আমার স্বপ্ন, আমার অঙ্গীকার

আমার স্বপ্ন, আমার অঙ্গীকার

যেদিন দিকবিদিক আলোকিত করে
মায়ের কোলজুড়ে ‘অদিতি’ এলো,
কালরাত্রির ঠিক দু’দিন আগে
সেটা ছিল স্বাধীনতার মাস।
আগাম কালবৈশাখীর সে রাত্তিরে
হৃদয়জুড়ে মিশ্র অনুভূতি—
একদিকে আনন্দের উষ্ণ শিহরণ,
আরেকদিকে একরাশ শঙ্কা ও ভয়!

কারণ, ছাড়পত্র পাওয়া নবজাতকের কাছে
সুকান্তের করা দীপ্ত অঙ্গীকারখানি
তখনও যে বাতাসে হাহাকার হয়ে ফিরে।
দূষণ, শোষণ, নিপীড়ন, অনাচারে
ধরণীটা যে শুধু বাস-অযোগ্যই নয়,
লোলুপ মানবের নিরন্তর অত্যাচারে
বিপন্ন তার অস্তিত্বটাও।

নবজাতকের নাম দিলুম ‘অদিতি’,
যে ধরণীমাতা তার আপন মহিমায়
দূর করে দেবে জরাজীর্ণ যত অকল্যাণ।
আর আমি, অথর্ব এক জনক,
গেয়ে উঠি সুকান্তের হারানো সে গান—
“প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল,
এ বিশ্বকে শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি,
নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।”
তারপর কত স্বপ্ন, কত কাজ— নেই অবসর।

ঠিক চার বছর পর
যেদিন ‘অর্ক’ ভূমিষ্ঠ হলো,
সেটা ছিল মুক্তির লাল সূর্যোদয়ের মাস।
নবজাতকের তরে বাসযোগ্য বিশ্ব গড়ার
আমাদের প্রাণান্ত সংগ্রামের বিজয়কেতন
তখনও যে সুদূর পরাহত।
তাই নতুন করে অব্যক্ত মনে
পুরোনো অঙ্গীকার আউড়েছিলাম আরবার।

তারপর একে একে মাস গেল,
বছর গেল, কেটে গেল দশক,
পাল্টে গেল অনেক কিছুই।
তবু অদ্ভুত আধারে ঝাপসা চোখে
ভেসে ওঠে নিরুত্তর প্রশ্নমালা—
কতটুকু বাসযোগ্য হলো ধরণীতল
নবজাতক মানবশিশুর তরে?
দূষণ, শোষণ, নিপীড়ন, অনাচার
কতটুকু কমতি হলো?
নাকি বাড়ল আরও?
যতটুকু নির্ভয় নিরাপত্তা ছিল
আমাদের গ্রাম্য বাল্যবেলায়,
ততটুকুও কি আছে অবশেষ
নবজাতকের তরে এই পাষাণনগরে?

আজ বুঝতে পারি এই অবেলায় এসে—
এই লড়াইয়ের নেই অবসান।
অন্তবিহীন এক লড়াইয়ের নামই জীবন।
যেদিন ধরাভূমে মনুষ্যপ্রজাতির আবির্ভাব,
সেদিন থেকেই যে লড়াইয়ের অশুভ সূচনা।
মানুষের এ লড়াই বিরূপ প্রকৃতির সাথে,
রোগ-শোক-জরা-ব্যাধি-মৃত্যুর সাথে,
ভয়ংকর হিংস্র জন্তু-জানোয়ারের সাথে,
আর সবচেয়ে ভয়ংকর, সবচেয়ে হিংস্র
মনুষ্যপ্রজাতির সাথে।
এই লড়াইয়ের সমাপ্তি সহসা হবার নয়,
কিংবা হয়তো কোনো কালেই হবার নয়।

আদতে সব প্রাণীই লড়ে যায় অবিরাম—
এই ধরার বুকে টিকে থাকার লড়াই।
শেষতক কেবল যোগ্যতমই টিকে থাকে,
ডারউইনের বিবর্তনবাদ মেনে।
যদিও বড্ড আপেক্ষিক এই টিকে থাকা,
চিরস্থায়ী নয় তো মোটেও।
কিন্তু কী সে যোগ্যতা?
আকার-আকৃতি, দেহবল? তা তো নয়।
তাহলে বিশালাকার ডাইনোসর বিলুপ্ত হতো না,
বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচাতে
বিশ্ব বাঘ সম্মেলনও ডাকতে হতো না।

