বাণিজ্যিক বিশ্বায়ন ও বাংলাদেশের কৃষি (অধ্যায়-১১ রাসায়নিক কৃষি বনাম স্থায়িত্বশীল কৃষি)

বাণিজ্যিক বিশ্বায়ন ও বাংলাদেশের কৃষি (অধ্যায়-১১ রাসায়নিক কৃষি বনাম স্থায়িত্বশীল কৃষি)

ইতোপূর্বেই আলোচিত হয়েছে যে, কৃষি এখন বিশ্ব বাণিজ্যের উদীয়মান সেক্টর প্রতিশ্রুতিশীল শিল্প। এই শিল্পের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির জন্য বিশ্বব্যাপি সবুজ বিপ্লব প্রযুক্তির ব্যাপক বিস্তারের মাধ্যমে যে কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে তাকে রাসায়নিক কৃষি বলা হয়। ইতোপূর্বে এটাও আলোচিত হয়েছে যে, এই রাসায়নিক কৃষির প্রভাবে নিঃশেষ হচ্ছে মাটির প্রাণশক্তি ও প্রাকৃতিক সম্পদ, ধ্বংস হচ্ছে পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং কৌলিক বৈচিত্র্য (জেনেটিক ডাইভারসিটি) যা স্থায়িত্বশীল উন্নয়নের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। পাশাপাশি, চলমান রাসায়নিক কৃষি উৎপাদনশীলতার উপরও  দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের খাদ্য নিরাপত্তাকে মারাত্মক হুমকির  মুখে ঠেলে দিচ্ছে। পরিবেশগত বিপর্যয় রোধ এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের মাধ্যমে স্থায়িত্বশীল উন্নয়নের (Sustainable Development) প্রতিজ্ঞা নিয়ে ১৯৯২ সালের জুন মাসে ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে জাতিসংঘ আয়োজিত ধরিত্রী সম্মেলন (ঊধৎঃয ঝঁসসরঃ) অনুষ্ঠিত হয় যেখানে বাংলাদেশও অন্যতম প্রতিজ্ঞাবদ্ধ দেশ। স্থায়িত্বশীল উন্নয়ন বলতে চলমান কোন উন্নয়ন উদ্যোগ বা প্রক্রিয়াকে বুঝায় যা গতি না হারিয়ে টিকে থাকতে সক্ষম। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের স্থায়িত্বশীল উন্নয়নের জন্য স্থায়িত্বশীল কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলার কোন বিকল্প নেই।

 

স্থায়িত্বশীল কৃষির ধারণা

স্থায়িত্বশীল কৃষি (Sustainable Agriculture) বলতে এমন এক কৃষি ব্যবস্থাকে বুঝায় যা উৎপাদনের মৌলিক ভিত্তি যেমন: মাটি, পানি, পরিবেশ ইত্যাদি সংরক্ষণ করে উৎপাদনশীলতা বজায় রাখতে সক্ষম। অর্থাৎ স্থায়িত্বশীল কৃষি ব্যবস্থা হল এমন একটি কৃষি ব্যবস্থা যা প্রাকৃতিক সম্পদের যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে পরিবেশের ভারসাম্য ও জীববৈচিত্র্য বজায় রেখে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার জন্য খাদ্য, পুষ্টি ও অন্যান্য চাহিদা পূরণে সক্ষম হবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চাহিদা মেটানোর মতো প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ করবে। স্থায়িত্বশীল কৃষি ব্যবস্থা মানুষের প্রয়োজনের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ স্থানীয় সম্পদভিত্তিক ব্যয়সাশ্রয়ী কৃষি প্রযুক্তিনির্ভর এবং কৃষকের সামর্থ্য ও নিজস্ব জ্ঞানভিত্তিক এমন একটি সমন্বিত উদ্যোগ ও ব্যবস্থাপনা যা হবে পরিবেশসম্মত, অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক, সামাজিকভাবে ন্যায্য ও সমদর্শী, সাংস্কৃতিকভাবে যথাযথ, যথোপযুক্ত প্রযুক্তিনির্ভর, সামগ্রিক বিজ্ঞানভিত্তিক এবং সমগ্র মানবিক উন্নয়নে সহায়ক। অর্থাৎ যে কৃষি ব্যবস্থা পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রেখে প্রাকৃতিক সম্পদের পরিমিত ব্যবহার ও সংরক্ষণের মাধ্যমে মানুষের পরিবর্তনশীল চাহিদা পূরণে সক্ষম এবং সেইসাথে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় সহায়ক তাই স্থায়িত্বশীল কৃষি। নিন্মে স্থায়িত্বশীল কৃষির মৌলিক ধারণাসমূহের উপর আলোকপাত করা হল।

ক) পরিবেশবান্ধব

স্থায়িত্বশীল কৃষি ব্যবস্থা প্রকৃতি, মাটি ও মানুষের ক্ষতি না করে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়ক হবে। অর্থাৎ স্থায়িত্বশীল কৃষি ব্যবস্থায় এমন কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার হবে যা প্রাকৃতিক সম্পদের ক্ষতিসাধন না করে সার্বিক প্রতিবেশের (ফসল, গাছ, মাছ, মানুষ থেকে শুরু করে মাটিস্থ অনুজীবসমূহ) সজীবতা সংরক্ষণ করবে। এটা তখনই সম্ভব হবে যখন জৈব প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মাটি ব্যবস্থাপনা ও ফসল উৎপাদন করা যাবে। পাশাপাশি পুনরুৎপাদন ও ব্যবহার করা যায় না এমন শক্তি-সম্পদ (খনিজ কয়লা, পেট্রোল, ডিজেল ইত্যাদি) এবং রাসায়নিক প্রণালীতে প্রস্তুতকৃত কৃত্রিম উপকরণ যথাসম্ভব পরিহার করে স্থানীয় সম্পদ, জৈব উপকরণ এবং লোকজ জ্ঞান ও প্রযুক্তির এমনভাবে সমন্বয় ও সদ্ব্যবহার করা যেন সকল প্রকার দূষণ এড়ানো যায় এবং শক্তি ও সম্পদের অপচয় ও অপব্যবহার কমানো সম্ভব হয়। অর্থাৎ স্থায়িত্বশীল কৃষি ব্যবস্থায় পুনরুৎপাদনশীল সম্পদ ব্যবহারের উপর গুরুত্ব দেওয়া খুবই জরুরি।

খ) অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক

স্থায়িত্বশীল কৃষি ব্যবস্থায় স্থানীয় ও পুনরুৎপাদনশীল সম্পদ এবং লোকজ জ্ঞান ও প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে তা অর্থনৈতিকভাবেও লাভজনক হবে। কারণ, এতে করে উৎপাদন খরচ হবে সর্বনিম্ন যা প্রকৃত লাভকে বাড়িয়ে দিবে। তা ছাড়া, অর্থনৈতিক লাভালাভ শুধুমাত্র উৎপাদনের ক্ষেত্রেই নয় বরং প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ, সামগ্রিক ও দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদনশীলতা বজায় রাখা এবং পরিবেশ, স্বাস্থ্যগত ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি নিরসনের নিরিখে দেখতে হবে।

গ) সামাজিকভাবে ন্যায্য ও সমদর্শী 

স্থায়িত্বশীল কৃষি ব্যবস্থায় সম্পদ ও ক্ষমতা এমনভাবে ব্যবহৃত হবে যা সমাজের নারী পুরুষ নির্বিশেষে সকল মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে সক্ষম হবে এবং ভূমিতে তাদের অধিকার, উৎপাদনের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ প্রাপ্তি, কারিগরি সহায়তা প্রাপ্তি এবং বাজার ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার ইত্যাদি নিশ্চিত করবে। পপশাপাশি, কর্মক্ষেত্রে এবং সমাজে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ থাকবে।

 

ঘ) সংস্কৃতিকভাবে যথাযথ

সবুজ বিপ্লবের নামে রাসায়নিক ও ভারী যান্ত্রিক প্রযুক্তি প্রচলনের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়েছে কৃষি ব্যবস্থা ও ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ খাদ্য ও পুষ্টি গ্রহণের ধরন এবং আবহমান গ্রামীণ সংস্কৃতি। কিন্তু স্থায়িত্বশীল কৃষি ব্যবস্থায় কৃষি প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনা এমন হবে যা কৃষকের নিজস্ব জ্ঞান ও সংস্কৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।

