Mar 23, 2026 | আত্নকথা
ভালো-মন্দের আর্থসামাজিক মাত্রা ও পরিমিতি,
কিংবা লাভ-ক্ষতির আর্থনৈতিক হিসেব-নিকেশ
অদ্যাবধি ওভাবে বুঝে ওঠা হলো না আমার।
এগুলো বোঝার মতো অতটা সমঝদারও আমি কখনো নই।
চালাক, চতুর, বুদ্ধিমান—
শব্দগুলো আমার হয়ে ওঠেনি কখনো।
তবুও যে কিভাবে টিকে আছি এই জনপদে,
সেটাই এক বিপুল বিস্ময়।
অবশ্য ডারউইনবাদ মতে টিকে থাকার
যে যোগ্যতাটুকু অত্যাবশ্যকীয়,
সেটা ছাড়াও টিকে থাকা যায়।
অবশ্য তাকে টিকে থাকা বলা ঠিক হবে কি না,
তা নিয়ে আমার আছে বিস্তর বিভ্রান্তি।
গরু-ছাগল, এমন তাবৎ গৃহপালিত প্রাণিকুল,
তারাও তো দিব্যি টিকে থাকে, শুধু নয়—
কমলাপুরে নগ্নদেহে রাত কাটানো শিশুটির চেয়ে
সহস্রগুণ সুরম্য আবাসে তাদের বসবাস।
পুষ্টিকর ও দামি সব খাদ্য-ওষুধ খাইয়ে-দাইয়ে
এমনই নাদুসনুদুস করে তোলা হয়
একদিন জবাই হয়ে মানুষের খাদ্য হবে বলে।
অথচ সেই নিরীহ শকুন,
যে কিনা পেটের দায়ে বেঁচে থাকার,
কিংবা টিকে থাকার লড়াইয়ে
মৃত প্রাণীর দেহ ভক্ষণ করে থাকত বেঁচে,
তাকে টিকতে দেয়নি মানুষ।
টিকে থাকার লড়াইরত রয়েল বেঙ্গল টাইগার,
কিংবা মানুষখেকো চিতা-সিংহ,
যাদেরকে দর্শনীয় করে টিকিয়ে রাখতে
বিশ্বনেতারা বসে বিশ্ব বাঘ সম্মেলনে,
যত্ন করে গড়ে তোলে চিড়িয়াখানা,
কিংবা হালের সাফারি পার্ক।
যেমনিভাবে কলকারখানা চালু রাখতে
টিকিয়ে রাখতে হয় শ্রমজীবীদের,
কিংবা আহার যোগাতে টিকিয়ে রাখতে হয়
দাসরূপী কৃষকদের,
তেমনিভাবে টিকে থাকি আমি,
টিকে থাকি আমরা আমজনতা।
—————
ময়মনসিংহ ।। ২৩/৭/২২
Mar 22, 2026 | আত্নকথা
যেদিন দিকবিদিক আলোকিত করে
মায়ের কোলজুড়ে ‘অদিতি’ এলো,
কালরাত্রির ঠিক দু’দিন আগে
সেটা ছিল স্বাধীনতার মাস।
আগাম কালবৈশাখীর সে রাত্তিরে
হৃদয়জুড়ে মিশ্র অনুভূতি—
একদিকে আনন্দের উষ্ণ শিহরণ,
আরেকদিকে একরাশ শঙ্কা ও ভয়!