তবে কি জ্ঞান, প্রযুক্তি, কৌশল-প্রকৌশল—
এসবই টিকে থাকার মূলমন্ত্র?
কিন্তু অজ্ঞানতা যখন জ্ঞানের বিপক্ষে জয়ী হয়,
কৌশল পরাভূত হয় অপকৌশলের কাছে,
তখন সভ্যতা মুখ থুবড়ে পড়ে থাকে—
যেমন মুখ থুবড়ে পড়ে বারবার
আমার স্বপ্ন, আমার অঙ্গীকার।

ময়মনসিংহ ।। ০৩.১২.২০১৯
(অর্ক’র জন্মদিনে)

সমন্বিত কৃষি ও আমার কথা

সমন্বিত কৃষি ও আমার কথা

আমাদের খাদ্য ব্যবস্থার ভয়াবহ পরিণতির কথা আমি গত প্রায় দুই দশক ধরে বলে আসছি বিভিন্ন সেমিনারে, আলোচনায় এবং লেখায়। বলে আসছি যে, আমাদের বর্তমান খাদ্য ব্যবস্থা যেভাবে মানুষ এবং মাটির জন্য বিষাক্ত ও অস্বাস্থ্যকর হচ্ছে এবং যেভাবে প্রকৃতি, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও প্রতিবেশ ধ্বংসপ্রাপ্ত হচ্ছে তা যদি বদলানো না যায় তবে দীর্ঘমেয়াদে আমাদের অস্তিস্তও বিপন্ন হয়ে পড়বে। কিন্তু গরিবের কথা কেউ শোনে না। সবাই শুধু বলে, “জমি কমছে, মানুষ বাড়ছে। কাজেই ফলনের উলম্ব বৃদ্ধি ছাড়া গত্যন্তর নেই।”
এরূপ বক্তব্যের উত্তরে আমি বলি, ফলন বাড়ানোর চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে আমাদের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করা। কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই কেউ এ কথায় কান দিতে চায় না। কারণটাও স্পষ্ট। রমজানের রোজা যে জাতির খাদ্যাসক্তি কমাতে পারে না, বরং বাড়িয়ে দেয়, সে জাতি খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের কথা শুনবে কেন। আরও একটা কারণ আছে, সেটা হচ্ছে, মানুষের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন সহজ কোন ব্যাপার নয়। এজন্য কমপক্ষে এক জেনারেশন সময় লাগবে। অর্থাৎ আজকে শুরু করলে এবং একটা প্রজন্মকে সঠিক ও স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যাভ্যাসে অভ্যস্থ করতে পারলে তবেই কেবল প্রজন্মান্তরে চূড়ান্ত সুফল আসতে পারে। সুতরাং এতো দীর্ঘ সমাধান কে মানতে চাইবে। কিন্তু যার পরিণতি কেবল ধ্বংস তা সম্যক উপলব্ধিতে নিলে সবাই মানতে বাধ্য হতো যে, এছাড়া বিকল্প কোন পথ খোলা নেই।
আরও বলতাম, আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী “সমন্বিত কৃষি ব্যবস্থা” ফিরিয়ে আনার কথা। কিন্তু দেশের প্রায় সকল নীতিনির্ধারক ও কৃষি-বিশেষজ্ঞমহল সর্বশক্তি নিয়োগ করে আসছেন আমাদের নিজস্ব সমন্বিত কৃষি ব্যবস্থার যেটুকু অবশিষ্ট আছে তার সবটুকু ধ্বংস করে দিয়ে বিদেশি মনোকালচারনির্ভর “হাই ইনপুট, হাই আউটপুট” ধারণার কৃষি প্রবর্তনে। কারণ ওই একটাই। খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে হবে। এজন্য লক্ষ লক্ষ টন রাসায়নিক সার, হাজার হাজার টন কীটনাশক বিষের সাথে নতুন করে যুক্ত আগাছানাশক, গ্রোথ প্রমোটার হরমোন ইত্যাদি ঢালা হচ্ছে আমাদের মাটি ও পরিবেশে। ফলাফল যা হওয়ার তাই হচ্ছে। আমরা যাদের প্রযুক্তির ডাম্পিং ভাগাড়ে পরিণত হয়েছি, তারা কিন্তু দ্রুতগতিতে জৈব কৃষির দিকে ছুটছে। জৈব কৃষি প্রবর্তনে তারা অধিক হারে ভর্তুকি ও রাষ্ট্রীয় প্রণোদনা দিচ্ছে।