 

ঙ) লাগসই প্রযুক্তিনির্ভর

স্থায়িত্বশীল কৃষি ব্যবস্থায় প্রযুক্তি উদ্ভাবন, উন্নয়ন ও ব্যবহার ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা শ্রেণী স্বার্থে না হয়ে তাতে সার্বজনীন বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটে। এতে যথোপযুক্ত প্রযুক্তির উন্নয়ন ও সঠিক ব্যবহার সার্বিক উন্নয়নে অবদান রাখে। সকল অবস্থায় প্রযুক্তি একরকম না হওয়াই স্বাভাবিক এবং কোন একটি প্রযুক্তি একস্থানে সফলতা আনলেও অন্যত্র অকার্যকর হতে পারে। কোন প্রযুক্তি তখনই যথার্থ লাগসই বিবেচিত হবে যদি তা নির্দিষ্ট এলাকার ফসল, জমি বা মাটি, জলবায়ু, কৃষকের দক্ষতা ও ব্যবস্থাপনাগত সামর্থ্য এবং সংস্কৃতির সাথে খাপ খায় এবং গণস্বার্থ সংরক্ষণে অন্যান্য নীতির বিরদ্ধে ব্যবহৃত না হয়।

 

চ) সম্পূর্ণ বিজ্ঞান ভিত্তিক

কৃষির স্থায়িত্বশীলতার জন্য সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক ভিত্তি একটি প্রধান বিবেচ্য বিষয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় বর্তমান অসম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ফসলকে রোগ-বালাই প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন করতে কৌলিক প্রতিস্থাপনের (Genetic Transformation) উপর নির্ভরশীল। বিকল্প হিসেবে বিজ্ঞানীদের উপলদ্ধি করা দরকার কিভাবে প্রকৃতির সম্পূর্ণ বিজ্ঞানে পরিবেশগত অবস্থা, ফসলের আন্তঃপরিচর্যা, মাটির উর্বরতা বৃদ্ধির কৌশলসমূহ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সহযোগী উপাদানের পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও সহযোগিতায় প্রকৃতিগতভাবে ফসলে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়।

ছ) সমগ্র মানবিক উন্নয়নে সহায়ক

কৃষি কেবল ফসল উৎপাদন ব্যবস্থা নয় এটি একটি জীবন ব্যবস্থা। কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা কৃষিনির্ভর একজন ব্যক্তি বা জনগোষ্ঠীর জীবন-যাপন পদ্ধতি, কৃষ্টি, সংস্কৃতি ইত্যাদি সবকিছুর সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কাজেই, স্থায়িত্বশীল কৃষির চূড়ান্ত লক্ষ্য হল সার্বিক মানবিক উন্নয়নের মাধ্যমে সভ্যতার বিকাশ সাধন। কাজেই, সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি ব্যবস্থাকে অবশ্যই মানুষের ব্যবহার উপযোগী ও কল্যাণকর হতে হবে। স্থায়িত্বশীল কৃষি ব্যবস্থায় সকল জীবকেই (গাছ, মানুষ ও অন্যান্য প্রাণী) মর্যাদা ও শ্রদ্ধার সাথে বিবেচন করা হয়। এতে সকল মানুষের (ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে) দক্ষতা ও মৌলিক মর্যাদার স্বীকৃতি থাকবে এবং মানুষের সম্পর্কে পারস্পরিক সততা, আত্মসম্মান, সহযোগিতা এবং সমবেদনার মতো মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠিত থাকবে।

 

স্থায়িত্বশীল কৃষির নীতিমালা

যদি রাসায়নিক কৃষির দ্বারা সৃষ্ট সমস্যাগুলো বুঝতে পারা যায় তা হলে একটি বিকল্প স্থায়িত্বশীল কৃষি পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তার কথা আন্তরিকভাবে অনুভব না করে পারা যায় না। যাহোক, রাসায়নিক কৃষির ঋণাত্মক প্রভাবসমূহ সফলভাবে মোকাবিলা করতে হলে স্থায়িত্বশীল কৃষি পদ্ধতির ক্ষেত্রে যেসব মূলনীতিগুলো অবশ্যই মেনে চলা আবশ্যক সেগুলো নিম্নরূপ:

১.   প্রাকৃতিক পরিবেশের কোনরূপ ক্ষতি সাধন না করা;

২.   কোন নির্দিষ্ট এলাকার আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পরিবেশগত অবস্থার সাথে সামঞ্জস্য রেখে ফসল বা পশুপাখির জাত বা প্রজাতি নির্বাচন করা;

৩.   শস্য ও পশুপাখি এবং কৃষিচর্চার বহুমুখীকরণ করা যাতে কৃষি খামারের জৈবিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বাড়াবে;

৪.   মাটির মান বজায় রাখতে মাটি ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন;

৫.   উপকরণের দক্ষ ও মানবিক ব্যবহার নিশ্চিত করা;

৬.   প্রযুক্তি বা পদ্ধতি ব্যবহারে কৃষকের সামর্থ্য থাকবে এবং প্রযুক্তিটি টেকসই হবে;

৭.   কৃষকের নিজস্ব উপকরণনির্ভর হবে অর্থাৎ বাহ্যিক উপকরণের উপর কম নির্ভরশীল থাকবে;

৮.   কৃষকের লক্ষ্য এবং জীবনাচারের পছন্দ বিবেচনায় নেওয়া;

অন্যদিকে, রাসায়নিক কৃষির বিকল্প কৃষি ব্যবস্থা হিসেবে স্থায়িত্বশীল কৃষি ব্যবস্থার প্রবর্তন করা দরকার, যার ভিত্তি হল প্রাকৃতিক বনভূমির অভ্যন্তরীণ পরিবেশ পদ্ধতি (ইকোসিস্টেম)। উদ্ভিদের জন্ম, বৃদ্ধি, উৎপাদন, পুনরুৎপাদন, টিকে থাকা থেকে শুরু করে মাটি, পরিবেশ ও ইকোসিস্টেম সংরক্ষণ ইত্যাদির ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক বনভূমিতে একটি নিখুঁত স্থায়িত্বশীল পদ্ধতি বা সিস্টেম দেখা যায়। সুতরাং স্থায়িত্বশীল কৃষির মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ প্রাকৃতিক বনভূমি থেকেই সনাক্ত করা যেতে পারে যা নিম্নরূপঃ

১.   জীববৈচিত্র্য (Biodiversity) অর্থাৎ বৈচিত্র্যময় উদ্ভিদ ও প্রাণির উপস্থিতি;

২.   সজীব মাটি (Living Soil) বা অনুজীবসমৃদ্ধ মাটি;

৩.   পুনরাবর্তন (Recycling) বা পুষ্টি চক্রের সক্রিয়তা;

৪.   বহুস্তর বিশিষ্ট গঠন (Multi-tier System) বা ভূমির বন্ধুরতা অনুসারে ফসলবিন্যাস;

৫.   বহন/সহ্য ক্ষমতা (Bearing Capacity) বা উৎপাদনের সাথে ভোক্তা সংখ্যার সাম্যাবস্থা।

 

