলো ম্যাক্রো ও মাইক্রোক্লাইমেট যার সাথে আলো-বাতাসসহ জলবায়ুগত নানান উপাদান জড়িত। এই উপাদানগুলোর অন্যতম হলো সূর্যের আলো যা পৃথিবীর সকল শক্তির আদি উৎস। এই শক্তিই খাদ্যের মাধ্যমে সমগ্র জীবজগতে সঞ্চারিত হয়। সৌরজগতের অংশ হিসেবে অন্যান্য গ্রহ এবং পৃথিবীর একমাত্র উপগ্রহ চন্দ্রসহ অন্যান্য মহাজাগতিক শক্তিগুলোর প্রভাবও থাকতে পারে যা নিয়ে পূর্বে আমার তেমন কোন ধারণা ছিলোনা যা বায়োডায়নামিক এগ্রিকালচারের অন্যতম অনুসঙ্গ। এদিক থেকে বায়োডাইনামিক এগ্রিকালচারকে অনেকে সাইন্টিফিকের চেয়েও স্পিরিচুয়াল বলতেই বেশি আগ্রহী। কসমোলজি বিজ্ঞানের বিরাট এক শাখা হলেও কসমিক ফোর্সের সাথে জীবজগতের নিবিড় যোগাযোগ সম্পর্কে খুব বেশি গবেষণা আছে বলে আমার অন্তত জানা নেই।

জৈব কৃষি, পারমাকালচার, রিজেনারেটিভ এগ্রিকালচার, ইকোলজিক্যাল এগ্রিকালচার, জিরোবাজেট ন্যাচারাল ফার্মি, স্থায়িত্বশীল কৃষি, বায়োডাইমানিক এগ্রিকালচার (বিডি) ইত্যাদি নানা নামে যেসব কৃষিচর্চা আছে তার মূলমন্ত্রই হচ্ছে এই প্রাকৃতিক ইকোসিস্টেমটাকে ঠিক রেখে ফসল উৎপাদন করা। জৈব কৃষি নিয়ে এতদিন কাজ করতে গিয়ে এই ইকোসিস্টেমটাকে সারিয়ে তোলা বা পুণপ্রতিষ্ঠার উপায় অনুসন্ধান করেছি। কিন্তু বায়োডাইনামিক কৃষিতে এসব টেকনিক্যাল ও প্রাকৃতিক বিষয়ের সাথে একটি অতিপ্রাকৃতিক বিষয়ও আছে যা সম্পর্কে এশিয়া-প্যাসিফিক বায়োডাইনামিক কনফারেন্সে এসে আরও গভীরভাবে জানা গেলো।

বিডি এগ্রিকালচারের অন্যতম মূল কথা হচ্ছে কসমিক ফোর্সের সাথে এই পৃথিবীর কৃষি-ইকোসিস্টেমের যে যোগসূত্র এবং ব্যালেন্স থাকা দরকার সেটা পূণঃপ্রতিষ্ঠা করা। মালয়াশিয়ার পাহাং রাজ্যের রাউব শহরে মালয়েশিয়া ডিমেটার এসোসিয়েশন(এমডিএ)-এর আয়োজনে ২০-২৪ অক্টোবর অনুষ্ঠিত এই সম্মিলনে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের ১৮টি দেশের প্রায় ১৫০ জন মানুষ অংশগ্রহন করে। মাটি বাংলাদেশ থেকে আমরা পাঁচ সদস্যের একটি দল অংশ নিয়েছিলাম। আশা করি এখান থেকে লব্ধ শিখন এবং অভিজ্ঞতাগুলো আগামিকত বেশ কাজে দিবে।

আজকের বাণিজ্যিক কৃষি ও আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা প্রসঙ্গ

আজকের বাণিজ্যিক কৃষি ও আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা প্রসঙ্গ

ভূমিকা: 

খাদ্য নিরাপত্তা শুধু ক্ষুধা মেটানোর জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য সহজলভ্য করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিটি মানুষের পুষ্টি চাহিদা পুরণের জন্য প্রয়োজনীয় দুষণমুক্ত খাদ্য পাওয়ার নিশ্চয়তাই হচ্ছে খাদ্য নিরাপত্তা। অর্থাৎ একটি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা তখনই নিশ্চিত হবে যখন সে দেশের প্রতিটি নাগরিক সুস্বাস্থ্য নিয়ে বেঁচে থাকার জন্য রাসায়নিক সার ও বালাইনাশক এবং অন্য কোন দুষণ থেকে মুক্ত পর্যাপ্ত পরিমাণ খাদ্য পাবে। অন্যদিকে, খাদ্য শুধু একটি পণ্য নয় বরং এটি কোন একটি জনগোষ্ঠীর নিজস্ব কৃষ্টি, সংস্কৃতি তথা জীবনাচারের সাথে সম্পৃক্ত বিষয়। কাজেই খাদ্য নিরাপত্তাকে অনেকে একটি স্থিতিশীল খাদ্য উৎপাদন ও সুষম বন্টন ব্যবস্থা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং সর্বোপরি একটি শান্তিময় সমাজ প্রতিষ্ঠার সাথে সম্পৃক্ত বিষয় হিসেবে দেখে থাকেন। এরূপ খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থায় উৎপাদন সংশ্লিষ্ট সকল বিষয়ের (যেমন: কৃষি জমি, বীজ, সার, পানি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি, জ্ঞান ইত্যাদি) উপর উৎপাদকের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ও অধিকারকে নিশ্চিত করবে। অথচ আজকাল বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তা বলতে কেবল দানাদার খাদ্যশস্যের সহজলভ্যতাকেই বুঝানো হচ্ছে। শুধু দানাদার খাদ্য দিয়ে যেমন মানুষের পুষ্টির চাহিদা মেটানো সম্ভব নয় তেমনি বর্তমান রাসায়নিক কৃষির মাধ্যমে বিষমুক্ত খাদ্যের যোগান দেওয়াও অসম্ভব। পক্ষান্তরে অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় এই যে, বর্তমান কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থায় প্রাকৃতিক সম্পদ, কৃষিজমি, বীজ, সেচের পানি, কৃষকের নিজস্ব জ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং অন্যান্য উপকরণ ইত্যাদি সবই আজ কোম্পানির একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে। প্রকারান্তরে গোটা কৃষি ব্যবস্থাই আজ কৃষকের হাতছাড়া যাচ্ছে যা শুধু কৃষকেরই নয় গোটা দেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে মারাত্মক হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

কৃষি খাদ্যের বাণিজ্যিকীকরণ কার স্বার্থে:

খাদ্য, পানি ও স্বাস্থ্য এসবই মানুষের মৌলিক অধিকার। ধনী-গরীব নির্বিশেষে এ পৃথিবীর প্রতিটি মানুষেরই সুস্বাস্থ্য নিয়ে বেঁচে থাকার মত ন্যুনতম পুষ্টি চাহিদা পুরণের জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপদ খাদ্য ও পানি পাওয়ার অধিকার আজ বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। অথচ প্রায় ৬০০ কোটি জনসংখ্যা অধ্যুষিত এ পৃথিবীর ১০০ কোটির বেশি মানুষই তাদের খাদ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত। তদুপরি, আজ খাদ্যের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ চলে যাচ্ছে গুটিকয়েক বহুজাতিক কোম্পানির হাতে। খাদ্যের উপর কোম্পানির একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হলে কোম্পানির মুনাফার অনন্ত ক্ষুধার আগুনে কোটি মানুষের খেয়ে বাঁচার অধিকার যে দগ্ধ হবে তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই।

খাদ্য প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য উপাদান। আর মানুষ প্রকৃতিরই সন্তান। সকল যুগেই এই বিশ্বের সকল মানুষ এবং অন্য সকল প্রাণির জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য প্রকৃতির মধ্যেই ছিল, প্রকৃতির মধ্যেই আছে। কিন্তু খাদ্যের অসম বন্টন ব্যবস্থার কারণেই সকল দেশে সকল যুগে বিপুল সংখ্যক মানুষ খাদ্য থেকে বঞ্চিত থেকেছে। একসময় মানুষ কোনরূপ উৎপাদন ছাড়াই প্রকৃতি থেকে তার প্রয়োজনীয় খাদ্য সংগ্রহ করতো। কিন্তু জনসংখ্যার ক্রমবৃদ্ধির কারণে মানুষকে খাদ্য উৎপাদন শুরু করতে হয়েছে এবং কালক্রমে তা বাণিজ্যের পণ্য হয়ে উঠেছে। আগে বাংলাদেশের মত স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতেই অধিকাংশ খাদ্য উৎপাদিত ও ক্রয়-বিক্রয় হত। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে খাদ্য উৎপাদন ও বাণিজ্যে নাটকীয় পরিবর্তন ঘটেছে। বর্তমানে খাদ্য শুধু নিছক বাণিজ্যের পণ্য নয় বরং আন্তর্জাতিক রাজনীতিরই একটি বড় নিয়ামক শক্তি হয়ে উঠেছে। কৃষিপ্রধান দেশ না হয়েও খাদ্যপণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে একচ্ছত্র কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে উত্তরের ধনী দেশগুলো। আর এ কাজে মূল ভূমিকা পালন করছে বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নতুন সংস্করণ সেসব দেশের বহুজাতিক কোম্পানিগুলো। যেহেতু কোম্পানির একমাত্র লক্ষ্য হলো মুনাফা অর্জন তাই খাদ্যের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণভার এসব বহুজাতিক কোম্পানির হাতে ছেড়ে দিয়ে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে কি-না তা নিয়ে সন্দেহের যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে।

