বিপজ্জনকভাবে বাঁচো: নিৎশের দর্শন থেকে

বিপজ্জনকভাবে বাঁচো: নিৎশের দর্শন থেকে

এই ধরাভূমে তোমার আগমন ও প্রস্থান,
আর জীবনব্যাপী তোমার বেঁচে থাকা—
যদি তাকে অর্থবহ করে তুলতে চাও,
যদি চাও এই পৃথিবীর বুকে
তোমার অস্তিত্বের সর্বাধিক ফলপ্রসূতা,
তবে আরামদায়ক নিরাপদ কোঠরি থেকে
বেরিয়ে এসে বিপজ্জনকভাবে বাঁচো।

জলন্ত ভিসুভিয়াসের ঢালে গড়ো তোমার আবাস,
সফেন সমুদ্রে ভাসাও তোমার ছোট্ট তরীখানি,
দুর্গম, অজানা গন্তব্যপানে ছুটে চলো নিরন্তর।
তবেই পাবে রোমাঞ্চকর জীবনের স্বাদ,
তবেই পাবে অর্থবহ জীবনের আস্বাদ।

মনের গহীনে জেগে ওঠা সত্যকে আলিঙ্গনে
প্রয়োজনে লড়ে যাও নিজের সাথে নিজে,
আর লড়াই করো স্বগোত্র, বন্ধু, প্রিয়জনের সাথেও।

যদি নাও হতে পারো বিজয়ী কিংবা শাসক,
ডাকাত-লুণ্ঠক হয়ে লুটে নাও জ্ঞানীদের জ্ঞান।
সন্ত্রস্ত হরিণীর মতো লুকিয়ে থেকো না
গহীন অরণ্যের কোণে;
বেরিয়ে পড়ো জ্ঞানের সন্ধানে।

কারণ দিনশেষে জ্ঞানই শাসক হওয়ার মূলমন্ত্র—
যদিও তা আজও সত্য নয় এদেশের জন্য।

এলেবেলে ভাবনা

এলেবেলে ভাবনা

খাদ্য নিরাপত্তা, খাদ্য অধিকার আইন
এসব নিয়ে ভাবার সময় কই ভাবুক মহলের!
কোটি আমজনতার বুভুক্ষু ঢাউস উদর ভরিয়ে
মস্তিষ্ক শীতল রাখার উপায় খুঁজতেই উনারা গলদঘর্ম,
যাতে বিক্ষোভে না উল্টে যায় ক্ষমতার গদি।

তার জন্য চাই ভরপেট হাইব্রিড চালের মোটা ভাত,
সঙ্গে টুকরো খানেক পাঙাশ, তেলাপিয়া, পোল্ট্রি,
অথবা আলুভর্তা, ডাল, আর সামান্য শাকসবজি—ব্যস।
এজন্য সব বিদেশি না হলে যে চলে না কিছুতেই।
কারণ দেশি মানুষের ফলন বেশি হলেও
দেশি ধান, শাকসবজি, ফলমূল, তেল, ডাল,
গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগি, মাছ, গাছ—
কোনো কিছুরই ফলন নাকি বেশি নয়।

স্বাদ? পুষ্টিমান? কিংবা মাটি, পানি, পরিবেশ?
ওসব গোল্লায় যাক, তাতে কীই বা আসে যায়!

রাসায়নিক সার, বালাইনাশক বিষ—
এসবে সমস্যা?
আরে ভাই, জন্মালে মরিতেই হবে একদিন,
সুতরাং খেয়ে মরাই ভালো—নয় কি?
বীজ আর খাদ্যের রাজনীতির কথা ভাবছেন?
ভাবছেন, একদিন খাদ্যই হয়ে উঠতে পারে যুদ্ধাস্ত্র?
আরে দূর, এসব আতেল ভাবনা ছাড়েন।

কি বলছেন? যদি কোনোদিন
বিদেশি বীজ আসাই বন্ধ হয়ে যায়, তখন কী হবে?
আরে ভাই, তখনকার কথা তখন ভাবা যাবে।
আগে তো উদর পূর্তি হোক।
নবাগত, আনাগত প্রজন্মের কথা ভাবছেন?
কিংবা জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতের কথা?

দূর! আপনি কি জানেন চাল উৎপাদনে
বিশ্বে আমাদের অবস্থান কততম?
আম, কাঁঠাল আর মাছ উৎপাদনে?
এসব কার অবদান?
সেসব নিয়েই ভাবুন, মশাই।
——————
ময়মনসিংহ।। ২৩/১০/২৫

দুই বিশ্ব

দুই বিশ্ব

স্পষ্ট দু’খানা বিশ্ব দেখি বিরাজে জগৎ জুড়ে,
বাহিরেতে তার বহির্বিশ্ব, অন্তর্বিশ্ব অন্তরে।
তৃতীয় বিশ্ব অন্তর্বিশ্বে রয়েছে অন্ধকারে,
বহির্বিশ্বে ধনী বিশ্ব তার চারদিক ঘিরে।