নিম্নে বৈশিষ্ট্যসমূহ বিস্তারিতভাবে আলোচিত হল।

১. জীববৈচিত্র্য

প্রাকৃতিক অরণ্যে উদ্ভিদের রোগ-বালাই জনিত সমস্যা নেই বললেই চলে। অনুজীব, প্রাণি এবং উদ্ভিদের প্রজাতি ও জাতসমূহের বৈচিত্র্যই এর কারণ। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় প্রাকৃতিক অরণ্যের প্রতি একর জমিতে প্রায় ১০০টি প্রজাতির উদ্ভিদ বর্তমান। কিন্তু এক একর কৃষি জমিতে প্রজাতির বৈচিত্র্য খুবই কম। বর্তমানে একক ফসল চাষের ফলে এই সংখ্যা একটিতে এসে পৌঁছেছে। শুধুমাত্র বৈচিত্র্যই পরিবেশের ভারসাম্য নিশ্চিত করে। পক্ষান্তরে, একক ফসলের আবাদ পরিবেশের ভারসাম্য বিঘিœত করে এবং উদ্ভিদের রোগ-বালাইয়ের প্রাদুর্ভাব ঘটিয়ে পরিবেশের ক্ষতি সাধন করে থাকে। সুতরাং কৃষি খামারের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে জীববৈচিত্র্যকে সর্বাধিক গুরত্ব দেওয়া প্রয়োজন। এ ছাড়াও খামারের বৈচিত্র্য আয়ের উৎস বাড়ায় যা ঐ খামারের ফসলহানির ঝুঁকি কমায়। ফসল বৈচিত্র্য নিশ্চিতকারী খামার পদ্ধতি নিম্নরূপঃ

  • ফসল বৈচিত্র্য বা বহুমুখী ফসলের আবাদ (Crop diversification)
  • মিশ্র ফসলের চাষ (Mix cropping)
  • শস্য পর্যায় বা শস্য আবর্তন অবলম্বন (Crop Rotation)
  • খামারের চারপাশে বহুব্যবহার উপযোগী স্থায়ী গাছ লাগানো
  • মাছ চাষ ও বিবিধ প্রাণিসম্পদ পালন (গবাদিপশু, মৌমাছি ইত্যাদি) ।

 

২. সজীব মাটি

সজীব মাটির অর্থ হল মাটিতে প্রচুর সংখ্যক অণুজীবের উপস্থিতি। মাটির উর্বরতা এবং ফসল চাষের উপযোগিতা অনুজৈবিক কার্যাবলী দ্বারা নির্ধারিত হয়। যেহেতু অনুজীবের জন্য খাদ্য ও যত্নের প্রয়োজন সেহেতু মাটির জন্যেও খাদ্য ও পরিচর্যার প্রয়োজন। নিম্নলিখিত বিষয়াবলী সজীব মাটির নিশ্চয়তা দেয়:

  • মাটিতে নিয়মিত জৈব পদার্থের যোগান দেওয়া;
  • মাটির ক্ষয় রোধের জন্য মাটির উপরিভাগ ঢেকে রাখা বা মালচিং করা;
  • রাসায়নিক সার, আগাছা নাশক ও কীটনাশক ইত্যাদি ক্ষতিকর পদার্থ মাটিতে প্রয়োগ না করা।

৩. পুনরাবর্তন

প্রাকৃতিক অরণ্যে পুষ্টি-চক্রের মাধ্যমে পুষ্টি উপাদান বা শক্তির পুনরাবর্তন সম্পন্ন হয়। সব কিছুই মাটি থেকে আসে এবং মাটিতেই ফিরে যায়। এভাবে আবর্তিত হয় বলে বিশ্বপ্রকৃতির কোন কিছুই অপ্রয়োজনীয় নয়। পালাক্রমে সবকিছুই প্রয়োজনীয় হয় এবং কাজে লাগে। প্রাকৃতিক সম্পদের যথাযথ ও সঠিক ব্যবহারের জন্য এই আবর্তন অপরিহার্য। কিন্তু বর্তমান কালের কৃষি অনুশীলনে এই আবর্তন ধারা সর্বদাই বিঘ্নিত হয় বলে বিভিন্ন সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। পুষ্টির আবর্তন ধারা সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান না থাকা এবং সবকিছুর সাথে সম্পর্কের কথা বিবেচনা না করে সাময়িক লাভের জন্য কোন একটি বিশেষ বিষয়ের উপর গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতার জন্য এসব সমস্যাবলীর সৃষ্টি করছে। সুতরাং সমস্যা সমাধান করতে আবর্তন ধারা সম্পর্কে জ্ঞান এবং একই সাথে কৃষিচর্চায় কিভাবে তা পুনরাবর্তন করা যায় সে সম্পর্কে জানা ও তার প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরি। খামারের প্রতিটি উপাদান থেকে লাভবান হওয়ার জন্য পুনরাবর্তন এসব উপাদানগুলির মধ্যে কার্যকর সম্পর্ক গড়ে তোলে। বাহ্যিক উপকরণের ব্যবহার কমিয়ে স্থানীয় সহজলভ্য সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহারের মাধ্যমে খামারকে লাভজনক করতে তাই পুনরাবর্তন অপরিহার্য।

 

৪. বহুস্তরবিশিষ্ট গঠন

কৃষিতে উৎপাদনের প্রকৃত উৎস হল সূর্যের আলো এবং বৃষ্টির পানি। সব সময়ই প্রাকৃতিক অরণ্যে বায়োমাস উৎপাদন কৃষির তুলনায় বেশি। এর কারণ অরণ্যে বনানীর বহুস্তর বিশিষ্ট কাঠামো যা সূর্যালোক ও বৃষ্টির পানিকে সর্বোচ্চ মাত্রায় কাজে লাগাতে পারে। সচরাচর কাঠমোগতভাবে ফসলের মাঠ আনুভূমিক যা উক্ত প্রাকৃতিক সম্পদ সর্বোচ্চ মাত্রায় কাজে লাগাতে পারে না। কৃষি জমিতে সূর্যালোক ও বৃষ্টির পানি যথাযথভাবে ব্যবহৃত হলে তা ফসলের জন্য সুফল বয়ে আনতে পারে। যদি এমনটি না হয় তা হলে সূর্যালোক ও বৃষ্টির পানি খরা ও ভূমিক্ষয়ের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যে সমস্ত বিষয়াবলী একটি খামারকে বহস্তরবিশিষ্ট কাঠামোতে রূপদান নিশ্চিত করে তা নিম্নরূপঃ

  • খামারের চারিদিকের আইলে বিভিন্ন প্রজাতির স্থায়ী গাছ লাগানো এবং নিচে ছায়া পছন্দকারী ফসলের আবাদ করা;
  • সুষ্ঠু-বিন্যাসের মাধ্যমে ফসলের ক্ষেতে বহুব্যবহার উপযোগী গাছ লাগানো এবং বিভিন্ন উচ্চতার ফসল আবাদ করা।

 

৫. বহন/সহ্য ক্ষমতা

প্রতিটি ব্যবস্থারই একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ বহন/সহ্য ক্ষমতা থাকে। যেমনঃ একটি মোটর সাইকেলের দুইজন মানুষ বহন করার ক্ষমতা রয়েছে। ঐ মোটর সাইকেলটিতে পাঁচজন মানুষ কখনই বহন করা যাবে না। অনুরূপভাবে মাটির একটা নির্দিষ্ট বহন/ধারণ ক্ষমতা রয়েছে। যেমনঃ এক একর জমিতে যে ফসল উৎপাদন হয় তাতে পাঁচজন মানুষের সারা বছর চলে। কিন্তু এক একর জমি থেকে দশ জন মানুষের সারা বছর চলবে না। জনসংখ্যার দ্রুত বৃদ্ধির সাথে পরিবেশের ভারসাম্যের একটি নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। তাই বিশ্বব্যাপী জনসংখ্যাকে বহন ক্ষমতার মধ্যে রাখার জন্য সাধ্যমতো চেষ্টা করতে হবে। যদিও এ কাজটি সহজ নয়, তাই নিম্ন লিখিত ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে এটিকে ভারসাম্য অবস্থায় রাখা যেতে পারে।

  • জনগণের মধ্যে জনসংখ্যা ও ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণ, নিরাপদ মাতৃত্ব ইত্যাদি বিষয়ে শিক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধি করা;
  • জন্ম নিয়ন্ত্রণ উপকরণের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা;
  • উন্নততর স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সুবিধা নিশ্চিত করা ইত্যাদি।

 