বাংলাদেশে খাদ্য উৎপাদন বন্টন পরিস্থিতি:

এদেশে খাদ্য বলতে শুধু দানাজাতীয় খাদ্যকেই (চাল ও গম) হিসেবের মধ্যে ধরা হয় যা একটি চরম ভ্রান্ত ধারণা। কারণ, দানাদার খাদ্যশস্য মানুষের প্রধান খাদ্য হলেও খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্নে মানবদেহের পুষ্টির জন্য অত্যাবশ্যক সকল খাদ্যকেই বিবেচনায় নেওয়া জরুরী। তদুপরি, দেশের দানাজাতীয় খাদ্যের চাহিদা ও উৎপাদনের পরিসংখ্যানগত তথ্য নিয়েও মারাতœক বিভ্রাট লক্ষ করা যায় যা খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়ন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায়। প্রথমতঃ হালনাগাদ তথ্যের প্রাপ্যতা বিশেষ করে খাদ্য চাহিদাগত তথ্য মোটেও সহজলভ্য নয়। মজার ব্যাপার হচ্ছে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের খাদ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের ওয়েব সাইট, কৃষি মন্ত্রণালয়ের ওয়েব সাইট, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ওয়েবসাইট এমনকি স্বাস্থ্য মন্ত্রণায়ের ওয়েবসাইটের কোথাও খাদ্য ও পুষ্টির চাহিদাগতÍ কোন তথ্য সহজলভ্য নয় যা এদেশের পরিকল্পনা প্রণয়নে দৈন্যদশার চিত্রই ফুটে উঠে। দ্বিতীয়তঃ যা কিছু তথ্য পাওয়া যায় সেখানে কোন একটি উৎসের তথ্যের সাথে অপর কোন উৎসের তথ্যের ব্যাপক পার্থক্য লক্ষ করা যায়। তৃতীয়তঃ নির্দিষ্ট বছরের জনসংখ্যা এবং মাথাপিছু খাদ্যের চাহিদা থেকে দেশের মোট খাদ্য চাহিদা হিসাব করা হয়। কিন্তু, জনসংখ্যা ও মাথাপিছু খাদ্য চাহিদা নিয়েও রয়েছে বিরাট তথ্য বিভ্রাট। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে ২০১০ সালে দেশের জনসংখ্যা ১৪ কোটি ৬০ লক্ষ যদিও অনেকের মতে এটা ১৫ কোটি, কারও মতে ১৬ কোটি। অন্যদিকে, বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার আদর্শ মান অনুসারে মাথাপিছু দানাদার খাদ্যের চাহিদা প্রতিদিন ৩৯৭ গ্রাম এবং প্রকৃত গ্রহণ ৫০০ গ্রাম। পক্ষান্তরে, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির হিসেবমতে বাংলাদেশের মানুষ মাথাপিছু ৫০৪ গ্রাম (যদি মোট ২৪০০ কিলোক্যালরির ৭৫% দানাদার খাদ্য থেকে পেতে হয়) দানাদার খাদ্য গ্রহণ করে থাকে যদিও কোন কোন হিসাব মতে এই পরিমাণ আরও অনেক বেশি। এখন আমরা যদি দেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি এবং মাথাপিছু দানাদার খাদ্যের চাহিদা ৫০৪ গ্রাম ধরি তবে ২০০৯-১০ অর্থ বছরের জন্য দেশের খাদ্য চাহিদা দাড়ায় ২৯৬ লক্ষ মেট্রিক টন। অথচ, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০১০ অনুসারে ২০০৯-১০ অর্থ বছরে দেশে খাদ্য উৎপাদন ছিল ৩৬৯ লক্ষ মেট্রিক টন। অর্থাৎ ৭৩ লক্ষ মেট্রিক টন খাদ্য উদ্বৃত্ব থাকার কথা। অথচ ঐ বছরেই আরও প্রায় ২৪ লক্ষ মেট্রিক টন দানাদার খাদ্যশস্য আমদানী করা হয়েছে এবং বিদেশী সাহায্য হিসেবে এসেছে আরও ৬০ হাজার মেট্রিক টন খাদ্য। অর্থাৎ ২০০৯-১০ অর্থবছরে দেশে দানাদার খাদ্যের প্রাপ্যতা ছিল সর্বমোট ৩৯৩.৬ লক্ষ মেট্রিক টন। অর্থাৎ এই পরিমাণ খাদ্য যদি বাংলাদেশের মানুষ খেয়ে থাকে তবে প্রত্যেক মানুষ প্রতিদিন ৬৭৪ গ্রাম খাদ্য গ্রহণ করেছে যা থেকে প্রত্যেকে ২৪০৬ কিলোক্যালরি খাদ্যশক্তি পাওয়ার কথা যেখানে দারিদ্রসীমা হল ২১২২ কিলোক্যালরি !!! এই হিসাব যদি সত্য হয় তবে বাংলাদেশের দারিদ্র সত্যি সত্যিই যাদুঘরে চলে যাওয়ার কথা। কিন্তু তবুও পরিসংখ্যানের হিসাবে বাংলাদেশের কমপক্ষে ৪০% মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে অবস্থান করছে। খাদ্যের অসম বন্টন ব্যবস্থাই এর মূল কারণ। সুতরাং এটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না যে, খাদ্য থাকলেই সব মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। কাজেই এ মুহুর্তে যেকোন প্রকারে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক বিষযুক্ত দানাদার খাদ্যের উৎপাদন বৃদ্ধির চেয়ে বন্টন ব্যবস্থাকে ক্রুটিমুক্ত করা এবং শস্য বহুমুখীকরণের দিকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া উচিত। কারণ, দানাদার খাদ্যশস্য উৎপাদনের উপরোক্ত হিসাব যদি সঠিক হয় তবে আগামী ৩০-৩৫ বছর উৎপাদন না বাড়লেও সমস্যা হওয়ার কথা নয়।

আমাদের খাদ্যাভ্যাস খাদ্য নিরাপত্তা:

আমাদের খাদ্যাভ্যাস অত্যন্ত অবিবেচনাপ্রসূত, অবৈজ্ঞানিক ও হাজারো ভুল অভ্যাসে ঠাসা। যদিও খাদ্য গ্রহণের প্রধান বিবেচ্য বিষয় হওয়া উচিত দেহের পুষ্টি চাহিদা পূরণ করা, কিন্তু এ দেশের মানুষ খাদ্য গ্রহণ করে একেবারেই উদরপূর্তি ও রসনা তৃপ্তিকে প্রাধান্য দিয়ে। পুষ্টি সংক্রান্ত জ্ঞানের অভাবে যথেষ্ট সুযোগ থাকা সত্তে¡ও এদেশের মানুষ পুষ্টিহীনতায় ভোগে। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে, শিক্ষিত এমনকি উচ্চশিক্ষিত মানুষের মধ্যেও পুষ্টি জ্ঞান ও পুষ্টি সচেতনতার অভাব লক্ষণীয়।

আমরা ভেতো বাঙ্গালি, খাদ্য বলতে শুধু ভাতকেই বুঝে থাকি। বার্মা ও ভিয়েতনামের পর আমরা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ভাতখেকো জাতি। অন্যান্য দেশ, যেখানে ভাত প্রধান খাদ্য, সেখানেও মানুষ ভাত বেশি খায় তবে আমাদের থেকে অনেক কম। ইন্দেনেশিয়ায় একজন লোক বছরে গড়ে ১৫২ কেজি, ফিলিপাইনে ১১০ কেজি, চীনে ১০৩ কেজি এবং ভারতে ৭৯ কেজি চালের ভাত খায়। আর আমরা খাই ১৮৩ কেজি চালের ভাত। আমাদের খাদ্য গ্রহণের প্রধান লক্ষ্য থাকে কী করে মুখরোচক উপকরণ মিশিয়ে উদরপূর্তি করে ভাত খাওয়া যায়। আমাদের দানাদার খাদ্যের চাহিদা প্রতিদিন মাথাপিছু ৩৯৭ গ্রাম চালের ভাত অথচ আমরা খাই ৫০৪ গ্রামেরও বেশী। অন্যদিকে, আমাদের শাক-সব্জির চাহিদা প্রতিদিন মাথাপিছু ২১৩ গ্রাম অথচ আমরা খাই মাত্র ৫৩ গ্রাম। এক্ষেত্রে শুধু শাক-সব্জির অভাব বা দারিদ্রতা নয়, আমাদের সচেতনতার অভাবই প্রধানত দায়ী।