অথচ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. আলতাফ হোসেন স্যার সুদীর্ঘ ২৫ বছর ধরে গবেষণা করে দেখিয়েছেন, “সমন্বিত কৃষি ব্যবস্থা” কীভাবে দেশের কৃষিকে আরও বেশি উৎপাদনশীল ও স্থায়িত্বশীল করতে পারে। কিন্তু তাঁর এই সুদীর্ঘ গবেষণার ফলাফলকে কাজে লাগানো তো দূরের কথা, বাকৃবির কৃষিতত্ত্ব বিভাগে কাউকে খুঁজে পাইনি, যিনি এই গবেষণাকর্মকে ধারণ করে এগিয়ে নিচ্ছেন। অবশ্য এটা এমন এক জটিল এবং প্রায়োগিক গবেষণা, যা আলতাফ স্যার পেরেছিলেন “খামারকুঞ্জ” নামের এক বিশাল প্রকল্পের মাধ্যমে, উনার অবসর গ্রহণের সাথে সাথে যার ইতি ঘটেছে।
কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার এক সহপাঠী বন্ধু ছিলো যার নাম খন্দকার মোসাদ্দেক আল মামুন। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালেই সে তাদের কুড়িগ্রামের পৈত্রিক জমিতে একটি সমন্বিত কৃষি খামার গড়ে তোলার স্বপ্নের কথা আমাদেরকে শুনাতো। মায়ের নামে নামও তখনই ঠিক করে ফেলেছিলো “তনু সমন্বিত কৃষি খামার” সংক্ষেপে টিয়া ফার্ম”। সেসময় আমি নিজেও এটাকে পাগলামি বলে তেমন গুরুত্ব দেইনি। কিন্তু সে এতোটাই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলো যে, সত্যি সত্যি কৃষি বিষয়ে অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা দিয়েই খামারের কাজ শুরু করতে নেমে গেলো। কিন্তু বাধ সাধলো তার পরিবার। ক্যাডেট কলে পড়ুয়া যে ছেলের সেনা কর্মকর্তা কিংবা ডাক্তার—ঞ্জিনিয়ার হওয়ার কথা সে যদি কৃষক হতে চায় সেটা এদেশের কোন পরিবারের মেনে নেওয়ার কথা নয়। তবুও তার ইষ্পাতকঠিন পণ আর তার কৃষিপ্রেমি জেলার বড় ভাইয়ের সমর্থনে পরিবারের মতের বিরূদ্ধে গিয়ে উক্ত খামার গড়ে তোলার কঠিন সংগ্রামে আত্মনিয়োগ করেছিলো। তবে পারিবারিক জমিতে তাকে নামতে দেওয়া হয়নি। ধরলার চরে পানির দামে বড় ভাইয়ের কিনে দেওয়া কয়েক বিঘা জমিতেই তাকে খামারটা শুরু করতে হয়েছিলো।
ওদিকে আমিও তখন নিজের ক্যারিয়ারের কথা ভুলে স্থায়িত্বশীল কৃষি নিয়ে কাজ করার প্রত্যয়ে উন্নয়ন ধারা নামের এক অখ্যাত তৃণমূল সংস্থায় এক পাগলামি কর্ম শুরু করে দিয়েছিলাম। অনেকদিন আমাদের মধ্যে তেমন কোন যোগাযোগ ছিলোনা। শুধু জানতাম যে, সে খামারের কাজ করছে। বছর দশেক পর আমি আমার কাজের অংশ হিসেবে সারা বাংলাদেশ থেকে স্থায়িত্বশীল কৃষি ও জীবনযাত্রার সফলতার গল্প নিয়ে “স্থায়িত্বশীল জীবন জীবিকার সন্ধানে” শীর্ষক একটি কেইস স্টাডির কাজে হাত দিয়েছি। তখন মনে হলো, মামুনের খামারের উপর একটা কেইস স্টাডি করি। সেই কাজের সূত্রে মামুনের খামার পরিদর্শনে গিয়ে এক ঝলক আলোক রশ্মির মতো স্থায়িত্বশীল কৃষির একটি ভবিষ্যত রূপরেখা দেখে অভাবনীয় অভিভূত এবং আশান্বিত হয়েছিলাম। আমি ওর খামারের ওপর একটি কেইস স্টাডি করেছিলাম যা বাংলা ও ইংরেজিতে “স্থায়িত্বশীল জীবন-জীবিকার সন্ধানে” শীর্ষক পুস্তক আকারে অন্য অনেকগুলো কেইস স্টাডির সাথে বাংলা ও ইংরেজিতে উন্নয়ন ধারা কর্তৃক প্রকাশিত হয়েছিলো। যদিও মামুনের খামারটা সম্পূর্ণ জৈব খামার ছিলো না, তবে মামুনের সঙ্গে পরিকল্পনা করেছিলাম এবং সেও একমত হয়েছিলো যে, এটাকে এটাকে একটি সমন্বিত জৈব খামারে রূপান্তরিত করা হবে। কাজও এগোচ্ছিল। খামারটাকে আমার স্বপ্নের সমন্বিত জৈব খামারে রূপান্তরিত করতে করণীয়গুলো চিহ্নিত করেছিলাম। আমাদের তৎকালীন দাতা সংস্থা “ব্রেড ফর দ্য ওয়ার্ড”-এর প্রতিনিদিদের সাথে এই খামারের ওপর আমার পিএইচডি গবেষণার ব্যাপারে প্রাথমিক আলাপও শুরু করেছিলাম।