রাসায়নিক ও স্থায়িত্বশীল কৃষি ব্যবস্থার তুলনামূলক আলোচনা

রাসায়নিক কৃষি ব্যবস্থা স্থায়িত্বশীল কৃষি ব্যবস্থা
প্রযুক্তি ও রাসায়নিক উপকরণের ব্যবহার বিশেষজ্ঞদের জ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর। স্থানীয় জ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর তাই কৃষক সহজেই অনুশীলন করতে পারে এবং প্রযুক্তি উন্নয়নে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে পারে।
একক ফসল আবাদের কারণে জমি অনুর্বর হয় ফলে বর্ধিত হারে রাসায়নিক সার ব্যবহার করতে হয়। এতে কৃষকের অতিরিক্ত খরচ বাড়ে ও পরিবেশ নষ্ট করে। উৎপাদন পদ্ধতি পরিবেশসম্মত নয়। বহুফসল ও শস্য পর্যায় অনুসরণ করা হয় এবং জৈবসার ও প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে বালাই ব্যবস্থাপনা করা হয়। কোন প্রকার রাসায়নিক সার ও বিষ ব্যবহার করতে হয় না বিধায় উৎপাদন পদ্ধতি পরিবেশসম্মত।
কৃষককে বীজের জন্য বাজারের উপর বা বিদেশী বহুজাতিক কোম্পানির উপর নির্ভর করতে হয়। অধিকাংশ সময়ে কৃষক তাঁর পছন্দমতো ও মানসম্মত বীজ পায় না এবং অনেক সময় কৃষক প্রতারিত হয়। কৃষকের খামারে বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণ করা হয়, সে কারণে কৃষক তার প্রয়োজনে পছন্দমতো মানসম্পন্ন বীজ ব্যবহার করতে পারে।
প্রায় সব উপকরণ বাজার থেকে বেশি মূল্যে কিনতে হয় এবং অধিকাংশ সময়ে প্রয়োজনমতো পাওয়া যায় না। ফলে, উৎপাদন খরচ ও পরনির্ভরশীলতা বাড়ে। প্রয়োজনীয় উপকরণের বেশিরভাগ খামারের অভ্যন্তরে তৈরি বা স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করা হয়। ফলে, প্রয়োজনমতো মানসম্মত উপকরণ ব্যবহার করা যায়। এতে খরচ কম হয় এবং স্বনির্ভরতা বাড়ে।
প্রাথমিক পর্যায়ে ফলন বাড়লেও পরবর্তীতে ফলন ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেতে থাকে। ফলন কোন পর্যায়ে কমে না বরং বছর বছর বাড়তে থাকে বা উৎপাদনশীলতা বজায় থাকে।
উৎপাদন ব্যয় যে হারে বাড়ে নির্দিষ্ট একক জমিতে উৎপাদন ও উৎপাদিত ফসলের মূল্য সে হারে বাড়ে না। ফলে কৃষিতে লাভ ক্রমান্বয়ে কমতে থাকে। উৎপাদন ব্যয় কম এবং ফলন বাড়তে থাকে তাই বাজার মূল্য তেমন প্রভাব ফেলতে পারে না। কৃষি কাজে ঝুঁকি থাকে না বললেই চলে। বহুফসল আবাদের ফলে চাষাবাদ সব সময় লাভজনক হয়।
অল্প সংখ্যক ফসল উৎপাদনের ফলে পারিবারিক পুষ্টির যোগান ও আয়ের উৎস কমে। রাসায়নিক বিষ ব্যবহার করা হয় বলে উৎপাদিত ফসলে বিষ ক্রিয়া থাকে যা স্বাস্থ্যসম্মত নয়। ফলে স্বাস্থের ঝুঁকি বাড়ে। বহুবিধ ফসল উৎপাদনের ফলে পারিবারিক পুষ্টি ও আয়ের উৎস বাড়ে। পরিবেশসম্মত প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয় বলে উৎপাদিত ফসলের গুণগত মান ভাল থাকে যা স্বাস্থ্য সম্মত হয় এবং স্বাস্থ্যহানির ঝুঁকি কমে।
বিষ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ায় রাসায়নিক বিষ পোকা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে না। বন্ধু/উপকারী পোকা/প্রাণী মারা যায় ফলে পোকার আক্রমণ দিন দিন বাড়তে থাকে। উপকারী প্রাণী, কীট-পতঙ্গ সংরক্ষিত হয়। ফলে, প্রাণী জগতের ভারসাম্য বজায় থাকে এবং প্রাকৃতিকভাবে কীট-পতঙ্গ নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকে।
ব্যবহৃত রাসায়নিক সার ও বিষ মাটি, পানি ও বায়ু দূষণের মাধ্যমে পরিবেশ দূষণ ঘটায়। টেকসই প্রযুক্তি ও জৈব উপকরণ ব্যবহার করে চাষাবাদ করা হয় বলে পরিবেশ দূষণের কোন সম্ভাবনা থাকে না।
বিষ নাড়াচাড়া ও ব্যবহারে কৃষকের স্বাস্থ্য হানি ঘটে। বিষ ব্যবহার করা হয় না বলে বিষজনিত স্বাস্থ্য সমস্যা থাকেনা।

 

সুতরাং কোন যুক্তিতেই বাইরের বা বাজারের উপকরণনির্ভর ও ব্যয়বহুল রাসায়নিক কৃষি ব্যবস্থা স্থায়িত্বশীল নয়। এই কৃষি ব্যবস্থা সর্বদাই কৃষি ও কৃষককে ঝুঁকি ও নাজুক পরিস্থিতির মধ্যে রাখে। অতএব কৃষিনির্ভর, প্রযুক্তিগতভাবে দুর্বল ও দরিদ্র এ দেশে প্রচলিত রাসায়নিক কৃষির প্রচলন মোটেই সুবিবেচনাপ্রসূত নয়। তাই স্থায়িত্বশীল কৃষি ব্যবস্থা দ্বারা এর প্রতিস্থাপন একান্ত জরুরি।

স্থায়িত্বশীল কৃষি আধুনিক পরিবেশ বিজ্ঞানের দৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। এ কৃষি ব্যবস্থায় কৃষকদের জ্ঞানকে শ্রদ্ধা করা হয় এবং কৃষকের অংশগ্রহণমূলক গবেষণার উপরই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়ে থাকে। পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর কোন রাসায়নিক উপকরণ ব্যবহার না করে, প্রকৃতির নিজস্ব উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়তা দানের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় উপকরণ খামারের অভ্যন্তরেই তৈরি ও ব্যবহার করা হয় কিংবা স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করে ব্যবহার করা হয়। এভাবে মাটির উর্বরতা ও উৎপাদন ক্ষমতাকে সর্বোচ্চ মাত্রায় বজায় রেখে লাভজনকভাবে চাহিদাভিত্তিক ফসল উৎপাদন করাই স্থায়িত্বশীল কৃষি। এটি একটি স্থায়িত্বশীল উৎপাদন পদ্ধতি যা কৃষক নিজে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে এবং পারিবারিক খাদ্য নিরাপত্তাসহ স্বনির্ভর উন্নয়ন ঘটাতে পারবে। পরিশেষে, আব্রাহাম লিংকনের গণতন্ত্রের সংজ্ঞার মত করে বলা যায় স্থায়িত্বশীল কৃষি হল কৃষকের জন্য, কৃষকের দ্বারা, কৃষকের কৃষি। তাই স্থায়িত্বশীল কৃষিকে নিছক একটি চাষ পদ্ধতি বা ব্যবস্থা হিসেবে না দেখে একটি সমগ্রিক উন্নয়ন দর্শন হিসেবে দেখাই শ্রেয়।

উপসংহার

বাংলাদেশে বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা কর্তৃক বাস্তবায়িত স্থায়িত্বশীল কৃষি কর্মসূচি-র অভিজ্ঞতা থেকে অর্জিত ইতিবাচক ফলাফলসমূহ প্রচলিত রাসায়নিক কৃষির বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার ইঙ্গিত বহন করছে। স্থায়িত্বশীল কৃষির ফলাফল গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করার ক্ষেত্রে উলে­খযোগ্য ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞ মহল আশাবাদ ব্যক্ত করছেন। স্থায়িত্বশীল কৃষি ব্যবস্থা টেকসই বা স্থায়িত্বশীল উন্নয়ন ধারণা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি দারিদ্র বিমোচন, পরিবেশ উন্নয়ন ও দরিদ্রদের ক্ষমতায়ন প্রক্রিয়ায় সহায়তা করছে।