পুষ্টিকর ভাল খাদ্য বলতে আমরা মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, বিদেশী জাতের শাক-সব্জি ও ফলমূল ইত্যাদি দামী খাবারকেই বুঝে থাকি যা একবারেই সঠিক নয়। আমরা যেদিন ভাল খাবারের আয়োজন করি সেখানে মাছ, কয়েক ধরণের মাংস, ডিম, দুধ বা দই এসবকিছু একসাথে খেয়ে উদর ঠেসে পূর্ণ করি যা একদিকে অর্থের অপচয় অন্যদিকে তেমনি স্বাস্থ্যের জন্যও ক্ষতিকর। এই ভ্রান্ত ধারণা থেকেই আমরা মনে করে থাকি যে, বাংলাদেশের দরিদ্র মানুষের পক্ষে এসব খাবার কিনে খাওয়া সম্ভব নয় তাই তারা পুষ্টিহীনতায় ভোগে। প্রকৃত প্রস্তাবে, পুষ্টিকর খাদ্য বা ক্রয় ক্ষমতার অভাব নয় বরং পুষ্টি সম্পর্কে আমাদের চরম অজ্ঞতা ও অসচেতনতা এবং মিথ্যা আভিজাত্যের ভড়ংই এদেশের মানুষের পুষ্টিহীনতার প্রধান কারণ। খাদ্য সাহায্যের জন্য বিদেশীদের কাছে ভিক্ষা মাগতে আমাদের লজ্জাবোধ হয়না কিন্তু কচুর মত অত্যন্ত পুষ্টিকর শাক খেলে আমাদের মান-সন্মান থাকে না। বিভিন্ন প্রকার কচু ছাড়াও গ্রামাঞ্চলে থানকুনি, তেলাকুচা, পিপুল, আমরুল, সজনে পাতা, বথুয়া, পুনর্ণভা, শান্তি শাক, নটে শাক, হেলেঞ্চা, গনোরি, কলমি, গ্যাটকল ইত্যাদি অসংখ্য শাক-সব্জি পাওয়া যায় যেগুলো চাষ করতে হয়না এবং এসব শাক-সব্জিতে কোন প্রকার ক্ষতিকর রাসায়নিক সার বা কীটনাশকও থাকে না। অথচ পুষ্টি মানের দিক থেকে যেকোন দামী শাক-সব্জি থেকে এগুলো কোন অংশে কম নয়। তদুপরি এগুলোর রয়েছে ঔষধি গুণাগুণ। অথচ, আজ এদেশের মানুষের ভিটামিনের অভাব দূর করে অন্ধত্বের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য ধানের মধ্যে ভিটামিন-এ ঢুকিয়ে আমাদের ভিটামিনের অভাব দূর করার এক হাস্যকর যুক্তি দেখিয়ে ‘গোল্ডেন রাইস’ তৈরি করা হচ্ছে। গোল্ডেন রাইসের ভাত খেয়ে যদি ভিটামিন-এ এর অভাব দূর করতে হয় তবে একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের দৈনিক গড়ে প্রায় ৭.৫ কেজি চালের ভাত খেতে হবে তাও যদি শরীর সবটা হজম করতে পারে। প্রতি ১০০ গ্রাম গোল্ডেন রাইস থেকে মাত্র ৩০ মাইক্রোগ্রাম বিটাক্যারোটিন বা ভিটামিন-এ পাওয়া যাবে। অথচ, আমাদের দেশী জাতের লাল চালেও এর চেয়ে আনেক বেশি বিটাক্যারোটিন আছে যেসব ধান আজ বিলুপ্তির পথে। বনে-বাদাড়ে অবহেলায় পড়ে থাকা ১০০ গ্রাম হেলেঞ্চা শাকে ১৩৭০০ মাইক্রোগ্রাম, থানকুনি শাকে ১৩১০০ মাইক্রোগ্রাম, কলমী শাকে ১০৭৪০ মাইক্রোগ্রাম, কালোকচু শাকে ১২০০০ মাইক্রোগ্রাম এবং সবুজকচু শাকে ১০২৭৮ মাইক্রোগ্রাম বিটাক্যারোটিন আছে। যেসব গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কথা চিন্তা করে গোল্ডেন রাইস তৈরি করা হচ্ছে তাদের আশেপাশে ভিটামিন-এ সমৃদ্ধ এরূপ অসংখ্য খাদ্যবস্তু রয়েছে যা অসচেতনতার জন্য মানুষ খায়না।

অনুরূপভাবে আতা, শরিফা, বেল, কদবেল, পেয়ারা, আমড়া, কামরাঙ্গা, কাঠাল, পেপে, জাম, জামরুল, সফেদা, আমলকি, তেতুল, কুল, ডালিম ইত্যাদি বহু ধরণের দেশী ফল পুষ্টিমানের বিচারে কমলা, আপেল, আঙ্গুর, বেদানা ইত্যাদি যেকোন বিদেশী ফল থেকে কোন অংশেই কম নয়। তা ছাড়া এসব বিদেশী ফলমূল সংরক্ষণে প্রচুর পরিমাণে বিষাক্ত রাসায়নিক দ্রব্য প্রয়োগ করা হয় যা আমরা সবাই জানি। অথচ আমরা আভিজাত্যের মিথ্যা অহংকার দেখাতে গিয়ে এসব দেশী ফলগুলোকে হেলাফেলা করি যা একবারে মুর্খতা ছাড়া আর কিছুই নয়। আজ এরূপ মিথ্যা অহংকারভরা মুর্খতা আমাদের মন-মগজে চেপে বসেছে যা আমাদের খাদ্য নিরাপত্তাকে অযথাই হুমকির মধ্যে ফেলে দিচ্ছে, তুলে দিচ্ছে কোম্পানির হাতে। কাজেই আজ সর্বাগ্রে প্রয়োজন মানুষের পুষ্টি সচেতনতা সৃষ্টি ও খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের উপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া।

খাদ্যের ঘাতক রূপ এবং খাদ্য নিরাপত্তা:

যে খাদ্য আমাদেরকে সুস্থ্য রাখবে, আমাদের জীবন বাঁচাবে সে খাদ্যই আজ আমাদের নানারকম রোগ-ব্যাধি ও প্রাণনাশের বড় কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে। আমাদের দেহের পুষ্টির চাহিদা মিটানোর জন্য প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণ শাক-সব্জি ও ফলমূলসহ সুষম খাদ্য গ্রহণ করা অত্যন্ত— জরুরী। কিন্তু আমরা খাদ্য গ্রহণের নামে প্রতিদিন জেনে বা না জেনে বিষ সেবন করে চলেছি। কারণ, শাক-সব্জি ও ফলমূলসহ এসব খাদ্যে উৎপাদন পর্যায় থেকে শুরু করে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে মিশানো হচ্ছে নানাবিধ বিষাক্ত কীটনাশক ও রাসায়নিক দ্রব্য। আধুনিক জাতের উচ্চফলনশীল, হাইব্রিড ও জিএম শাক-সব্জিসহ অন্যান্য ফসল ও ফলমূল উৎপাদন করতে গিয়ে দফায় দফায় প্রয়োগ করা হচ্ছে বিষাক্ত কীটনাশক, মাকড়নাশক, ছত্রাকনাশক, আগাছানাশক ইত্যাদি। খাদ্যের সাথে এসবই আমাদের দেহে ঢুকছে। আবার, এসব শাকসব্জি ও ফলমূল দীর্ঘদিন সংরক্ষণ এবং ফলমূল পাকানোর জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে কার্বাইড ও ইথারেলসহ নানাবিধ বিষাক্ত পদার্থ। মাছ সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে বিষাক্ত ফরমালিন। ক্রেতাদের আকৃষ্ট করার জন্য শাকসব্জি ও ফলমূলে মেশানো হচ্ছে বিষাক্ত রঞ্জক দ্রব্য। ফলে, একদিকে যেমন আমাদের দেহে নানাবিধ রোগ-ব্যাধি দেখা দিচ্ছে অন্যদিকে জীবনী শক্তি ও আয়ুষ্কালও হ্রাস পাচ্ছে। আজ আমরা বাধ্য হচ্ছি বাবা বা মা হয়ে প্রাণপ্রিয় সন্তানের মুখে স্বহস্থে বিষ তুলে দিতে-এর চেয়ে অসহায় অবস্থা আর কী হতে পারে!