ভেবে দেখলাম, আমার পিএইডি গবেষণার গাইড হওয়ার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তিটি হচ্ছেন ড. আলতাফ হোসেন স্যার। সেই সূত্রে গেলাম বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু বিধিবাম! আমার যখন এমন চিন্তা মাথায় এলো, দূর্ভাগ্যজনকভাবে ততদিনে আলতাফ স্যার “খামারকুঞ্জ” প্রকল্প শেষ করে অবসরে চলে গেছেন। উনার অবসরে যাওয়ার হতাশাজনক সংবাদটা শুনে অত্যন্ত হতোদ্দম হয়ে পড়লাম। তবুও উনার সাথে দেখা করতে গেলাম উনার কেওয়াটখালির বাসায়। স্যার তখন আক্ষেপ করে বলেছিলেন, “আমি গবেষণায় প্রমাণ করে দেখিয়েছি যে, সমন্বিত খামার ব্যবস্থা মনোকালচার থেকে অনেক বেশি লাভজনক। কিন্তু সরকার এই গবেষণা থেকে শুধু সামান্য একটু অংশ নিয়ে ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্প নিয়েছে।” এই প্রকল্পের ফলাফল এখন সবারই জানা।
তবুও আশা ছাড়িনি। আমার পিএইচডি গবেষণার বিকল্প গাইড খুজতে থাকলাম। আমাদের শহীদ নাজমূল আহসান হলের বড় ভাই, বঙ্গবন্ধু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. তোফাজ্জল ইসলাম (শাহীন) ভাইয়ের সাথে কথা বললাম। কিন্তু শাহীন ভাই-এর গবেষণার ক্ষেত্র ছিলো আমার বিষয় থেকে অনেক ভিন্ন। তিনি তখন গমের ব্লাস্ট রোগ এবং বায়োটেকনোলজি নিয়ে গবেষণায় ভীষণ ব্যস্ত। তবুও উনাকে কিংবা বিকল্প কাউকে নিয়ে এগুতে মনস্থ করলাম। যেহেতু সমন্বিত খামারের অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা গবেষণার একটি প্রধান বিষয় হতো তাই কো-গাইড হিসেবে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক বড় ভাই কৃষি অর্থনীতি ও গ্রামীন সমাজবিজ্ঞান অনুষদের অধ্যাপক ড. জাহাঙ্গীর আলম (মুকুল) ভাই-এর সাথে কথা বললাম। উনি বললেন কেইস স্টাডি আকারেও পিএইডি গবেষণা হতে পারে। আমি শুনে অনেক আশান্বিত হলাম। কিন্তু আবারও বিধিবাম! বিনা মেঘে বজ্রাঘাতের মতো হঠাৎ জানতে পারলাম যে, মামুনের বড় ভাই যার জমিতে মানুষ খামারটা শুরু করেছিলো সেখান থেকে কোন এক অজ্ঞাত কারণে মামুনকে সরিয়ে দিয়ে উনি নিজে খামারের দ্বায়িত্ব নিয়ে নিয়েছে। যাহোক, সে এক লম্বা কাহিনি—অন্যত্র বলা যাবে।
বিকল্প ভাবতে থাকলাম। অনেক ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে, আমাদের গ্রামের বাড়ির বৃহৎ পরিবারের যে জমিজমা আছে, যাদের প্রায় সবাই অনুপস্থিত কৃষক, তাদের খণ্ড খণ্ড জমি একত্রিত করে সেখানেই একটি সমন্বিত খামার গড়ে তুলব। পরিবারের সবার সঙ্গে মিটিং হলো। সবাই একবাক্যে রাজিও হলো। আমিও পূর্ণোদ্যমে কাজে নেমে পড়লাম। কিন্তু আবারও বিনা মেঘে বজ্রপাতের মত মুনাফেকি করে বসলো এক চাচাতো ভাই। তার দলে আরও কয়েকজনকে ভিড়িয়ে শুরু করল গ্রাম্য রাজনীতি। চুক্তি সাক্ষরের দিন মত পাল্টে ফেললো। তবুও হাল না ছেড়ে আমার রক্তের সম্পর্কের মানুষদের নিয়েই প্ল্যান–বি নিয়ে এগুলাম। কিন্তু বিপর্যয় নিয়ে এলো করোনা মহামারি। আরও কিছু বাস্তবিক সমস্যা ছিল। খামার বন্ধ করে দিয়ে জীবিকার তাগিদে আবারও ফিরে যেতে হলো এনজিওর কাজে।