এতদসত্ত্বেও হালের কৃষি ব্যবস্থায় রাসায়নিক কৃষি যেভাবে ডাল-পালা-শিকড় বিস্তার করে এক মহীরূহ রূপ লাভ করেছে তা সমূলে উৎপাটন করে বিকল্প হিসেবে স্থায়িত্বশীল কৃষির প্রবর্তন রাতারাতিই সম্ভব হবে এমনটা প্রত্যাশা করা সমীচীন হবে না। সমাজের ক্রম-বিবর্তনের ইতিহাসে কৃষির ধারা বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, প্রতিটি কৃষি ব্যবস্থারই কতকগুলো ধাপ রয়েছে। স্থায়িত্বশীল কৃষি প্রবর্তনেও আমাদেরকে তাই ধাপে ধাপে এগিয়ে যেতে হবে। চলমান কৃষি ব্যবস্থায় একটি বৈপ্লিবিক পরিবর্তন আনতে হবে। আর এজন্য প্রয়োজন-

  • সম্প্রসারণ কার্যক্রম জোরদারকরণ ও বিভিন্নমুখী প্রচার মাধ্যম (রেডিও, টেলিভিশন, সংবাদপত্র, পোস্টার ইত্যাদি) ব্যবহার করে স্থায়িত্বশীল কৃষি বিষয়ে গণচেতনা সৃষ্টি করা;
  • কৃষিক্ষেত্রে নারীর শ্রমের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগ গ্রহণ;
  • টেকসই কৃষি প্রযুক্তি বাছাই বা চিহ্নিতকরণ ও উন্নয়নে কৃষকদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে গবেষণাকর্ম পরিচালনা করা;
  • কৃষকদের মাঠকে স্থায়িত্বশীল কৃষি খামার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা;
বাণিজ্যিক বিশ্বায়ন ও বাংলাদেশের কৃষি (অধ্যায়-১১ রাসায়নিক কৃষি বনাম স্থায়িত্বশীল কৃষি)

বাণিজ্যিক বিশ্বায়ন ও বাংলাদেশের কৃষি (অধ্যায়-১০ রাসায়নিক বালাইনাশকের ক্ষতিকর প্রভাব)

বাংলাদেশে বালাইনাশকের ব্যবহার

১৯৫৬ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের প্ল্যান্ট প্রোটেকশন উইং প্রথমবারের মতো বর্তমান বাংলাদেশ ভূখণ্ডে বালাইনাশকের আমদানি করে। সেসময় বিনামূল্যে এসব বালাইনাশক কৃষককে দেওয়া হয়েছে। স্বাধীনতাউত্তর বাংলাদেশ সরকারও ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত বালাইনাশকের ক্ষেত্রে শতকরা ১০০ ভাগ ভর্তুকী দিয়েছে। ১৯৭৯ সালে ভর্তুকীর পরিমাণ কমিয়ে ৫০ শতাংশে নামানো হয়। বিশ্বব্যাংকের কাঠামোগত সংস্কার কর্মসূচির আওতায় সরকারি ভর্তুকী প্রত্যাহার এবং বেসরকারি খাতে বালাইনাশক আমদানির অনুমতি দেওয়া হয় ১৯৮০ সালে। ভর্তুকি প্রত্যাহার করা সত্তে¡ও ১৯৮৫ সাল থেকে ৯০ সালের মধ্যে দেশে বালাইনাশকের ব্যবহার দ্বিগুণ বেড়েছে যা বালাইনাশকের উপর কৃষকের অত্যধিক নির্ভরশীলতাকেই নির্দেশ করে। ১৯৮৫-৮৬ সালে ব্যবহৃত বালাইনাশকের পরিমাণ ছিল ৩০০০ মেট্রিক টন যা ১৯৯০ সালে বেড়ে দাড়ায় ৬০০০ মেট্রিক টন। পরবর্তীকালে বালাইনাশকের ব্যবহারের হার দ্রুত থেকে দ্রুততর হয়। ১৯৯৫-৯৬ সালে ব্যবহৃত বালাইনাশকের পরিমাণ ছিল ১৬,০০০ মেট্রিক টন এবং ২০০৩ সালে ২০,০০০ মেট্রিক টন। বিদেশ থেকে আমদানি করা এসব বালাইনাশকের শতকরা ৮০ ভাগই ব্যবহার করা হয ধান উৎপাদনের ক্ষেত্রে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, বর্তমানে দেশে ৯১ লাখ হেক্টর কৃষি জমির ৮০ ভাগই ধান উৎপাদনের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ নিষিদ্ধ বালাইনাশকের অবাধ বাজার

বালাইনাশকের উপর কৃষকদের অত্যধিক নির্ভরশীলতা এবং সরকারি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দুর্বলতার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে কোম্পানিগুলো পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এবং শিল্পোন্নত দেশে নিষিদ্ধ বালাইনাশক বাংলাদেশে আমদানি ও বাজারজাত করে আসছে। দেশে আমদানিকৃত ও ব্যবহৃত বালাইনাশকের মধ্যে কয়েকটি অতি উচ্চমাত্রায় বিষাক্ত যেগুলো মানুষ ও পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এই শ্রেণীর অন্তর্ভূক্ত বালাইনাশকগুলো ‘ডার্টি ডজন’ নামে পরিচিত। এ ধরণের বালাইনাশকের বর্তমান সংখ্যা ১৭টি। ডিডিটি, হেপ্টাক্লোর, কোরডেন, এনড্রিন, ডাইএলড্রিন, অরড্রিন, কেমকেবোর, লিনড্রেন, বিএইচসি, প্যারাথিয়ন, ডাইব্রোমো-ক্লোরোপেনটিন, প্যারাকোয়াট, টক্সাফেন, ২-৪ডি, এলডিকার্ব, পেন্টাক্লোরোফেনল, মিথক্সি-ইথাইল, মার্কারি ক্লোরাইড এবং ইথাইলিন ডাইব্রোমাইড। শিল্পোন্নত বিভিন্ন দেশে এই সবগুলো বালাইনাশকই নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এমনকি যেসব দেশ এসব বালাইনাশক উৎপাদন করে সেসব দেশেও এগুলোর ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অথচ দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এসব বালাইনাশকের অনেকগুলোই বৈধ বা অবৈধভাবে আমাদের দেশে দেদারছে চলছে। আরও হতাশাজনক ব্যাপার হল, এসব বালাইনাশকের ব্যবহার বন্ধ করার জন্য কার্যকর কোন পদক্ষেপও নেওয়া হচ্ছে না।

যাহোক, এসব বালাইনাশক ব্যবহারের ফলে বাংলাদেশের মানুষের স্বাস্থ্য, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, মৎস্যসম্পদ ইত্যাদি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নিম্নে এসব ক্ষতিকর প্রভাবগুলো সংক্ষেপে আলোচিত হল।

১. মানব-স্বাস্থের উপর প্রভাব

আজকাল প্রায় সব ফসলেই বিষাক্ত বালাইনাশক প্রয়োগ করা হচ্ছে যা আমরা প্রতিদিন জেনে বা না জেনে খাচ্ছি। আমাদের পুষ্টির জন্য সবুজ শাক-সব্জি ও রঙ্গিন ফলমূল খাওয়া অত্যন্ত জরুরী। কিন্তু আমরা যেসব শাক-সব্জি ও ফলমূল খাচ্ছি সেগুলোর উৎপাদন প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ পর্যন্ত প্রতিস্তরে এসব বিষ প্রয়োগ করা হচ্ছে। বিষাক্ত বালাইনাশক প্রয়োগ করে উৎপাদনের পর এসব শাক-সব্জি এবং ফলমূল যেমনঃ আম, কাঁঠাল, কলা, লিচু, পেঁপে, টমেটো ইত্যাদি পাকানো ও টাটকা রাখা এবং ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য প্রয়োগ করা হচ্ছে কার্বাইড ও ইথারেল নামক বিষাক্ত পদার্থ। এসব রাসায়নিক পদার্থের একটি অংশ ফলের খোসার শুক্ষè ছিদ্র দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করে। পরবর্তীতে এ ফল কেউ খেলে এসব বিষাক্ত পদার্থ তার দেহে প্রবেশ করে যা লিভার ও কিডনিসহ মানব দেহের বিভিন্ন ধরণের ক্ষতি সাধন করতে পারে। অথচ, প্রতিদিনই আমরা সেই বিষাক্ত ফল-ফলাদি ও শাক-সব্জি খাচ্ছি এবং আমাদের শিশুদেরকে খাওয়াচ্ছি। এসব বিষের প্রভাবে একদিকে যেমন দেখা দিচ্ছে নানান রোগ-বালাই অন্যদিকে তেমনি জীবনী শক্তিও হ্রাস পাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসী অনুষদের অধ্যাপক চৌধুরী মাহমুদ হাসানের মতে, এসব রাসায়নিক পদার্থ রান্নাতেও দূর হয় না এবং তা লিভার ও কিডনির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। কাজেই নীরব ঘাতকের মতো এসব আকর্ষণীয় খাদ্য আমাদেরকে নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