পানির বাণিজ্যিকীকরণ খাদ্য নিরাপত্তার জন্য আরেক হুমকি:

খাদ্যের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে পানি। তাই, খাদ্য নিরাপত্তার নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত নিরাপদ পানি পাওয়ার নিশ্চয়তা বিধান করাও জরুরী। অথচ, নিরাপদ পানির ক্রমবর্ধমান সংকট আজ সারাবিশ্বে কোটি কোটি মানুষের জীবন-মরণ সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। চিন্তাবিদদের এই আশংকা মোটেই অমূলক নয় যে, পৃথিবীতে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বাধলে তা হবে পানি নিয়েই। প্রকৃতির পানিকে দুষিত করে বিত্তশালীরা এখন মিনারেল ওয়াটারের দিকে ঝুঁকছে। আগামী দিনে পানিই হবে মহামূল্যবান পণ্য। এই গরীব দেশেই পানি আজ দুধের দামকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। যে মানুষ পেটের দায়ে নিজের গাভীর দুধ নিজেই খেতে পারেনা সে উচ্চমূল্যে পানি কিনে খেতে পারবে এমনটা ভাবাই অবান্তর। অথচ বাস্তবে তাই ঘটতে যাচ্ছে। বর্তমানে আর্সেনিক দুষণ সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে যে পানি গ্রামীণ জনগোষ্ঠী প্রতিনিয়ত খাচ্ছে। দুষিত পানি পান করে ধুকে ধুকে মরা অথবা পানিবিহীন মরা অর্থাৎ মৃত্যুই যেন আমাদের নিশ্চিত পরিণতি।

পানি সংকট এখন জলবায়ুগত ও রাজনৈতিক ইস্যু। বিজ্ঞানীদের ধারণা বিশ্বব্যাপী পানি স্বল্পতার শতকরা ২০ ভাগের জন্য দায়ী হবে জলবায়ু পরিবর্তন। বনভূমি ও জলাভূমি ধ্বংসের কারণে পৃথিবীর অনেক দেশেই নিরাপদ পানির মারাতœক সংকট দেখা দিবে। নিরাপদ পানি স্বল্পতার আর একটি প্রধান কারণ পরিবেশ দুষণ। কারণ, প্রতিবছর দুই মিলিয়ন টন শিল্পবর্জ্য ও রাসায়নিক দ্রব্য, মানববর্জ্য, রাসায়নিক সার ও কীটনাশক পানিতে মিশছে (ইউএনডব্লিওএফপি ২০০৩)। গরীবরা এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। কারণ, উন্নয়নশীল দেশের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠীই এই দুষিত পানি ব্যবহার করছে।

বর্তমানে পানি ব্যবসায়ী কোম্পানীগুলো বিশ্বের মাত্র ৫% জনসংখ্যার পানির চাহিদা মেটাচ্ছে আর তাতেই মাত্র চারটি বৃহৎ কোম্পানির ২০০১ সালের মোট আয় ছিল ২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। তাই সারা বিশ্বের পানিখাত বেসরকারীকরণের জন্য উঠেপড়ে লেগেছে বহুজাতিক কোম্পানির পৃষ্ঠপোষক সংস্থা বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা। উন্নয়নশীল দেশসমূহের পানি নীতিকে বেসরকারীকরণের অনুকূল করার জন্য ঋণের সাথে বিভিন্ন শর্ত জুড়ে দিয়ে এসব সংস্থা ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করছে। আর সেবাখাত উদারীকরণ চুক্তির (গ্যাটস) মাধ্যমে পানিখাত বেসরকারীকরণের সকল বাধা দূর করছে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর চাপে মোজাম্বিক, বেনিন, নাইজার, রুয়ান্ডা, তাঞ্জানিয়া, ক্যামেরন এবং কেনিয়াসহ বেশকিছু দেশ ইতোমধ্যেই তাদের পানিখাত বেসরকারীকরণ করতে বাধ্য হয়েছে। কাজেই, এ ব্যাপারে সময়মত সাবধান হওয়া আমাদের জন্য অত্যন্ত জরুরী।

আশু করণীয়:

আজ এদেশের কৃষি ও কৃষকের এরূপ সংকট মোকাবেলা করা এবং বর্তমান ও ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য পুষ্টিকর ও নিরাপদ খাদ্য প্রাপ্তির নিশ্চয়তা অর্থাৎ খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজন একটি স্থায়িত্বশীল কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলা যার কারিগরি কৌশল হবে জৈব কৃষি চর্চা। কিন্তু বাংলাদেশের মত একটি জনবহুল দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্যের জোগান দেওয়া জৈব কৃষির পক্ষে আদৌ সম্ভব কি-না তা নিয়ে দেশের নীতিনির্ধারক মহল থেকে শুরু করে অনেকের মাঝেই যথেষ্ট সন্দেহ লক্ষ করা যায়। এক্ষেত্রে, গত ৩-৫ মে ২০০৭ জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) আয়োজিত ““Organic Agriculture and Food Security”” শীর্ষক একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বিশেষজ্ঞদের অভিব্যক্তি প্রনিধানযোগ্য। সেখানে বলা হয়েছে যে, জৈব কৃষি সারা বিশ্বের প্রতিটি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্ষম। বিজ্ঞানী Badgley et. al. 2007;  Halberg et. al. 2006; সাম্প্রতিককালে একটি তাত্ত্বিক মডেল দিয়েছেন যাতে দেখানো হয়েছে যে, এই মডেলের ব্যবহার দক্ষতার উপর ভিত্তি করে বর্তমানের মোট আবাদী জমির পরিমান ও ফলন না বাড়িয়েও জৈব কৃষির মাধ্যমে বিশ্বের প্রতিটি মানুষের জন্য প্রতিদিন ২৬৪০ থেকে ৪৩৮০ কিলোক্যালরি খাদ্য যোগান দেওয়া সম্ভব।

জৈব কৃষি চর্চার মাধ্যমে এদেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয় – এমন ধারণা যারা পোষণ করেন তারা প্রকৃতপক্ষে চলমান ভোগবাদী আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার প্রেক্ষাপটেই এমনটি করেন। যেমন: রোজার শিক্ষা হল সংযম বা ভোগকে নিয়ন্ত্রণ করা। তাই যদি হয় তবে সঙ্গত কারণেই রমজান মাসে ভোগ কম হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখি, রমজান মাসে আমাদের ভোগের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। ভোগ্যপণ্যের চাহিদা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধির ফলে বাজারে দ্রব্যমূল্যের আগুন ছড়িয়ে পড়ে। আর তাই দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চারিদিকে হৈচৈ পড়ে যায়। অথচ দ্রব্যমূল্য নিয়ে হৈচৈ করার চেয়ে  আমাদের ভোগ নিয়ন্ত্রণ করা অধিক জরুরী।

অন্যদিকে, আমরা জানি, উদ্ভিদই কেবল নিজের খাদ্য নিজে তৈরি করতে পারে। কাজেই এই বিশ্বভ্রহ্মান্ডের সকল জীবই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে তার খাদ্যের জন্য উদ্ভিদের উপর নির্ভরশীল। এখন যে পোকামাকড় এই উদ্ভিদ (মাঠ ফসল, ফলজ ও বনজ বৃক্ষ ইত্যাদি) থেকে খাদ্য শিকলে খাদ্য সরবরাহের কাজটি করে তাকে শক্রু জ্ঞান করে কীটনাশক প্রয়োগ করে ধ্বংস করার ফলে গোটা খাদ্য-জাল বিঘিœত হচ্ছে। ধ্বংস হচ্ছে বিশ্বভ্রহ্মান্ডের জীববৈচিত্র্য। কাজেই, ফসল রক্ষার প্রচলিত ধ্যান-ধারণা থেকে আমাদেরকে বেরিয়ে আসতে হবে। আমাদেরকে বুঝতে হবে, উদ্ভিদ যে খাদ্য তৈরি করছে তা একমাত্র মানুষের ভোগের জন্যই নয়। কাজেই, স্থায়িত্বশীল কৃষি প্রকৃতপক্ষে একটি দর্শন যা সাদামাটাভাবে ফসলের ফলন বা পরিমানগত উৎপাদন দিয়ে বিচার করলে চলবে না।

তা ছাড়া, জৈব কৃষি চর্চায় ফসলের ফলন কমবে সে ধারণাও অমূলক। আজকে যারা জৈব কৃষিকে অসম্ভব মনে করছেন তারা আসলে বর্তমান প্রচলিত কৃষির ফলে সৃষ্ট সমস্যা ও সংকটের প্রেক্ষাপটেই এমন ধারণা পোষণ করে থাকেন। গত প্রায় অর্ধ-শতাব্দী ধরে রাসায়নিক কৃষি চর্চার ফলে আমাদের মাটি, পরিবেশ, ইকো-সিস্টেম এবং আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার যে রূপান্তর ঘটেছে সেখানে শুধু টনের হিসেবে জৈব সার প্রয়োগ করেই রাতারাতি ফলাফল প্রত্যাশা করাটাই অযৌক্তিক। এজন্য একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আমাদের মাটির স্বাস্থ্যের উন্নয়ন ও ফসলের ইকোসিস্টেম পুণঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। জৈব কৃষি চর্চায় উৎপাদনশীলতা নির্ভর করে ফসলের সার্বিক ব্যবস্থাপনাগত দক্ষতার উপর। মাটির স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা, ফসল ব্যবস্থাপনা, সেচ ব্যবস্থাপনা, পোকা-মাকড় ও অন্যান্য বালাই ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি কাজগুলো দক্ষতার সাথে করতে পারলে জৈব কৃষিতে শুধু স্থায়িত্বশীল ফলনই নিশ্চিত হবেনা, উৎপাদনশীলতা এবং সার্বিক লাভও বৃদ্ধি পাবে। আর এজন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং তার জন্য সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ ও বান্তবায়ন করা।

কৃষি বাজেটে ক্ষুদ্র কৃষক  ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের  সুরক্ষার ব্যবস্থা থাকা জরুরী

কৃষি বাজেটে ক্ষুদ্র কৃষক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সুরক্ষার ব্যবস্থা থাকা জরুরী

ভূমিকা: 