যাহোক, আবারও আস্তে আস্তে পুরোনো কাজে ফিরছি। পুরোনো মানুষদের সঙ্গে দেখা হচ্ছে, কথা হচ্ছে। লেখক-গবেষক আলতাফ পারভেজ ভাই ও নাগরিক উদ্যোগের কর্ণধার জাকির হোসেন ভাইয়ের অনুরোধে ২১ ‍ডিসেম্বর ২০২৪, কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে এক সেমিনারে এমন কিছু পুরোনো মানুষদের সঙ্গে দেখা হলো। সেমিনারের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনায় পুরোনো সেই কথাগুলোই নতুন করে আবার বলার চেষ্টা করেছি যে কথা খুব বেশি মানুষ শুনতে চায় না। সবাই চায় কড়কড়ে টাকা আর চকচকে উন্নয়ন। একই দিনে তুলা উন্নয়ন বোর্ড মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত একই ধরনের আরেকটি প্রোগ্রামে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানী ড. নাজিম উদ্দিন ভাই আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। বাংলাদেশে সম্ভবত তিনিই একমাত্র কৃষিবিজ্ঞানী যিনি জৈব কৃষি নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কাজ করছেন। উনার সাথে আমার বেশকিছু কাজের অভিজ্ঞতা হয়েছে। দুই প্রোগ্রাম একই দিনে হওয়ায় ওটাতেও একটু ডু মেরেছিলাম। ওখানেও অনেক পুরোনো মানুষের সঙ্গে দেখা হলো। কথায় কাজ কিছু হউক বা না হউক, কথাগুলো যে জারি আছে এতটুকুনই আশার কথা।
পাচই আগস্ট ২০২৪ তারিখে দেশে এক দারুণ আশাব্যঞ্জক অভ্যুত্থান ঘটে গেছে। দেশি-বিদেশি কর্পোরেট স্বার্থের শৃঙ্খল থেকে বেরিয়ে শ্রেফ দেশ ও জনগণের স্বার্থ সংরক্ষণের নতুন এক রাজনৈতিক বন্দোবস্ত গড়ে ওঠার প্রচুর সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। অবশ্য এর সঙ্গে ছায়ার মতো হাঁটছে হতাশাও। যেমন, আমার জন্য সবচেয়ে হতাশার ব্যাপার হচ্ছে—দেশের কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তা যে মারাত্মক হুমকির মুখে, তা নিয়ে ড. ইউনুস সরকারের কোনো মাথাব্যথা দেখা যাচ্ছে না। দেশের প্রায় অর্ধেক শ্রমশক্তি যে খাতে নিয়োজিত, সে খাতটি হাজারো সমস্যা ও সংকটে জর্জরিত। দেশের ১ কোটি ৬৯ লাখ ক্ষুদ্র কৃষক পরিবার, ৭২ লাখ ৮৭ হাজার ভূমিহীন পরিবার এবং ৯২ লাখ কৃষিশ্রমিক পরিবারের কথা এই সরকারের ভাবনায় আছে বলে মনে হয় না। কৃষকেরা গ্রামে থেকে গাধার মতো খেটে শহরে খাবার পাঠায়, আর শহুরে কর্তাগণ কতকিছু নিয়ে ভাবেন—কৃষকদের নিয়ে ভাবনার ফুরসত কই!
বাস্তবতা হলো গ্রামে থেকে আন্দোলন করা যায় না, করলেও তা পাত্তা না দিলেও চলে। তাই কৃষকেরা কখনও তাদের দাবীদাওয়া নিয়ে মাঠে নামেন না। তাছাড়া, কৃষকেরা কোনো সংগঠিত শক্তি নয়। বিচ্ছিন্ন কৃষক সংখ্যায় যতই বেশি হউক না কেন তারা শক্তিহীন, ক্ষমতাহীন। আর এটাতো সবার জানা, দুনিয়াটা শক্তের ভক্ত, নরমের যম।
ময়মনসিংহ ।। ২২/১২/২৪