বিষাক্ত বালাইনাশক শুধু যে ফসল চাষেই ব্যবহৃত হচ্ছে তাই নয়, বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রী প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ও গুদামজাত করার কাজেও ব্যবহৃত হচ্ছে। আমাদের দেশে শুটকি মাছ প্রক্রিয়াজাত ও গুদামজাত করার জন্য নির্বিচারে ডিডিটি, নকরোজ, নগস, বাসুডিন প্রভৃৃতি অত্যন্ত ক্ষতিকারক বালাইনাশক ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশ আণবিক শক্তি কমিশনের গবেষণাগারের পরীক্ষায় দেখা গেছে যে, শুটকি মাছে যেসব বিষাক্ত বালাইনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে সেগুলোর বিষাক্ত উপাদান গরম পানিতে ধোয়ার পরও শুটকি মাছে প্রচুর পরিমাণে থেকে যায়। অর্থাৎ রান্না করা শুকটি মাছ কোনভাবেই বিষমুক্ত হচ্ছে না। ফলে তা চুড়ান্তভাবে মানুষের খাদ্যচক্রে প্রবেশ করছে। বিজ্ঞানীদের দাবী বাংলাদেশে মানব দেহে গড়ে ১২.৫ পিপিএম ডিডিটি রয়েছে যা ইংল্যাণ্ডের মানুষের তুলনায় ৫ গুণ বেশি। বাংলাদেশে ১৪ বছর আগে ডিডিটি নিষিদ্ধ করা হলেও অদ্যাবধি এর ব্যবহার বন্ধ হয়নি।

ব্রাজিল, হংকং ও মেক্সিকোসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গবাদি পশুর দুধে এমনকি মায়ের দুধেও ক্যান্সার সৃষ্টিকারী বালাইনাশকের অবশেষ পাওয়া গেছে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের সুদূর গ্রামাঞ্চলে মায়ের বুকের দুধে বালাইনাশকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। লন্ডনভিত্তিক সংগঠন উইমেনস এনভাইরোনমেন্টাল নেটওয়ার্কের মতে, এসব বালাইনাশক বিষ একেবারে মাতৃগর্ভ থেকে শিশুর মারাত্মক ক্ষতি সাধন করে থাকে। গবেষকদের দাবী খাদ্যে বালাইনাশকের অবশেষ শিল্পোন্নত দেশগুলোতে ব্যাপক স্তন ক্যান্সার সৃষ্টির জন্য দায়ী। এসব দেশে ৩৪-৫৪ বছর বয়সের মহিলাদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হল স্তন ক্যান্সার।

স¤প্রতি জাতিসংঘের ইউরোপভিত্তিক অর্থনৈতিক কমিশন বলেছে উচ্চ বিষাক্ততাযুক্ত ১২টি বালাইনাশকের বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় গত ৫০ বছরে পুরুষের সন্তান উৎপাদন ক্ষমতা শতকরা ৪২ ভাগ কমে গেছে। এর কারণ হিসেবে ধারণা করা হচ্ছে যে, চাষাবাদে ব্যবহৃত রাসায়নিক সারসহ বিষাক্ত কীটনাশক ব্যবহার করে উৎপাদিত ফলমূল, শাক-সব্জি এবং অন্যান্য ফসল দূষিত হয়ে পড়ছে যা খেয়ে মানুষ দীর্ঘমেয়াদি এ ধরণের বিরূপ প্রতিক্রিয়ার শিকার হচ্ছে।

ওয়ার্ল্ড রিসোর্স ইনস্টিটিউট-এর মতে, কৃষি খামার শ্রমিকদের মধ্যে এবং উন্নয়নশীল দেশে অধিকাংশ মৃত্যুর ঘটনা এবং বিশেষ করে ক্যান্সার, বিভিন্ন সংক্রামক ব্যাধি ও অন্যান্য অসুস্থতা বালাইনাশকের কারণে ঘটছে। তাদের মতে, বালাইনাশক শরীরের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়।

কৃষকরা জমিতে জিঙ্ক ও অক্সি সালফেট অধিকহারে ব্যবহার করে থাকে। অথচ জিঙ্ক ও অক্সি সালফেটে রয়েছে বিষাক্ত ক্যাডমিয়াম ও সীসা। খাদ্যচক্র বা পানির মাধ্যমে ক্যাডমিয়াম এবং সীসা মানবদেহে প্রবেশ করলে ক্যান্সার, উচ্চ রক্তচাপ এবং ফুসফুসের জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বালাইনাশকের প্রতিক্রিয়ায় মানুষের বমি বমি ভাব, অন্ত্রে ব্যথা, শারীরিক দুর্বলতা, দীর্ঘমেয়াদী মাংসপেশী সংকোচন ও শ্বাসকষ্ট, ফুসফুসের রোগ, মাথা ব্যথা, ডায়রিয়া প্রভৃতি অসুবিধা দেখা দেয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার শ্রেণীবিন্যাস অনুসারে অত্যন্ত বিষাক্ত হিসেবে চিহ্নিত হেপ্টাক্লোর পাখি ও মানুষের জন্য অধিক ক্ষতিকর। এই বালাইনাশকের সংস্পর্শে এলে মানুষ লিউকোমিয়ায় আক্রান্ত হতে পারে। তা ছাড়া, মাতৃগর্ভস্থ শিশুর মৃত্যু ও বিকলাঙ্গ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বালাইনাশকের কারণে মানবদেহে যেসব স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দেয় সেগুলো নিম্নের ছকে তুলে ধরা হল।

স্বল্পস্থায়ী সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা
স্নায়ুবিক সমস্যা
শারীরিক দুর্বলতা, মাথা ধরা, বমি বমি ভাব, জ্বর, অতিরিক্ত ঘাম, লালা ঝরা, মুর্ছা যাওয়া ইত্যাদি প্যারালাইসিস, অবশ, বিষন্নতা
চোখের সমস্যা
জ্বালাপোড়া, চোখ দিয়ে পানি ঝরা, চোখে চুলকানি। চোখে ক্ষত হওয়া, চোখ নষ্ট হওয়া, চোখের বল নষ্ট হওয়া
হার্টের সমস্যা
নাড়ী দুর্বলতা, হার্ট এ্যাটাক বুকে ব্যথা
ফুসফুসের সমস্যা
স্বাসকষ্ট এ্যাজমা, ব্রংকাইটিস, ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া
মূত্র ও প্রজনন সমস্যা
ঘন ঘন প্রস্রাব, বাচ্চা নষ্ট হয়ে যাওয়া কিডনি নষ্ট হওয়া, বন্ধাত্ব
ত্বক, মাংসপেশী ও হাড়ের সমস্যা
চুলকানি, ফুসকা পড়া ত্বক ঝুলে পড়া, পেশি শক্তি কমে যাওয়া, মাংস পেশিতে খিচুনি, একজিমা
পাকস্থলির সমস্যা
প্রচণ্ড পিপাসা, বমি, পেটে ব্যথা, ডাইরিয়া অরুচি, ওজন হ্রাস, অন্ত্রে রক্তক্ষরণ
লিভারে সমস্যা
নেক্রোসিস জণ্ডিস
অন্যান্য সমস্যা
ক্লান্তি, অবসাদ, দুশ্চিন্তা ক্যান্সার, স্তন ক্যান্সার, স্মৃতি শক্তি ও মনযোগ লোপ পাওয়া