জ্ঞানে-বিজ্ঞানে বহির্বিশ্ব জগতে সর্বসেরা,
বিত্ত-বিভব, অস্ত্র, বাহুবল তাতেও শীর্ষে তারা।
বহির্বিশ্ব চারদিক হতে শোষণ-জাল বিস্তারিয়া,
দারিদ্র্যক্লিষ্ট অন্তর্বিশ্বেরে সদা রাখে ঘিরিয়া।

রেখেছে পাতিয়া অন্তর্বিশ্বে ষড়যন্ত্রের বেড়াজাল,
চোখের অলক্ষ্যে জোঁকসম তারে শোষিছে চিরকাল।
সেই জালে পড়ি কাঁদে অন্তর্বিশ্ব ঊর্ধ্বপানে চাহি,
দুর্ভেদ্য সেই জাল ভেদিয়া বেরুবার পথ নাহি।

বহির্বিশ্ব রাজাধিরাজ যেন অন্তর্বিশ্ব প্রজা,
শাসন করিছে দু’পায়ে দলে স্বাধীনতার ধ্বজা।
অন্তর্বিশ্বের মসনদখানি সে যে নড়বড়ে অতি,
বহির্বিশ্বের ইঙ্গিতে তার বদলে তখত-পতি।

অন্তর্বিশ্বের রাজনীতি সে তো বহির্বিশ্বের ঘুড়ি,
ইচ্ছেমতো খেলায় তারে দু’হাতে লাটাই ধরি।
অন্তর্বিশ্বের তখত-পতি যবে মসনদ-পরে বসে,
বহির্বিশ্বের অঙ্গুলি হেলনে মুহূর্তে পড়ে ধসে।

শুধু তখত নয় প্রিয় প্রাণটাও হারায় সেইসাথে,
রাজা হবার সাধ যে তাহার হারায় অবেলাতে।
দাতা সাজিয়া বহির্বিশ্ব অন্তর্বিশ্বে ঢুকে,
নির্মম হাতে ছুরিকা চালায় অর্থনীতির বুকে।

বহির্বিশ্ব অন্তর্বিশ্বে রেখেছে সদা জারি,
চোরাকারবার, অস্ত্রপাচার, সন্ত্রাস মারামারি।
জানি না কবে এই অত্যাচারের চির অবসান হবে,
এই জাল ছিঁড়ে সত্যিকারে মুক্তি মিলবে কবে।

আলু-পেঁয়াজ-চাষীর ঈদ

আলু-পেঁয়াজ-চাষীর ঈদ

দিকে দিকে শুনি ঈদের সাজ সাজ রব,
বাজারে, শপিং মলে মানুষের উপচে-পড়া ভিড়।
প্রিয় জিনিসটি কিনবে বলে ছুটছে সবাই ঊর্ধ্বশ্বাসে,
আড়ং-এর আড়ংবাজি নিয়ে তোলপাড় নেটদুনিয়া।

পত্রিকার পাতাজুড়ে শুধুই ঈদের খবর,
নাড়ির টানে জীবন হাতে ঘরমুখো মানুষের মিছিল।
ভবনে ভবনে আলোসজ্জা, চারদিকে পটকার শব্দ—
আজ ঈদ, বাংলার ঘরে ঘরে উৎসবের আমেজ।

কিন্তু কেমন কাটল লাখো আলুচাষীর ঈদ
কিংবা সেইসব হতভাগ্য পেঁয়াজচাষীর?
যাদের পরিবার বুকভরা আশা নিয়ে ভেবেছিল—
আলু বেচে, পেঁয়াজ বেচে এবার হবে নতুন শাড়ি, লুঙ্গি, জামা;
ঘি-ভাত না হোক, অন্তত জুটবে সেমাই-চিনি,
আর হাঁড়িতে উঠবে একটুখানি মাংসের ঝোল।

কেমন হলো আজ তাদের ঈদ?
জুটল কি নতুন জামা, একটু ভালো খাবার?
চাষীর ঘরের ছোট্ট শিশুটির মনে
জেগেছে কি ঈদের খুশির হিল্লোল?
সে কি নতুন সাজে, চকচকে চোখে,
হেসে-খেলে দল বেধে গিয়েছে ঈদগাহে?

আমি নিশ্চিত জানি—
‘সবই কপালের লিখন’ মনে মনে বলে
কাকভোরে উঠে গোয়ালঘর ঝাড় দিয়েছে সে।
পাশের খালের নোংরা হাঁটুজলে সেরে নিয়েছে স্নান,
নুন-লংকা দিয়ে পান্তাভাত মুখে তুলে
পুরোনো লুঙ্গি, আধছেঁড়া জামা
যা ছিল ঘরে, তাই গায়ে এঁটে
ছুটে গেছে ঈদগাহে—
সৃষ্টিকর্তার শুকরিয়া আদায় করতে।

এটাও নিশ্চিত জানি, সেই চাষীবউ
কাকভোরে উঠে ঘরদোর দিয়েছে ঝাড়,
গরু-ছাগল-কুঁকড়োগুলোকে খাইয়ে
বসে গেছে উনুনের ধারে।
হয়তো হাঁড়িতে নেই তেমন কিছুই,
তবু সন্তানের মুখের দিকে চেয়ে
চোখের জল গোপন করে জ্বালিয়েছে আগুন।
হয়তো একমুঠো চাল, একটু ডাল,
অথবা শাকপাতা দিয়ে
ঈদের দিনের রান্না সাজিয়েছে কোনোমতে।