টিকে আছি

টিকে আছি

ভালো-মন্দের আর্থসামাজিক মাত্রা ও পরিমিতি,
কিংবা লাভ-ক্ষতির আর্থনৈতিক হিসেব-নিকেশ
অদ্যাবধি ওভাবে বুঝে ওঠা হলো না আমার।

এগুলো বোঝার মতো অতটা সমঝদারও আমি কখনো নই।
চালাক, চতুর, বুদ্ধিমান—
শব্দগুলো আমার হয়ে ওঠেনি কখনো।
তবুও যে কিভাবে টিকে আছি এই জনপদে,
সেটাই এক বিপুল বিস্ময়।

অবশ্য ডারউইনবাদ মতে টিকে থাকার
যে যোগ্যতাটুকু অত্যাবশ্যকীয়,
সেটা ছাড়াও টিকে থাকা যায়।
অবশ্য তাকে টিকে থাকা বলা ঠিক হবে কি না,
তা নিয়ে আমার আছে বিস্তর বিভ্রান্তি।

গরু-ছাগল, এমন তাবৎ গৃহপালিত প্রাণিকুল,
তারাও তো দিব্যি টিকে থাকে, শুধু নয়—
কমলাপুরে নগ্নদেহে রাত কাটানো শিশুটির চেয়ে
সহস্রগুণ সুরম্য আবাসে তাদের বসবাস।
পুষ্টিকর ও দামি সব খাদ্য-ওষুধ খাইয়ে-দাইয়ে
এমনই নাদুসনুদুস করে তোলা হয়
একদিন জবাই হয়ে মানুষের খাদ্য হবে বলে।

অথচ সেই নিরীহ শকুন,
যে কিনা পেটের দায়ে বেঁচে থাকার,
কিংবা টিকে থাকার লড়াইয়ে
মৃত প্রাণীর দেহ ভক্ষণ করে থাকত বেঁচে,
তাকে টিকতে দেয়নি মানুষ।

টিকে থাকার লড়াইরত রয়েল বেঙ্গল টাইগার,
কিংবা মানুষখেকো চিতা-সিংহ,
যাদেরকে দর্শনীয় করে টিকিয়ে রাখতে
বিশ্বনেতারা বসে বিশ্ব বাঘ সম্মেলনে,
যত্ন করে গড়ে তোলে চিড়িয়াখানা,
কিংবা হালের সাফারি পার্ক।