 

২. মৎস্যসম্পদ ও জলজ প্রাণীর উপর প্রভাব

একসময় আমাদের নদী-নালা, খাল-বিল, হাওড়-বাওড়, জলাশয়ে প্রচুর মাছ ছিল। “মাছে-ভাতে বাঙ্গালী” – এটি ছিল একটি সর্বজনবিদিত প্রবাদ। আজকাল ফসলের মাঠে প্রচুর পরিমাণে বালাইনাশক প্রয়োগ করা হচ্ছে যেগুলো বৃষ্টি ও সেচের পানির সাথে মিশে নদী-নালা, খাল-বিল, পুকুর, ডোবা ইত্যাদি জলাশয়ে চলে যাচ্ছে। ফ্লাড এ্যাকশন প্লান (ফ্যাপ) এবং পরিবেশ অধিদপ্তর যৌথভাবে ১৯৯২-৯৩ সালে এ বিষয়ে এক সমীক্ষা চালায়। দেশের বিভন্ন অঞ্চলের বিল যেমনঃ গাইবান্ধার বিল, কুমিল­ার নিগার বিল এবং নোয়াখালির বেগমগঞ্জের বিল থেকে পানি সংগ্রহ করে ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করা হয়। এতে দেখা যায় যে, বিলের পানিতে বিষাক্ত বালাইনাশক ডাইএলড্রিন-এর অবশেষ প্রতিলিটারে ০.৬৪ মাইক্রোগ্রাম যেখানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত সহনীয় মাত্রা হচ্ছে ০.১৯ মাইক্রোগ্রাম। অর্থাৎ সহনীয় মাত্রার চেয়ে তিনগুনেরও বেশী। অপর একটি বিষাক্ত বালাইনাশক লিনড্রেন এর অবশেষ প্রতিলিটারে ০.২৩১ থেকে ০.৫৪৭ মাইক্রোগ্রাম পাওয়া যায়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা অনুষদের এক গবেষণায় দেখা গেছে যে, মাছে ডায়জিনন, ফোরাডান ও বাসুডিনের অবশেষ ক্ষতিকর মাত্রায় উপস্থিত। এসব বালাইনাশকের বিষক্রিয়ায় বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে মাছ মারা যাচ্ছে এবং মাছের বংশ বৃদ্ধির হারও কমে যাচ্ছে। বালাইনাশক এবং রাসায়নিক সারের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে নদ-নদী, পুকুর এবং জলাশয়ের পানির দূষণ আশঙ্কাজনকহারে বেড়ে যাওয়ায় মাছসহ অনেক জলজ প্রাণী আজ বিলুপ্তির পথে।

৩. ফসলের উপকারী পোকামাকড় ও পশুপাখির উপর প্রভাব

সাধারণত ফসলের মাঠে যত ধরণের ক্ষতিকর পোকা থাকে উপকারী পোকামাকড় থাকে তার থেকে বেশি। এসব উপকারী পোকামাকড় ক্ষতিকর পোকামাকড় ধরে খায়, ফলে এরা বাড়তে পারেনা এবং ফসলের বেশি ক্ষতিও করতে পারে না। যখন জমিতে বালাইনাশক বিষ দেওয়া হয় তখন ক্ষতিকর পোকার চেয়ে উপকারী পোকা অনেক তাড়াতাড়ি মারা যায় এবং সাথে সাথে কেঁচো, ব্যাঙ ইত্যাদি উপকারী প্রাণীও মারা যায়। ক্ষতিকর পোকামাকড় এরূপ প্রতিকূল অবস্থায় টিকে থাকতে পারলেও উপকারী পোকামাকড় তা পারে না। এভাবে অনেক উপকারী পোকামাকড় আমাদের পরিবেশ থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।

৪. জীববৈচিত্র্যের উপর প্রভাব

ইতোপূর্বেই বলা হয়েছে যে, জমিতে বালাইনাশক বিষ দেওয়ার ফলে আমাদের জমিতে নানারকম জীব যেমনঃ কেঁচো, সাপ, ব্যাঙ, শামুক ইত্যাদি মরে মরে ক্রমেই বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে এসব বিষ খাদ্য শিকলের মাধ্যমে গোটা জীবজগতে ছড়িয়ে গিয়ে ধ্বংস করে দিচ্ছে আমাদের অত্যন্ত সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যকে। আমাদের চারপাশের নানা রকম জীব একে অপরকে খেয়ে বেঁচে থাকে। যেমনঃ পোকা গাছের বিভিন্ন অংশ খায়, সে পোকাকে খায় ব্যাঙ, ব্যাঙকে খায় সাপ, সাপকে খায় বাজপাখি। এভাবে এক জীব অন্য জীবকে খাওয়ার ফলে একটি চেইন বা শিকল সৃষ্টি হয় যাকে খাদ্য শিকল বলা হয়। এ খাদ্য শিকলের একটি জীব মারা গেলে তার উপর নির্ভরশীল অন্য জীবও খাদ্যের অভাবে বেঁচে থাকতে পারে না। কাজেই ক্ষতিকর পোকা মারার জন্য বিষ দিলেও সে বিষ খেয়ে খাদ্য শিকলের অন্যান্য প্রাণীও মরে যাচ্ছে। তা ছাড়া, পোকা না থাকলে ব্যাঙ খাবে কি? ব্যাঙ না থাকলে সাপ খাবে কি? সাপ না থাকলে পাখি খাবে কি? এভাবে খাদ্যের অভাবে অনেক জীবই ক্রমশ বিলুপ্তির পথে। আর এভাবেই প্রতিনিয়ত ধবংস হচ্ছে আমাদের এককালের অত্যন্ত সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য।

৫. পরিবেশের ও ইকোসিস্টেমের উপর প্রভাব

আমাদের পরিবেশে যে সকল উপাদান যে পরিমাণে থাকলে উদ্ভিদ ও প্রাণী স্বাভাবিকভাবে বাস করতে পারে সেগুলো যদি কোন পরিবেশে সঠিক পরিমাণে থাকে তবে তাকেই আমরা বলব বিশুদ্ধ পরিবেশ। পরিবেশে কোন ক্ষতিকর উপাদান থাকলে অথবা কোন উপাদান স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে কম বা বেশি থাকলে সে পরিবেশকে বিশুদ্ধ বলা যাবে না। আজ আমাদের পরিবেশের বিভিন্ন উপাদান যেমনঃ মাটি, পানি, বাতাস মারাত্মকভাবে দুষিত হয়ে যাচ্ছে যার জন্য রাসায়নিক কৃষি অনেকাংশে দায়ী।

এই পৃথিবীতে একমাত্র সবুজ উদ্ভিদই নিজের খাদ্য নিজে তৈরি করতে পারে। মাটি থেকে পানি ও বিভিন্ন খনিজ লবণ এবং বাতাস থেকে কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে  সূর্যালোকের সাহায্যে সালোক-সংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় গাছ এ খাদ্য তৈরি করে। এ খাদ্য খেয়ে উদ্ভিদ নিজে বেঁচে থাকে, বড় হয় এবং বংশ বিস্তার করে এবং পৃথিবীর তাবৎ প্রাণীকূলকে বাঁচিয়ে রাখে। যেহেতু কোন প্রাণীই নিজের খাদ্য নিজে তৈরি করতে পারে না তাই সকল প্রাণীই তার খাদ্যের জন্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে উদ্ভিদের উপর নির্ভরশীল। যেমনঃ উদ্ভিদভোজী প্রাণী উদ্ভিদকে খায়, মাংসভোজী প্রাণী উদ্ভিদভোজী প্রাণীকে খায়, অন্যান্য প্রাণী আবার মাংসভোজী প্রাণীকে খায়। শেষ পর্যন্ত এসব প্রাণী ও উদ্ভিদ যখন মারা যায় তখন তাদের মৃত দেহের উপর শুরু হয় এক জৈব-রাসায়নিক ক্রিয়া যাকে বলা হয় পঁচন। ব্যাকটেরিয়ার মত অসংখ্য অনুজীব উদ্ভিদ বা প্রাণীর মৃতদেহকে পঁচিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয় যেগুলোকে গাছ আবার খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে থাকে। এভাবেই খাদ্যচক্রের মাধ্যমে খাদ্যশক্তি এক জীব আর এক জীবে বাহিত হয়।