জাতীয় বাজেট একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ দলিল যাতে একদিকে যেমন দেশের জাতীয় উন্নয়ন নীতিমালা ও পরিকল্পনার প্রতিফলন ঘটে অন্যদিকে এর প্রত্যক্ষ ও ব্যাপক প্রভাব জাতীয় এবং ব্যক্তি জীবনের সর্বত্রই পড়ে। স্থায়িত্বশীল উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং মধ্যম আয়ের দেশে উত্তীর্ণ হওয়ার সোপানে পদার্পন করা বাংলাদেশের জন্য জাতীয় বাজেট নিয়ে সর্বমহলে আলোচনা তাই অত্যন্ত গুরুত্ববহ। আমরা জানি, বাংলাদেশের অর্থনীতি মূলত কৃষি, তৈরি পোশাক, আর র‌্যামিট্যন্সের উপর দাড়িয়ে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার পথ পাড়ি দিচ্ছে। অন্য খাতগুলোর তুলনায় জিডিপিতে কৃষিখাতের ক্রমহ্রাসমান অবদান সত্তে¡ও বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে কৃষির অবদান এখনও সর্বাধিক। বিশ্বব্যাংকের হিসেব মতে এখনো বাংলাদেশের শতকরা প্রায় ৬২ ভাগ মানুষের জীবন-জীবিকা কোন না কোন ভাবে কৃষির উপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশ শ্রমশক্তি জরিপ (২০১৬-১৭) এর হিসাব মতে, দেশের মোট শ্রমমক্তির ৪০.৪ শতাংশ এখনো কৃষিতে নিয়োজিত আছে যারা দেশের পিছিয়েপড়া দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বৃহত্তর অংশ এবং যাদের স্থায়িত্বশীল উন্নয়ন কৃষির উন্নয়নের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত। কিন্তু প্রতিবছর জাতীয় বাজেটের আকার লম্ফ দিয়ে বাড়লেও তাতে কৃষি ও তৎসংশ্লিষ্ট খাত সমূহের বরাদ্ধ ক্রমহ্রাসমান যা অত্যন্ত হতাশাজনক।

দেশের অর্থনীতিতে করোনাজনিত ব্যাপক অভিঘাতের মধ্যে বিগত ২০২০-’২১ এবং ২০২১-’২২ এই দুই অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করা হলেও এবারের বাজেট ঘোষণা করোনামুক্ত পরিবেশেই হবে বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু করোনার অভিঘাত এখনও ব্যাপকভাবে বিরাজমান। তদুপরি, মরার উপর খাড়ার ঘা রূপে আবিভর্‚ত হয়েছে রাশিয়া-ইউক্রেন কিংবা রাশিয়া-ন্যাটো যুদ্ধ যার নেতিবাচক প্রভাব বাংলাদেশসহ সারাবিশে^ই ব্যাপকতর হচ্ছে। সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রভাব দেখা দিচ্ছে বিশ^ খাদ্য বাজারে। এমনিতেই খাদ্যদ্রব্যসহ প্রায় সকল নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধিতে জনজীবন অতিষ্ট। এমতাবস্থায়, দেশের খাদ্য নিরাপত্তা তথা সম্ভাব্য খাদ্য সংকট বিবেচনায় আসন্ন বাজেটে কৃষিখাত বাড়তি মনোযোগ দাবী করে। কারণ, সকল সংকটকালে কৃষিই আমাদের রক্ষাকবচ হিসেবে ভ‚মিকা রেখে চলেছে। বহু গবেষণা ও নির্ভরযোগ্য তথ্য অনুসারে করোনাকালে দেশে কোটিপতির সংখ্যা বাড়লেও বেশিরভাগ মানুষের আয় কমেছে, বেড়েছে দারিদ্র। লকডাউনকালে তৈরি পোষাকসহ রপ্তানি খাত, র‌্যমিট্যান্স আয়, ব্যবসা-বাণিজ্য সর্বত্র যখন চরম মন্দা নেমে এসে স্থবির হয়ে পড়েছিল দেশের অর্থনীতির চাকা, যখন দেশের শিল্প ও সেবাখাত থেকে কাজ হারিয়ে এবং প্রবাসী শ্রমিকদের মধ্য থেকেও প্রচুর সংখ্যক মানুষ কাজ হারিয়ে কৃষির উপর বাড়তি চাপ নিয়ে গ্রামে ফিরে এসেছিল কৃষিখাত তখন দেশের অর্থনীতির ঢাল হয়ে দাড়িয়েছিল। করোনাকালে একদিকে মহামারীতে ব্যাপক প্রাণহানির আশংকা অন্যদিকে চরম খাদ্য ও অর্থনৈতিক সংকটের আতঙ্কের মধ্যে একমাত্র আশার প্রদীপ জাগিয়ে রেখেছিল দেশের কৃষিখাত।

সঙ্গত কারণেই বিগত বছরগুলোর বাজেট বক্তৃতাসহ সকল অর্থনৈতিক দলিল এবং কেতাবি আলোচনায় কৃষিখাত এখনও নীতি নির্ধারক মহলে দেশের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবেই বিবেচিত হতে দেখা যায়। কারণ, দেশের ১৭ কোটি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্নে কৃষির গুরুত্ব কম করে দেখার কোন সুযোগ নেই। অথচ বিগত বছরগুলোর বাজেট পর্যালোচনা করলে এক হতাশাজনক চিত্রই ফুটে উঠে। ২০০৯-১০ অর্থবছরে জাতীয় বাজেটের আকার ছিল মাত্র ৯৪ হাজার কোটি টাকা যা ২০২১-২২ অর্থ বছরে বেড়ে দাড়িয়েছে ৬ লক্ষ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা। পক্ষান্তরে, ২০০৯-১০ অর্থবছরে জাতীয় বাজেটে কৃষি ও তৎসংশ্লিষ্ট খাতের অংশ ছিল ১০.৯% যা চলতি ২০২১-২২ অর্থ বছরে মাত্র ৫.৩ শতাংশে (লেখচিত্র-১ ও ২) নেমে এসেছে যার অবস্থান বাজেটের ১৫টি খাতের মধ্যে নবম। কাজেই, মুখে বা কেতাবে যাই বলা বা লেখা হউক না কেন জাতীয় বাজেটে কৃষিখাত বরাবরই উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে। সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত থেকেছে ক্ষুদ্র চাষীর (ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষক একসাথে) স্বার্থ যারা কৃষক জনগোষ্ঠীর শতকরা প্রায় ৯৬ ভাগ (লেখচিত্র-৩)।

অবশ্য এমন উপেক্ষার হয়ত সঙ্গত কারণও আছে। কারণ, এই শ্রেনীর কৃষকেরা অনেকটা প্রাচীনকালের দাসেদের মত কৃষিতে শ্রম দিয়ে গেলেও বিনিময়ে তাঁদের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি খুব সামান্যই। তাদের অধিকার নিয়ে দরকষাকষি করার মত কোন সংগঠন নেই, নেতৃত্ব নেই যেমনটা আমরা দেখি ব্যবসায়িদের বেলায়। যেমন, করোনা লকডাউনকালে ব্যসায়িদের জন্য সরকার দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষনা করলেও প্রথমদিকে কৃষকেরা ছিল সম্পূর্ণই উপেক্ষিত যদিও লকডাউনের অভিঘাত কৃষকদের উপর যথেষ্টই পড়েছিল। অসংখ্য কৃষক সব্জি বিক্রী করতে না পারায় ক্ষেতেই নষ্ট হতে দেখা গেছে। বিপুল সংখ্যক পোল্ট্রি ও লেয়ার খামারি খামার বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে। পরপর দু’টি কোরবানি ঈদে গরুর দাম না পেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে লাখো কৃষক। অতপর সোশাল মিডিয়া, মেইনস্ট্রিম মিডিয়াসহ নানান মহলের চাপে সরকার শেষ পর্যন্ত ৫০০০ কোটি টাকার ঋণ প্রণোদনা ঘোষণা করলেও তার তেমন কোন সুফল ক্ষুদ্র কৃষকের ঘরে যায়নি। অথচ দেশের প্রধান খাদ্য যোগানদাতা হলেও অদ্যাবধি, তাঁরা দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সিংহভাগের প্রতিনিধিত্ব করে এবং তাঁরাই সর্বাধিক খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে থাকে। দিনভর প্রাণান্ত পরিশ্রম করে, উচ্চমূল্যে কৃষি উপকরণ ও প্রযুক্তি ক্রয় করে, সকল প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা কাধে নিয়ে তারা যে ফসল ফলায়, দিনের পর দিন তার লাভজনক মূল্য না পাওয়ায় দেশে উন্নয়নের জোয়ার বইলেও তাদের উন্নয়নের স্বপ্ন মাথাকুড়ে মরে। অন্যদিকে, দিনদিন কৃষির যে রূপান্তর পরলক্ষিত হচ্ছে তাতে এঁদের ব্যাপক অংশ ফিবছর কৃষি থেকে বিতারিত হয়ে দাসত্বের রূপ বদলে গ্রামবাসি থেকে বস্তিবাসীতে পরিণত হচ্ছে। জাতীয় উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় এরূপ বৈষম্য দূরীকরণ রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত আমাদের সংবিধানের মূল চেতনা হলেও জ্ঞাত বা অজ্ঞাত কারণে সেদিকটা উপেক্ষিতই থেকে যাচ্ছে।