যেমনিভাবে কলকারখানা চালু রাখতে
টিকিয়ে রাখতে হয় শ্রমজীবীদের,
কিংবা আহার যোগাতে টিকিয়ে রাখতে হয়
দাসরূপী কৃষকদের,
তেমনিভাবে টিকে থাকি আমি,
টিকে থাকি আমরা আমজনতা।

—————

ময়মনসিংহ ।। ২৩/৭/২২

আমার স্বপ্ন, আমার অঙ্গীকার

যেদিন দিকবিদিক আলোকিত করে
মায়ের কোলজুড়ে ‘অদিতি’ এলো,
কালরাত্রির ঠিক দু’দিন আগে
সেটা ছিল স্বাধীনতার মাস।
আগাম কালবৈশাখীর সে রাত্তিরে
হৃদয়জুড়ে মিশ্র অনুভূতি—
একদিকে আনন্দের উষ্ণ শিহরণ,
আরেকদিকে একরাশ শঙ্কা ও ভয়!

কারণ, ছাড়পত্র পাওয়া নবজাতকের কাছে
সুকান্তের করা দীপ্ত অঙ্গীকারখানি
তখনও যে বাতাসে হাহাকার হয়ে ফিরে।
দূষণ, শোষণ, নিপীড়ন, অনাচারে
ধরণীটা যে শুধু বাস-অযোগ্যই নয়,
লোলুপ মানবের নিরন্তর অত্যাচারে
বিপন্ন তার অস্তিত্বটাও।

নবজাতকের নাম দিলুম ‘অদিতি’,
যে ধরণীমাতা তার আপন মহিমায়
দূর করে দেবে জরাজীর্ণ যত অকল্যাণ।
আর আমি, অথর্ব এক জনক,
গেয়ে উঠি সুকান্তের হারানো সে গান—
“প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল,
এ বিশ্বকে শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি,
নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।”
তারপর কত স্বপ্ন, কত কাজ— নেই অবসর।

ঠিক চার বছর পর
যেদিন ‘অর্ক’ ভূমিষ্ঠ হলো,
সেটা ছিল মুক্তির লাল সূর্যোদয়ের মাস।
নবজাতকের তরে বাসযোগ্য বিশ্ব গড়ার
আমাদের প্রাণান্ত সংগ্রামের বিজয়কেতন
তখনও যে সুদূর পরাহত।
তাই নতুন করে অব্যক্ত মনে
পুরোনো অঙ্গীকার আউড়েছিলাম আরবার।

তারপর একে একে মাস গেল,
বছর গেল, কেটে গেল দশক,
পাল্টে গেল অনেক কিছুই।
তবু অদ্ভুত আধারে ঝাপসা চোখে
ভেসে ওঠে নিরুত্তর প্রশ্নমালা—
কতটুকু বাসযোগ্য হলো ধরণীতল
নবজাতক মানবশিশুর তরে?
দূষণ, শোষণ, নিপীড়ন, অনাচার
কতটুকু কমতি হলো?
নাকি বাড়ল আরও?
যতটুকু নির্ভয় নিরাপত্তা ছিল
আমাদের গ্রাম্য বাল্যবেলায়,
ততটুকুও কি আছে অবশেষ
নবজাতকের তরে এই পাষাণনগরে?

আজ বুঝতে পারি এই অবেলায় এসে—
এই লড়াইয়ের নেই অবসান।
অন্তবিহীন এক লড়াইয়ের নামই জীবন।
যেদিন ধরাভূমে মনুষ্যপ্রজাতির আবির্ভাব,
সেদিন থেকেই যে লড়াইয়ের অশুভ সূচনা।
মানুষের এ লড়াই বিরূপ প্রকৃতির সাথে,
রোগ-শোক-জরা-ব্যাধি-মৃত্যুর সাথে,
ভয়ংকর হিংস্র জন্তু-জানোয়ারের সাথে,
আর সবচেয়ে ভয়ংকর, সবচেয়ে হিংস্র
মনুষ্যপ্রজাতির সাথে।
এই লড়াইয়ের সমাপ্তি সহসা হবার নয়,
কিংবা হয়তো কোনো কালেই হবার নয়।