পরিবেশের উদ্ভিদ, প্রাণী ও অনুজীব একে অন্যের উপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল। এরূপ নির্ভরশীলতার ফলে যে অবিচ্ছিন্ন সিস্টেমের সৃষ্টি হয় তাকে বলা হয় ইকোসিস্টেম। প্রাণী হিসেবে মানুষও এই সিস্টেমের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। অনাদিকাল থেকেই এরূপ সিস্টেম বিরাজমান যা প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। কিন্তু রাসায়নিক সার ও বালাইনাশক ব্যবহারের ফলে এই ইকোসিস্টেম ও প্রাকৃতিক পরিবেশ আজ মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত।

জমিতে বিষ দিলে ক্ষেতের ফসলের ভিতর সে বিষ প্রাণীদেহে প্রবেশ করে। এ ফসল পোকায় খাচ্ছে ফলে পোকার দেহেও যাচ্ছে। আবার, এসব পোকাকে অন্য প্রাণী ধরে খাচ্ছে ফলে, পোকার দেহেও যাচ্ছে। আবার, এসব পোকাকে অন্য প্রাণী ধরে খাচ্ছে ফলে, সে প্রাণীর দেহেও বিষ যাচ্ছে। বিষ দেওয়া ধানের খড় গরু খায় এতে গরুর দেহেও বিষ যাচ্ছে, গরুর মাংস, দুধ আমরা খাচ্ছি ফলে এ বিষ আবার আমাদের দেহে চলে আসে। আবার সে বিষ পানি, বাতাসে মিশছে এবং তা মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর দেহে প্রবেশ করছে। এভাবে জমিতে দেওয়া বিষ খাদ্যচক্রের মাধ্যমে ইকোসিস্টেমের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে বিষাক্ত করে তুলছে আমাদের পরিবেশ।

পোকামাকড় দমনে কীটনাশকই শেষ সামাধান নয়

কীটনাশক প্রয়োগ করেও আজকাল অনেক ক্ষেত্রেই পোকামাকড় দমন করা যাচ্ছে না। অব্যাহতভাবে অতিরিক্ত মাত্রার কীটনাশক ব্যবহারের কারণে একদিকে যেমন উপকারী ও প্রয়োজনীয় কীট-পতঙ্গ বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে অন্যদিকে তেমনি নতুন প্রজাতির পোকা-মাকড়ের জন্ম হচ্ছে যা প্রচলিত মাত্রার কীটনাশক দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। বেগুনের কাণ্ড ও ফল ছিদ্রকারী পোকা-এর জলন্ত উদাহরণ। বর্তমানে বেগুন চাষীরা কয়েক জাতের কীটনাশক দিনে দুইবার করে প্রয়োগ করার পরও এ পোকা দমন করতে পারছে না। এর কারণ মূলত দুটো-

একঃ সাধারণত ফসলের মাঠে যত ধরণের ক্ষতিকর পোকামাকড় থাকে তার চেয়ে অনেক বেশি ধরণের উপকারী পোকামাকড় থাকে। এসব উপকারী পোকামাকড় ক্ষতিকর পোকামাকড় ধরে খায় বা নানাভাবে ধবংস করে থাকে। ফলে, এসব ক্ষতিকর পোকামাকড় বেশি বাড়তে পারে না এবং বেশি ক্ষতিও করতে পারে না। অথচ আমরা যখন জমিতে বিষ দিই তখন ক্ষতিকর পোকার চেয়ে উপকারী পোকা অনেক তাড়াতাড়ি মারা যায় এবং সাথে সাথে কেঁচো, ব্যাঙ ইত্যাদি উপকারী প্রাণীও মারা যায়। কিন্তু ক্ষতিকর পোকামাকড় সহজে মারা যায় না। কীটনাশক প্রয়োগ করার পরও যেসব পোকামাকড় বেঁচে থাকে সেগুলো তখন আরও দ্রুত ও ব্যাপকভাবে বেড়ে উঠে। কারণ, তখন তাদের জন্য ফাঁকা মাঠ, কোন শত্র“ মাঠে নেই। এমতাবস্থায়, একটি কম ক্ষতিকর পোকাও বেশি ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে।

দুইঃ জমিতে কীটনাশক প্রয়োগ করা হলেও একেবারে সব পোকা মারা যায় না। কারণ, সব পোকার দেহে সমানভাবে কীটনাশক বিষ প্রবেশ করেনা। যেসব পোকার দেহে অল্প মাত্রায় কীটনাশক বিষ প্রবেশ করে তারা বেঁচে থাকে। এভাবে বিষ খেয়েও বেঁচে থাকা পোকার দেহে এক ধরণের প্রতিরোধ ক্ষমতা জন্মায়। তখন এসব পোকার দেহে কোন বিষই আর কাজ করে না, এমনকি বেশি মাত্রায় বারবার দিলেও না। যে সমস্যা বর্তমানে বেগুনের ফল ও ডগা ছিদ্রকারী পোকাসহ অনেক পোকার ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে।

১৮৭৪ সালে জার্মান রসায়নবিদ মিঃ থাইডলার ডিডিটি আবিষ্কার করেন। এই ডিডিটি যখন কীটনাশক হিসেবে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতে থাকে তখন অল্পদিনের মধ্যেই দেখা গেল যে, কীটপতঙ্গেরা নিজেদের দেহের মধ্যে এ্যান্টি ডিডিটি তৈরি করে ফেলেছে। পরবর্তীকালে ডিডিটি-এর সূত্র ধরে আরো নানা ধরণের শক্তিশালী কীটনাশক বিষ তৈরি হয় যেগুলো এখন ব্যাপকভাবে পৃথিবীব্যাপী ব্যবহৃত হচ্ছে।

উপরোক্ত কারণগুলো বিবেচনায় নিলে নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, কীটনাশক সব সময়, সব ক্ষেত্রে পোকামাকড় দমনের নিশ্চয়তা দিতে পারে না। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে বর্তমানে ৩০০টিরও অধিক প্রজাতির পোকা একাধিক কীটনাশক প্রতিরোধে সক্ষম। অর্থাৎ প্রচলিত কীটনাশকে এসব পোকা দমন করা সম্ভব হচ্ছে না।

পক্ষান্তরে, আজ একটা ব্যাপার গভীরভাবে ভাববার সময় এসেছে, সেটা হল, এই পৃথিবীতে কি মানুষ একাই বেঁচে থাকবে? পৃথিবীতে অন্য জীবজন্তু বিশেষ করে বন্য জীবজন্তু ও পশুপাখি যেগুলো সরাসরি মানুষের কাজে লাগেনা, তাই মানুষ যেগুলোকে লালন-পালনও করেনা, সেগুলো কি টিকে থাকতে পারবেনা! বিষয়টা কি এমন দাড়াবে যে, যেসব পশুপাখির বাণিজ্যিক মূল্য আছে কেবল সেগুলোই মানুষ পুষবে বা লালন পালন কররে আর অন্য সব প্রাণী বিলুপ্ত হবে! কারণ, মানুষ তার ফসল রক্ষার জন্য প্রথম ভোক্তা বা পোকামাকড় বিষ প্রয়োগ করে মেরে ফেলছে। আর এই বিষ ছড়িয়ে যাচ্ছে গোটা ইকোস্টিমে। ফলে, খাদ্য শিকল ধ্বংস হচ্ছে। আর প্রতিনিয়ত বিলুপ্ত হচ্ছে হাজারও প্রজাতির প্রাণী। কাজেই, মানব-স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের উপর বালাইনাশকের ক্ষতিকর প্রভাবসমূহ বিবেচনায় নিলে বালাইনাশকের ব্যবহার বন্ধ করার কোন বিকল্প নেই।