স্মরণ করা যেতে পারে যে, বর্তমান সরকার কর্তৃক ২০০৮ সালের নির্বাচনের প্রাক্কালে প্রণীত নির্বাচন মেনিফেস্টু এবং ক্ষমতায় আসীন হওয়ার পরবর্তী বাজেট থেকেই কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়ন এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতের বিকাশকে আগ্রাধিকার দেয় যা বেশ আশা জাগিয়েছিল। কারণ, জনসংখ্যার ঘনত্বের দিক শীর্ষে থাকা গ্রামপ্রধান এবং কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের জন্য কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়ন এবং এসএমই খাতের উন্নয়নের কোন বিকল্প নেই। সেসময় সরকারের পক্ষ থেকে খাদ্য নিরাপত্তাকেও সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল যার সুফল হিসেবে দেশ আজ খাদ্যে (যদিও মূলত দানাজাতীয় খাদ্যে এবং এখনও আমদানি নির্ভরতা আছে) স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে এবং দেশে ফসল, ফল ও মৎস্যসহ কৃষি উৎপাদন অনেকাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ^ব্যাংকের চাপে গৃহীত ভ্রান্ত নীতির ফলস্বরূপ দেশের মৃতপ্রায় পাটখাতের পূণরুজ্জীবনে বর্তমান সরকার বেশকিছু ভাল পদক্ষেপ নিয়েছিল। দেশের কৃষির স্থায়িত্বশীল উন্নয়নে “একটি বাড়ি একটি খামার” ও “সমন্বিত কৃষি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি প্রকল্প”-এর মত বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পও গ্রহণ করা হয়েছিল। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে “বাংলাদেশ কান্ট্রি ইনভেস্টমেন্ট প্লান (সিআইপি ২০০৯) প্রণয়ণ ও বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল। সরকারের এসব উদ্যোগ সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য হলেও প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কারের অভাবে সেগুলো যথেষ্ট পরিমাণ সুফল দিতে পারেনি।

এটা অনস্বীকার্য যে, সরকার কর্তৃক গৃহীত কৃষির বাণিজ্যিকায়নের নীতির ফলেই কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এমন সাফল্য এসেছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এরূপ সাফল্যের পিছনে কৃষকের প্রাণান্ত পরিশ্রম এবং অসামান্য অবদানকে অনেকসময় গুরুত্ব সহকারে দেখা হয়না। তাছাড়া, সরকারি এসব নীতি কৃষিবান্ধব বলা হলেও কতটা কৃষকবান্ধব সেটা নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। কারণ, সমস্ত সরকারি নীতি ও পরিকল্পনার সুফল বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ব্যবসায়িদের ঘরে উঠতে দেখা যায়। পক্ষান্তরে খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে যাদের মূখ্য অবদান সেই ক্ষুদ্র কৃষক ক্রমাগতভাবে তার উৎপাদিত ফসলের লাভজনক মূল্য থেকে বঞ্চিত হয়। দেশের ব্যবসায়ি মহল এবং বৈদেশিক দাতা দেশ ও সংস্থাগুলোর পরামর্শে বা চাপে গৃহীত নীতির (যেমন, ভর্তুকী দিতে বারণ করা এবং মুক্ত বাজার নীতি অনুসরণে বাধ্য করা যদিও তারা নিজেরাই তা করেনা) ফলে অবাধ বানিজ্যের প্রতিযোগীতায় ক্ষুদ্র কৃষকেরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। উৎপাদন বাড়লেও উৎপাদন উপকরণের মূল্য বৃদ্ধির ফলে কৃষক কৃষি থেকে কদাচিৎ লাভ পায়। সুখবর হচ্ছে গত দুই বছর যাবৎ উৎপাদন মৌসুমেও কৃষকরা ধানের ভালো দাম পেয়েছে। অবশ্য কৃষকদের এই সামান্য লাভের খেসারত দিতে হয়েছে দরিদ্র ভোক্তাদেরকেই। কারণ, চালের বাজার এখন আকাশচুম্বি যা ধানের বাজারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

সাম্প্রতিক সময়ে কৃষির সামগ্রিক নীতি ও পরিকল্পনায় কৃষির বাণিজ্যিকীকরণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এসব নীতি ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নকল্পে খামার ভিত্তিক চাষাবাদকে উৎসাহিত করেছে যেমন: পোল্ট্রি খামার, মৎস্য খামার, দুগ্ধ খামার ইত্যাদি। বিদেশি ও হাইব্রিড জাত নির্ভর এরূপ খামারভিত্তিক চাষাবাদে (ইংরেজিতে যাকে মনোকালচার বলা হয়) বিপন্ন হচ্ছে দেশের হাজার বছরের স্থায়িত্বশীল, সমন্বিত এবং জৈব কৃষি। ধ্বংস হচ্ছে জীববৈচিত্র এবং ইকোসিস্টেম যা আমাদের জলবায়ু সংবেদনশীলতা বাড়িয়ে তুলছে। বিপন্ন হচ্ছে মাটির স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও মানব স্বাস্থ্য। আজ আমাদের ক্রমবর্ধমান ও অপরিসীম ক্ষুধা মিটাতে গিয়ে যে কৃষিকে আমরা খোরপোশের কৃষি বা সাবসিস্টেন্স ফার্মিং আখ্যা দিয়ে ঝেটিয়ে বিদায় করে দিচ্ছি তার খেসারত নিশ্চয় একদিন আমাদেরকে দিতে হবে যদিও সেদিন হয়ত করণীয়টা খুব বেশি কঠিন হয়ে উঠবে। যাহোক, এরূপ বাণিজ্যিক কৃষির প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকেরা। একদিকে জলবায়ু সহনশীল ও স্থায়িত্বশীল কৃষির কথা বলা হলেও “হাই ইনপুট, হাই আউটপুট” কৃষি উৎপাদন প্রযুক্তি সম্প্রসারণে সর্বশক্তি নিয়োগ করা হয়েছে। কিন্তু কৃষি অর্থনীতির “ক্রমহ্রাসমান প্রান্তিক উৎপাদন বিধি” বিবেচনায় নিলে এরূপ কৃষি স্বল্পমেয়াদে বেশি উৎপাদনশীল মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে স্থায়িত্বশীল নয়। কারণ, কৃষি উৎপাদন উপকরণ (যেমন: রাসায়নিক সার, বালাইনাশক, হরমোন, ভিটামিন ইত্যাদি)-এর ব্যবহার ক্রমাগতভাবে বৃদ্ধি করার ফলে একটা পর্যায় পর্যন্ত উৎপাদন বাড়লেও একসময় স্থিতাবস্থায় পৌছানোর পর প্রান্তিক উৎপাদন ক্রমশ হ্রাস পেতে থাকে। অর্থাৎ উৎপাদন ব্যয় ক্রমশ বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে কৃষি আর কৃষকের জন্য লাভজনক থাকেনা। এমন কৃষি ব্যবস্থায় কৃষি উপকরণ সরবরাহকারি কোম্পানি এবং ব্যবসায়িরা ব্যাপকভাবে লাভবান হলেও খোদ কৃষক লাভবান হয় না।

অন্যদিকে, বাণিজ্যিক কৃষিতে উৎপাদন ও বিপণন ব্যবস্থার কোথাও খোদ কৃষকের কোন নিয়ন্ত্রণ দূরে থাকুক সামান্য প্রভাবটুকুও দেখা যায় না। একমাত্র কৃষি ছাড়া অন্য সকল নিত্যভোগ্য এমনকি বিলাসপণ্যের মূল্যও উৎপাদক স্বয়ং কিংবা সরকার-উৎপাদক মিলে নির্ধারণ করলেও কৃষিপণ্যের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে কৃষকের কণামাত্র ভ‚মিকা থাকেনা। অথচ আজ আমরা যে কৃষি দেখছি সেটা মূলত শিল্পকৃষি (ইন্ডাস্ট্রিয়াল এগ্রিকালচার) যদিও এটিই সম্ভবত একমাত্র শিল্প যেখানে উৎপাদক মালিক না হয়ে মূলত শ্রমিকের ভ‚মিকা পালন করে থাকে। কৃষির প্রাণপঙ্ক হলো বীজ যা আজ কোম্পানি-ব্যবসায়িদের নিয়ন্ত্রণে। সারের উৎপাদন ও আমদানি বিসিআইসির নিয়ন্ত্রণে থাকলেও বালাইনাশকের বাজার পুরোপুরি কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে। উৎপাদিত পণ্যের মধ্যে পোল্ট্রির বাজারের নিয়ন্ত্রণ প্রায় কোম্পানির হাতে কুক্ষিগত। খাদ্যপণ্যের প্রক্রিয়াকরণের ক্ষেত্রেও আমরা দেখি বৃহৎ অটো রাইসমিলের আগ্রাসনে লক্ষ লক্ষ চাতালকল, যেখানে বিপুল পরিমাণ নারীরা কাজ করতো, আজ ক্রমশ বিলীন হচ্ছে। এর ফল আমরা কি দেখছি? খাদ্যমূল্যের বাজার নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা আজ খোদ সরকারের হাতেও নেই। আমাদের খাদ্য ব্যবস্থা বৃহৎ বা বহুজাতিক কোম্পানির হাতে কুক্ষিগত হলে তা কত ভয়াবহ হতে পারে তা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামলে এই বাংলার মানুষ প্রত্যক্ষ করেছে। অমর্ত্য সেন আমাদেরকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছেন কোম্পানি-ব্যবসায়িরা কিভাবে মুনাফার লোভে দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করতেও কুন্ঠিত হয়না।