আদতে সব প্রাণীই লড়ে যায় অবিরাম—
এই ধরার বুকে টিকে থাকার লড়াই।
শেষতক কেবল যোগ্যতমই টিকে থাকে,
ডারউইনের বিবর্তনবাদ মেনে।
যদিও বড্ড আপেক্ষিক এই টিকে থাকা,
চিরস্থায়ী নয় তো মোটেও।
কিন্তু কী সে যোগ্যতা?
আকার-আকৃতি, দেহবল? তা তো নয়।
তাহলে বিশালাকার ডাইনোসর বিলুপ্ত হতো না,
বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচাতে
বিশ্ব বাঘ সম্মেলনও ডাকতে হতো না।

তবে কি জ্ঞান, প্রযুক্তি, কৌশল-প্রকৌশল—
এসবই টিকে থাকার মূলমন্ত্র?
কিন্তু অজ্ঞানতা যখন জ্ঞানের বিপক্ষে জয়ী হয়,
কৌশল পরাভূত হয় অপকৌশলের কাছে,
তখন সভ্যতা মুখ থুবড়ে পড়ে থাকে—
যেমন মুখ থুবড়ে পড়ে বারবার
আমার স্বপ্ন, আমার অঙ্গীকার।

ময়মনসিংহ ।। ০৩.১২.২০১৯
(অর্ক’র জন্মদিনে)

আর কত ঝরিবে রক্ত

আর কত ঝরিবে রক্ত, ঝরিবে কত নতুন প্রাণ,
জুলুম, শোষণ, নির্যাতনের কবে হবে অবসান।
দুর্ভাগা এ জাতিটার অনল-পোড়া ভালে,
সুখের ভাগ্য হয়নি লেখা হয়নি কোনকালে।
জুলুম, শোষণ, নির্যাতনই মোদের চিরসাথী,
দীর্ঘ যুগের প্রতীক্ষাতেও কাটেনি আধার রাতি।
কত লড়াই, কত সংগ্রাম, কত নব অভ্যূত্থান,
ঝরেছে কত রুধির ধারা লয়েছে কত নবীন প্রাণ।
কত স্বপ্ন, কত আশা, চির মুক্তির কত বাসনা,
ঝঞ্জাবিক্ষুব্ধ সিন্ধু পেরুতে কত নিরন্তর সাধনা।
বৃথাই সব, সব নিষ্ফল, কেবলি শনির প্রভাব,
নতুন রূপে ঘটেছে কেবল নব্য শোষকের আবির্ভাব।
উষার দুয়ারে মুক্তি-অরুণ দেখিয়াছি যতবার,
নিরাশার কালোমেঘে তা ঢাকিয়াছে বারেবার।
দেখেছি কত মুক্তিকেতন ঐ আকাশে উড়িতে,
স্বল্পকালের ব্যবধানেই তা লুটিয়াছে ধুলিতে।
—————————
ময়মনসিংহ। তারিখ: ২৫/০৮/১৯৯০

স্বপ্ন-ব্যারাম

স্বপ্ন-ব্যারাম

আমার আছে স্বপ্ন দেখার ব্যারাম।
এই ব্যারামটা যখন মস্তিষ্কে জেঁকে বসে,
তখন দেহের সব ব্যারাম উবে গিয়ে
আমি পাই পথচলার অমিত বল।

আর তখনই চারপাশের অতিসুস্থ
বাস্তবমুখী মানুষগুলো তুলে আহাজারি—
বলে, পাগল আমি, সবই পাগলামি।
পথ রুদ্ধ করে দাঁড়ায় সকলে,
যার যার দিকে করে টানাটানি;
আর তখন অসহায়, বিভ্রান্ত আমি
থেমে যাই, মুখ থুবড়ে পড়ি।

তখনই শরীর নামের মহাশয়ের
উপর দিয়ে চলা সব অত্যাচার
ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় ফুটে ওঠে একে একে।
আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি, থমকে দাঁড়াই,
থেমে যায় পথচলা।

তখন গুরুঠাকুরের “একলা চলো রে” আহ্বান
অদ্ভুত আঁধার-ঘেরা মৃত্যু-উপত্যকায়
আমার বেঁচে থাকার একমাত্র প্রেরণা হয়ে
আমার চলার শক্তি জোগায়।
আর তখনই গুরুর উপদেশ মাথায় নিয়ে,
জ্বালিয়ে নিই বুকের পাঁজর,
আমি জ্বলি একেলা, প্রাণপণ।
——————
ঝিনাইদহ ।।