হয়তো সেই চাষী ঈদগাহ থেকে ফিরে
চুপচাপ উঠোনের এক কোণে বসে
আবার কষেছে বেচে থাকার হিসেব-নিকেষ
আবার বুনেছে নতুন কোন ফসলের স্বপ্ন
হয়তো সন্তানের মাথায় হাত রেখে বলেছে –
“মন খারাপ করিস না, বাপ,
আগামী বছর আল্লাহ নিশ্চয় ভালো করবেন।”

এই আশাতেই বেঁচে থাকে চাষী,
এই আশাতেই কেটে যায় তার ঈদ,
এই আশাতেই বাংলার মাটি আজও
শস্যে শস্যে ভরে ওঠে।

তবু প্রশ্ন থেকে যায়—
যে মানুষটা সবার মুখে অন্ন তুলে দেয়,
তার ঘরেই কেন উৎসবের দিনে
এত অভাব, এত হাহাকার?
যে চাষীর ঘামে বাঁচে দেশ,
তার ঈদ কেন আজও
শুকনো পান্তা, আধছেঁড়া জামা
আর নীরব কান্নার ঈদ হয়ে থাকে?

ক্ষমতা ও দখলের রাজনীতি

ক্ষমতা ও দখলের রাজনীতি

ক্ষমতা আর দখলের মধ্যে… দারুণ সখ্যতা
যেমন মানিকজোড় সখ্যতা দেখি
উঠতি কিশোরী সখীদের মাঝে।

একবার ক্ষমতার দখল পেলেই—
সবকিছু দখল করা যায়… অবলীলায়!
দখলে আসে খাস জমি, জলাশয়
নামমাত্র মূল্যে মিলে রাজউকের লোভনীয় প্লট…
যেগুলো পাওয়ার কথা ছিলো বঞ্চিত যারা
যারাই এগুলোর সত্যিকার মালিক।

একবার ক্ষমতার দখল পেলেই—
দখল করা যায় নদী-নালা-খাল-বিল-পুকুর,
খেলার মাঠ, রাস্তাঘাট, রেলের জমি, শ্মশান ঘাট।
বাজার-হাট, টার্মিনাল, অটো-ট্যাম্পু-স্ট্যান্ড,
কিংবা ভোলাগঞ্জের সাদা পাথর।

একবার ক্ষমতা দখল করা গেলেই—
দখল করা যায় রাষ্ট্রের সবকিছু!
ইউনিয়ন কাউন্সিল থেকে সচিবালয়,
বঙ্গভবন, গণভবন, নিম্ন বা উচ্চ আদালত!
সুপ্রিম কোর্ট থেকে দুদক, পিএসসি,
এটর্নি অফিস থেকে অডিট অফিস—সব!!!

একবার ক্ষমতা দখল করা গেলেই—
দখল করা যায় ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে
ব্যাংক-বীমাসহ সকল আর্থিক প্রতিষ্ঠান।
এবং দেশের ছোটবড় সব টেন্ডার, ইজারা।
মাটি, আকাশ, বাতাস, সাগর, পাহাড়…
এমনকি আমজনতার মগজ অবধি!

এমন লোভনীয় যে দখলের রাজনীতি—
কে না চায়… এই ক্ষমতার তেলেসমাতি!
————————

ময়মনসিংহ ।। ১৬.৮.২৫

জীবনের দুর্গম পথে

জীবনের দুর্গম পথে

এই জগত সংসারে
মানবের তরে রয়েছে দু’টি পথ
একটা সত্যের আরেকটা অসত্যের।
হয়তোবা তাও নয় কারণ,
আদতে সত্যটা বড্ড আপেক্ষিক
নির্জলা সত্য খুঁজে মেলা ভার।

এ যেন বহুলকথিত পুলসিরাত!
তুমি কী যুধিষ্ঠির হতে চাও
সেতো কল্পকথার সৃষ্টি
অথচ বাস্তবে তা হতে গেলে
অনুক্ষণ মৃত্যুভয় বুকে নিয়ে
তীক্ষ্ণধার ছুরির উপর পথচলা!

তলদেশে গভীর গহীন অন্ধকার
পদে পদে রক্তাক্ত পদযুগল
মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে
কখনো যদি এগুবে এতটুকু
থেমে যাবে, পড়ে যাবে মুখ থুবরে
ভারসাম্য ধরে রেখে
বড্ড কঠিন এই পথচলা।

জীবন এমনি কন্টক শয্যাময়
পদে পদে বিপদ, শংকা আর ভয়।
তাই, বাঁচিতে চাহিনা এই কুৎসিত ভুবনে
সকলের আগে আমি মরিবারে চাই
এই কন্টক বনে এই নরকভূমে
একদন্ড আর বাচার সাধ নাই।
—————————–
ময়মনসিংহ ।। ২৫.১২.২০১৯