কৃষির স্থায়িত্বশীলতা এবং ক্ষুদ্র কৃষকের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের কৃষি এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। এই ক্রান্তিকাল বুঝার জন্য দেশের পোল্ট্রি খাতকে উদাহরণ হিসেবে সামনে আনা যায়। এদেশে কয়েক দশক আগে বিদেশি প্রজাতি নির্ভর পোল্ট্রি শিল্পের বিকাশ শুরু হয়েছিল ক্ষুদ্র খামারিদের হাত ধরে যারা ম‚লত ৫০, ১০০ বা ২০০ মুরগীর ক্ষুদ্র খামার গড়ে তুলেছিল। তখন তা তাঁদের জন্য লাভজনকই ছিল। কিন্তু খাদ্য, ঔষধপত্র এবং অন্যান্য উপকরণের মূল্য এবং রোগব্যাধিসহ নানাবিধ সমস্যা বৃদ্ধির সাথে তাল মিলাতে না পেরে তারা আজ বিলীন হয়ে গেছে। এরপর ক্রমেই মাঝারি উদ্যোক্তারা পোল্ট্রি শিল্পের নিয়ন্ত্রণ নেয়। তারাও আজ টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছে। ক্রমেই দেশের পোল্ট্রি শিল্প সিপি বাংলাদেশ, নিউ হোপ-এর মত দেশি-বিদেশি বৃহৎ কোম্পানির কুক্ষিগত হয়ে পড়ছে। একইভাবে দেশের মৎস্যখাত এবং শস্যখাতও ক্রমশ কৃষকের হাত থেকে সরে গিয়ে দেশি-বিদেশি কোম্পানি কিংবা পুঁজিপতি কৃষি উদ্যোক্তাদের হাতে চলে যাচ্ছে আর প্রকৃত কৃষকেরা হয় কৃষিশ্রমিকে অথবা গ্রামীণ অকৃষি পেশা কিংবা শহরে নির্মাণ শ্রমিক কিংবা ভ্যান-রিক্সা-অটো চালকে পরিণত হচ্ছে। অন্যদিকে, দেশ তার খাদ্য ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ ক্রমশ দেশি-বিদেশি কোম্পানির কুক্ষিগত হয়ে পড়ার মারাত্মক ঝুকির মধ্যে পতিত হতে যাচ্ছে। বস্তুত আমরা এখন তথাকথিত উন্নত দেশের কৃষির মডেল অনুসরণ করছি যা হাজার হাজার ডলার ভর্তুকী দিয়ে টিকিয়ে রাখা হয়েছে। এ কারণেই দেড়-দুই দশকের ব্যবধানে দেশের পোল্ট্রি চাষীদেরকে এখন টিকে থাকার জন্য ভর্তুকী দাবি করতে হচ্ছে। ভর্তুকী না দিয়ে কৃষিকে কৃষকের জন্য লাভজনক করতে গেলে খাদ্যের দাম দরিদ্র ভোক্তাদের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে যাবে। ফলে, খাদ্যের যথেষ্ট যোগান থাকা সত্তে¡ও দরিদ্র মানুষ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবে। কিন্তু, বিশ্বব্যাংক বা আইএমএফ-এর চাপে কিংবা নিজেদের উদাসীনতায় গত এক দশকে কৃষিতে প্রকৃত ভর্তুকীর পরিমান ৬০০০-৯০০০ কোটি টাকার মধ্যে উঠানামা করছে (লেখচিত্র-৪) যদিও এই সময়ে বাজেটের আকার বেড়েছে ছয়গুণেরও বেশি। অথচ সরকারের সর্বোচ্চ মহলের কথাবার্তায় বুঝা যায় যে সরকার ভর্তুকী দিতে দিতে এখনি হাফিয়ে উঠেছে।

এটা সত্য যে, বর্তমানে যতসংখ্যক মানুষ কৃষিতে আছে তাদেরকে কৃষিতে রেখে সবার অর্থনৈতিক উন্নয়ন করা সম্ভব নয়। কাজেই কৃষি থেকে অনেক মানুষ বিতারিত হবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যারা কৃষিতে থেকে যাবে কিংবা আগামী প্রজন্মের যারা কৃষিতে আসবে তাদের জন্য আকর্ষনীয় এবং সন্মানীয় পেশা হিসেবে কৃষিকে উপস্থাপন করতে না পারলে আমাদের খাদ্য উৎপাদন তথা খাদ্য নিরাপত্তা ক্রমশ আরও নাজুক অবস্থায় উপনীত হবে। কাজেই কৃষিকে কৃষকের জন্য লাভজনক করতে না পারলে নতুন প্রজন্মের শিক্ষিত কৃষকেরা কৃষিতে আসতে চাইবেনা। কিন্তু বর্তমান পেক্ষাপটে কৃষিকে কৃষকের জন্য লাভজনক করাটা অত্যন্ত কঠিন এবং জটিল ব্যাপার বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে।

এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, কেবল খাদ্য উৎপাদন বাড়ালেই যেমন খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না তেমনি কৃষকের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নও নিশ্চিত হয় না যদি না কৃষক তার উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পায়। কিন্তু বিগত বাজেটগুলোতে কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার পদক্ষেপ হিসেবে ‘কৃষক বিপণন দল’ ও ‘কৃষক ক্লাব’ গঠন এবং গ্রোয়ার্স মার্কেট স্থাপনের যে সাফল্যের কথা তুলে ধরা হয়েছে তা প্রকৃতপ্রস্তাবে কতটা সফল তা নিয়ে ইতোমধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে। কৃষির ঢালাও বাণিজ্যিকীকরণের ফলে এবং ক্রুটিপূর্ণ বর্তমান মুক্ত বাজার ব্যবস্থায় মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কৃষক যা উৎপাদন করে তার লভ্যাংশটুকু লুটেপুটে নেয় মধ্যস্বত্বভোগীরা যেখানে কৃষক তার উৎপাদন ব্যয়টাও উঠাতে পারে না। অন্যদিকে, ভর্তুকী বা ঋণ হিসেবে যা বরাদ্দ দেওয়া হয় তাও লুটেপুটে নেয় একশ্রেণীর সুবিধাভোগীরা। কাজেই, শুধু কিছু গ্রোয়ার্স মার্কেট নির্মাণ করে কিংবা রাসায়নিক সারে কিছু ভর্তুকী দিয়েই এই জটিল সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন বর্তমান বাজার ব্যবস্থার আমূল সংস্কার যার কোন দিকনির্দেশনা বিগত বাজেটগুলোতে পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে, দানাদার খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জিত হলেও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্যের নিশ্চয়তা আজও সুদুর পরাহত। কারণ, খাদ্য উৎপাদনে রাসায়নিক সার ও বালাইনাশকের ব্যবহার কিছুটা কমেছে বলে দাবী করা হলেও দেশের কৃষিতে এখনও প্রায় ৪০ লাখ টন রাসায়নিক সার ও প্রায় ৩৭ হাজার টন রাসায়নিক বালাইনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে । পক্ষান্তরে, মানুষ আজ পেট পুরে খেতে পারলেও “পুষ্টিহীনতাজনিত গুপ্ত ক্ষুধা (হিডেন হাঙ্গার)”-এ ভ‚গছে দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ। আর বিষাক্ত খাবার খেয়ে বাড়ছে রোগব্যাধি, বিপন্ন হচ্ছে মানবস্বাস্থ্য। সরকার একটি জৈবকৃষি নীতি প্রণয়ন করলেও তা বাস্তবায়নের তেমন কোন উদ্যোগ চোখে পড়েনা। দেশে আজও জৈব খাদ্যের কোন মানদন্ড প্রবর্তন করা হয়নি যা প্রতিবেশি দেশ ভারতসহ বিশ্বের বেশিরভাগ দেশই ইতোমধ্যে করে ফেলেছে। দেশে একটি নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ গঠিত হলেও খাদ্যে বিষাক্ততা ও ভেজাল রোধে খাদ্যমান পরীক্ষা, প্রত্যয়ন এবং পরিবীক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলা এবং সক্ষমতা সৃষ্টির যথেষ্ট উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। দৃশ্যত “না খেয়ে মরার চেয়ে খেয়ে মরাই ভালো” নীতিতে বিশ^াসী হয়ে ক্রমেই আমরা এক অনিশ্চিত এবং ভয়াবহ ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হচ্ছি। মানুষ এই অবস্থা থেকে মুক্তি চায় বলেই দেশে নিরাপদ খাদ্যের চাহিদা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর ক্রমবর্ধমান এই চাহিদার যোগান দিতে সারা দেশে প্রচুর সংখ্যক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা নিরাপদ খাদ্য ভ্যালু-চেইন গড়ে তোলার চেষ্টা করছে যা সরকার ঘোষিত ”এসএমই” উন্নয়নের একটা চমকপ্রদ ও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।