কারণ, ছাড়পত্র পাওয়া নবজাতকের কাছে
সুকান্তের করা দীপ্ত অঙ্গীকারখানি
তখনও যে বাতাসে হাহাকার হয়ে ফিরে।
দূষণ, শোষণ, নিপীড়ন, অনাচারে
ধরণীটা যে শুধু বাস-অযোগ্যই নয়,
লোলুপ মানবের নিরন্তর অত্যাচারে
বিপন্ন তার অস্তিত্বটাও।
নবজাতকের নাম দিলুম ‘অদিতি’,
যে ধরণীমাতা তার আপন মহিমায়
দূর করে দেবে জরাজীর্ণ যত অকল্যাণ।
আর আমি, অথর্ব এক জনক,
গেয়ে উঠি সুকান্তের হারানো সে গান—
“প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল,
এ বিশ্বকে শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি,
নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।”
তারপর কত স্বপ্ন, কত কাজ— নেই অবসর।
ঠিক চার বছর পর
যেদিন ‘অর্ক’ ভূমিষ্ঠ হলো,
সেটা ছিল মুক্তির লাল সূর্যোদয়ের মাস।
নবজাতকের তরে বাসযোগ্য বিশ্ব গড়ার
আমাদের প্রাণান্ত সংগ্রামের বিজয়কেতন
তখনও যে সুদূর পরাহত।
তাই নতুন করে অব্যক্ত মনে
পুরোনো অঙ্গীকার আউড়েছিলাম আরবার।
তারপর একে একে মাস গেল,
বছর গেল, কেটে গেল দশক,
পাল্টে গেল অনেক কিছুই।
তবু অদ্ভুত আধারে ঝাপসা চোখে
ভেসে ওঠে নিরুত্তর প্রশ্নমালা—
কতটুকু বাসযোগ্য হলো ধরণীতল
নবজাতক মানবশিশুর তরে?
দূষণ, শোষণ, নিপীড়ন, অনাচার
কতটুকু কমতি হলো?
নাকি বাড়ল আরও?
যতটুকু নির্ভয় নিরাপত্তা ছিল
আমাদের গ্রাম্য বাল্যবেলায়,
ততটুকুও কি আছে অবশেষ
নবজাতকের তরে এই পাষাণনগরে?
আজ বুঝতে পারি এই অবেলায় এসে—
এই লড়াইয়ের নেই অবসান।
অন্তবিহীন এক লড়াইয়ের নামই জীবন।
যেদিন ধরাভূমে মনুষ্যপ্রজাতির আবির্ভাব,
সেদিন থেকেই যে লড়াইয়ের অশুভ সূচনা।
মানুষের এ লড়াই বিরূপ প্রকৃতির সাথে,
রোগ-শোক-জরা-ব্যাধি-মৃত্যুর সাথে,
ভয়ংকর হিংস্র জন্তু-জানোয়ারের সাথে,
আর সবচেয়ে ভয়ংকর, সবচেয়ে হিংস্র
মনুষ্যপ্রজাতির সাথে।
এই লড়াইয়ের সমাপ্তি সহসা হবার নয়,
কিংবা হয়তো কোনো কালেই হবার নয়।
আদতে সব প্রাণীই লড়ে যায় অবিরাম—
এই ধরার বুকে টিকে থাকার লড়াই।
শেষতক কেবল যোগ্যতমই টিকে থাকে,
ডারউইনের বিবর্তনবাদ মেনে।
যদিও বড্ড আপেক্ষিক এই টিকে থাকা,
চিরস্থায়ী নয় তো মোটেও।
কিন্তু কী সে যোগ্যতা?
আকার-আকৃতি, দেহবল? তা তো নয়।
তাহলে বিশালাকার ডাইনোসর বিলুপ্ত হতো না,
বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচাতে
বিশ্ব বাঘ সম্মেলনও ডাকতে হতো না।
তবে কি জ্ঞান, প্রযুক্তি, কৌশল-প্রকৌশল—
এসবই টিকে থাকার মূলমন্ত্র?
কিন্তু অজ্ঞানতা যখন জ্ঞানের বিপক্ষে জয়ী হয়,
কৌশল পরাভূত হয় অপকৌশলের কাছে,
তখন সভ্যতা মুখ থুবড়ে পড়ে থাকে—
যেমন মুখ থুবড়ে পড়ে বারবার
আমার স্বপ্ন, আমার অঙ্গীকার।
ময়মনসিংহ ।। ০৩.১২.২০১৯
(অর্ক’র জন্মদিনে)