এমতাবস্থায়, সরকারের উচিত এদেশের প্রান্তিক কৃষকের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন ও সাধারণ মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কেবল বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গী থেকে দেশি-বিদেশি বৃহৎ কোম্পানির হাতে সব ছেড়ে না দিয়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকের স্বার্থে প্রয়োজনীয় নীতি প্রণয়ন করা এবং সে অনুযায়ী জলবায়ু সহনশীল স্থায়িত্বশীল কৃষি পূণঃপ্রতিষ্ঠায় সরকারী বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা। পাশাপাশি, খাদ্য বাজারকে সর্বসাধারণের নাগালের মধ্যে রাখতে খাদ্য ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ কর্পোরেশনের কুক্ষিগত হতে না দিয়ে ক্ষুদ্র প্রক্রিয়াকরণ ও বিপণন উদ্যোগকে প্রণোদনা দেওয়া প্রয়োজন। এর সুদূরপ্রসারী সুফল শুধু খাদ্য ব্যবস্থাতেই আসবে না, এতে ব্যাপক কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে। এজন্য বর্তমান কৃষির কাঠামোগত সংস্কার অত্যাবশ্যক।

জাতীয় কৃষিবাজেটে ক্ষুদ্র কৃষক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ১৫ দফা সুপারিশ:
১. জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে স্থায়িত্বশীল খাদ্য উৎপাদনের স্বার্থে মাটির স্থায়িত্বশীল উৎপাদনশীলতা বজায় রাখার জন্য অপরিহার্য জৈব সার ব্যবহার বৃদ্ধিসহ জলবায়ু সহিঞ্চু স্থায়িত্বশীল কৃষি (ঈষরসধঃব জবংরষরবহঃ ঝঁংঃধরহধনষব অমৎরপঁষঃঁৎব-ঈজঝঅ) চর্চাকে উৎসাহিত করার জন্য সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা করা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে জলবায়ুসহিঞ্চু স্থায়িত্বশীল কৃষিচর্চার কৌশল ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে প্রশিক্ষণখাত এবং গবেষণাখাতে বরাদ্দ রাখা।

২. কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার জন্য চলমান উৎপাদন ও বাজার ব্যবস্থার সংস্কার সাধনে উদ্যোগ গ্রহণ করা। এজন্য ’দাউদকান্দি মডেলে’ কৃষকদের ‘উৎপাদন ও বিপণন উদ্যোগ’ গড়ে তোলা। কৃষকের শিক্ষিত বেকার সন্তানদেরকে কাজে লাগিয়ে এসএমই আকারে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াকরণ, সংরক্ষণ ও বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তোলা। এক্ষেত্রে “শস্য গুদাম ঋণ প্রকল্প”কে পূণরুজ্জীবিত করে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য ‘শস্য সংরক্ষণ ঋণ’ চালু করা।

৩. কৃষিপণ্যের আগাম মূল্য নির্ধারণে সরকার-উৎপাদক-ভোক্তা সমন্বয়ে মূল্য কমিশন গঠন করা। ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও ভূমিহীন কৃষকদের জন্য সুদবিহীন বা স্বল্পসুদে মৌসুমভিত্তিক কৃষিঋণ সহজলভ্য করা এবং নারী কৃষকদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদানের মাধ্যমে ঋণসহ সকল সরকারি সেবা ও প্রণোদনায় নারী কৃষকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।

৪. মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক ঘোষিত “লাঙ্গল যার জমি তার” নীতির ভিত্তিতে দেশের ভূমি মালিকানা ব্যবস্থার আমূল সংস্কার করা। এজন্য “ল্যান্ড ব্যাংকিং” ব্যবস্থা চালু করে অনুপস্থিত ভ‚মিমালিকদের কাছ থেকে জমি “ল্যান্ড ব্যাংকে” জমা নিয়ে তা প্রকৃত ক্ষুদ্র কৃষক বা কৃষি উদ্যোক্তাদের জন্য সহজলভ্য করা। পাশাপাশি, ভূমি জরিপ আধুনিকীকরণ ও ডিজিটাইজেশন, ভ‚মি ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন ও ভূমি সংস্কারে সরকারের অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ এবং কৃষিজমি সুরক্ষা আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা।

৫. দেশের মৃতপ্রায় নদীগুলোকে বাঁচাতে এবং নদীর পানিভিত্তিক সেচ ব্যবস্থাকে পূণরুজ্জীবিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ প্রহণ করা। পাশাপাশি, নদী-নালা, খাল-বিল, হাওড়-বাওড়সহ সকল সকল জলাশয়ে প্রকৃত মৎস্যজীবিদের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক ঘোষিত “জাল যার জলা তার” নীতির আশু বাস্তবায়ন করা।

৬. সার, বীজ, সেচকাজে ভর্তুকী প্রদানের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি জলবায়ু সহনশীল স্থায়িত্বশীল কৃষি প্রযুক্তি তথা জৈব সার, বালাইনাশক, আইপিএম-এর মত জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশবান্ধব কৃষি প্রযুক্তিসম্প্রসারণে রাষ্ট্রীয় প্রণোদনা ও ভর্তুকী প্রদান এবং এই ভর্তুকির সুবিধা যাতে সরাসরি নারী কৃষকসহ প্রকৃত কৃষকরা পায় তার বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করা। নারী কৃষি শ্রমিকদের জন্য রাষ্ট্রীয় সেবা ও অর্থনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কৃষি নীতিমালায় নারী কৃষকদের কৃষি উপকরণ ও জামানতবিহীন ঋণ প্রদান সম্পর্কে সুস্পষ্ট বিধান রাখা এবং নারীবান্ধব কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা।

৭. স্বাধীন ও শক্তিশালী কৃষক সংগঠন তৈরির মাধ্যমে কৃষি সংশ্লিষ্ট নীতি ও পরিকল্পনা প্রণয়নে প্রকৃত কৃষকদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করা।

৮. কৃষি বাজারসমূহের অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং বাজারে প্রকৃত কৃষকদের অবাধ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এবং কৃষিপণ্যের বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম হ্রাস এবং রাস্তায় রাস্তায় চাঁদাবাজি বন্ধ করার কার্যকর পদক্ষেপ প্রহণ করা।

৯. সরকারীভাবে ধান ক্রয়ের ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত ডিলারের কাছে কৃষকেরা যাতে সরাসরি ধান কিংবা কৃষকদের সহযোগি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাগণ তাদের প্রক্রিয়াকৃত চাল বিক্রি করতে পারে তার ব্যবস্থা করা। ধান বা চালের সঠিক মূল্য নির্ধারণে মাঠ পর্যায়ে সরকারের প্রতিনিধির উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং ধানের দাম সরাসরি কৃষকের বা সহযোগি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ব্যাংক একাউন্টে ট্রান্সফার করা।

১০. দেশীয় গরু-ছাগল-মহিষ-ভেড়া এবং হাস-মুরগীর বাণিজ্যিক উৎপাদন ও বিপণনে সরকারি সেবা ও প্রণোদনা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি, বিদ্যমান পোল্ট্রি শিল্প ও প্রাণিসম্পদ খাতের উন্নয়নে রাষ্ট্রীয় প্রণোদনা বৃদ্ধি করা।

১১. জাটকা মাছ নিধন রোধসহ সমুদ্রগামী মৎস্যজীবীদের দুর্যোগজনিত পুনর্বাসন কর্মসুচিতে বাজেটে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা। ’দাউদকান্দি মডেলে’ হাওড়-বাওড়, বিলাঞ্চলে পরিকল্পিত মৎস চাষে উৎসাহিত করতে মৎসজীবীদের প্রণোদনা ও সক্ষমতা বাড়ানো। ইজারাকৃত মরা নদী ও বিলের পানি শুকিয়ে মাছ আহরণের ফলে ধীরে ধীরে মা মাছ ধ্বংস করে ফেলার প্রবণতা বন্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

১২. বীজসহ সকল প্রকার কৃষি উপকরণের বাণিজ্য একচেটিয়াভাবে কোম্পানির হাতে ছেড়ে না দিয়ে বৃহদাংশ বিএডিসির হাতে রাখার জন্য সংস্থাটিকে আরও শক্তিশালী করা।

১৩. জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে ইকোসিস্টেমভিত্তিক অভিযোজনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বীজ ও কৌলিক সম্পদ সংরক্ষণে কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানসমূহের সক্ষমতা ও উদ্যোগ বৃদ্ধি করা।

১৪. মেধাপাচার রোধ করে গবেষণা কার্যক্রম আরও জোড়দার করার জন্য কৃষি গবেষণা ও কৃষি শিক্ষায় বরাদ্ধ বৃদ্ধি করা।

১৫. যে কোনো ধরণের প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং রোগ-ব্যাধি ও পোকামাকড় কর্তৃক ক্ষতির হাত থেকে রক্ষার জন্য শক্তিশালী, দক্ষ ও কার্যকর ’স্যাটেলাইট-বেজড ডিজিটাল সার্ভিলেন্স ও ফোরকাস্টিং ব্যবস্থা’ গড়ে তোলা এবং ক্ষুদ্র কৃষকদের শস্য বীমার আওতায় আনা।

—0—

https://samakal.com/opinion/article/2205113557/