ভয়ের রাজ্যে

ভয়ের রাজ্যে

এক ভয়ের রাজ্যে আমাদের অভিশপ্ত জনম
জন্ম থেকে মুত্যু অবধি
ভয়ের সংস্কৃতির দূর্ভেদ্য জালে ঘেরা
এই সমাজ ও রাষ্ট্রে
রেশমগুটির ভিতর সুপ্ত গুটিপোকার মত
বেচে থাকাই আমাদের জীবন।

ভয়ের সাথেই আমাদের নিত্য বসবাস
“চিত্ত যেথা ভয়শুন্য উচ্চ যেথা শির”
বিশ্বকবির এই অবিনাশী বাণী
শতবর্ষ পেরিয়ে গেলেও
এই পোড়াদেশে তা সত্য নয়।

অবোধ শিশুর দূরন্ত শৈশবের
সহজাত দূরন্তপনা নিয়ন্ত্রণে
আমরা অজান্তে ঢুকিয়ে দেই
অযথা অমূলক সব ভয়
জীন-ভুত-পুলিশ-ডাকাত-ছেলেধরা
কিংবা অবোধ-হিংস্র সর্প,
ব্যঘ্র, ভল্লুক, সিংহ কত কী!
স্রষ্টাকে ভয়, রাজাকে ভয়, শিক্ষাগুরুকে ভয়
এমনকি জনক, জননী, অগ্রজ
যাদের হৃদয়ে বহে প্রেম, প্রীতি,
ভালোবাসা, আদর, স্নেহের ফল্গুধারা
অযথা চাপানো ভয়
তাদেরকেও করে তুলে ভয়ংকর।

পাড়ার পাতি মাস্তান থেকে লুটেরা শাসক
চোর, ডাকাত, ছিনতাইকারী, খুনি, শীর্ষ সন্ত্রাসী
ইত্যকার সত্যিকারের ভয়ংকর যারা
ভয় দেখানোই যাদের মোক্ষম অস্ত্র
ভয় দেখিয়েই হাসিল করে কামিয়াবি
রাষ্ট্র ও সমাজের মাথার পরে
জগদ্দল পাথরের মত চেপে বসে

নির্মাণ করে চলে ভয়ের সংস্কৃতি
ভয়ের রাজ্যে তারাই সবচেয়ে ভয়ংকর।
————-
ময়মনসিংহ ।। ২৩/০৮/২০২৩

ব্যবস্থা বদলের স্বপ্ন

ব্যবস্থা বদলের স্বপ্ন

আজব এক ব্যবস্থা চলছে এই দেশে
যুগের পর যুগ জগদ্দল পাথরের বেশে।
ধান্দাবাজি আর লুটপাটে লিপ্ত থেকে সবাই
মুখে মুখে কথামালায় দেশটা বদলাতে চাই।
মিথ্যে বয়ানে ভুলে বঞ্চিত জনতা নামে পথে
রক্ত ঝরায় জীবন বিলায় ফিরে ব্যর্থ মনোরথে।
দেশের এ চিত্রটা সহজেই পাল্টে দেওয়া যায়
শুধু যদি সিস্টেমটাকে একটু বদলানো যায়।

কিন্তু এক আজব জাতি মোরা এই বাঙাল
পশ্চাতে সব খুইয়েও নগদ লাভের কাঙাল ।
সব সমস্যার মূলে আদতে আমরাই
তবু সারাক্ষণ দু’হাতে কপাল চাপরাই
চোখের সামনে অবিরত মারা খাই
তবুও যেন কারও সম্ভিতটুকুও নাই।

সমাধানের পথে মোরা হাটতে নারাজ
যে যার বুঝ নিয়ে চলছে বকোয়াজ
যদি বলি চলো এক হয়ে বদলে দেই নিয়তি
শুধু ধান্ধা খুজে কেউ তাতে দেয়না সম্মতি।
চারিদিকে সবার মাঝেই চলছে নাভিশ্বাস
মিথ্যে আর ভণ্ডামিতে ভরা শুধুই অবিশ্বাস
বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর
বিশ্বাসের পুঁজিই পারে এসব জঞ্জাল দূর।

ময়মনসিংহ ।। ২৫.১১.২০০০

দিনবদল কত দূরে

দিনবদল কত দূরে

ব্যবস্থা একখান বানাইছেন বেশ
আপনারা যারা চালান দেশ
আর আপনাদেরই দোসর, সহচর
যত দেশি-বিদেশি কোম্পানি
এবং মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবসায়ি
সবাই মিলে ছলে বলে কৌশলে
খাসা, বলিহারি, আহা মরি!

ভালইতো মন্ত্র একখান শিখাইছেন
কৃষকেরে নিয়ে যন্তর-মন্তর ঘরে
“পেট ভরে নাও খাই, ফলন বাড়ানো চাই”
কৃষাণ-জেলে মরবে খেটে কাদাজল ঘেটে
রোদ-বৃষ্টি-ঝরে রক্ত পানি করে
ফলাইবে ফসল, ধরবে মৎস্য
নিরন্তর লড়াই করে
অনন্ত সমস্যা আর বৈরি প্রকৃতির সাথে
আর সেই ফসলে পকেট হবে ভারি
কর্পোরেশন আর মধ্যস্বত্বভোগির।
তাদেরই হবে টাকা কড়ি
বাড়ি গাড়ি আর সুরা নারী
মত্ত রবে দিবানিশি বিলাস জলসায়
যেথা পৌছে যায় অবলীলায়
কাটারিভোগ বা কালিজিরা
সেই চাল যা স্বাদে গন্ধে সেরা
রুই, কাতল, পাবদা, চিতল
নামেতেই জিভে আসে জল
আছে যত মুখরোচক খাদ্য খাবার
দেশের প্রান্ত হতে প্রান্তান্তর ছেকে
পৌছে যায় আপনাদেরই খাবার টেবিলে
যার কিছুটা যায় পেটে বাকিটা ডাস্টবিনে।

আর যারা এসব ধরেন বা ফলান
সেসব কৃষক আর জেলের সন্তান
পায়না খেতে দুবেলা, নিয়ে ক্ষুধার জ্বালা
কাটে বিনিদ্র রাত জুটেনা ডালভাত
ভোগে পুষ্টিহীনতায়, মরে অবেলায়।
চলবে আর কতকাল ধরে।

আজব এই ব্যবস্থাখানি
শুধুই ফাঁকা বুলি আর মিথ্যে প্রতিশ্রুতি শুনি
শুনি মুক্তির অসার বাণী
বায়ান্ন, উনসত্তর, একাত্তর, নব্বই
দশকের পর দশক চলে যায়
তৃষিত মন শুধুই প্রশ্ন করে যায়
দিনবদল আর কত দূরে ???

ঝিনাইদহ ।।

মানবজীবন

মানবজীবন

নরকতুল্য এই দুনিয়ায় বাঁচতে চাই না বলে
অবলীলায় নিজেকে হনন করে চলি প্রতিদিন—
অযত্নে, অবহেলায়, আলসেমিতে।
ক্রমাগত ধেয়ে চলি মহাজীবনের পানে,
কারণ, কী হবে বেঁচে থেকে পশুদের মতো?

কতটা জরুরি ছিল আমার এই মানবজনম,
কিংবা এই জগতের লক্ষকোটি জীব?
কেন যে জনম লয়, আবার মরণ হয়,
মাঝখানে কত না লড়াই-সংগ্রাম জীবনভর!

এই লড়াইয়ে নিরন্তর যন্ত্রণা আছে,
আঘাত আছে, প্রত্যাঘাত আছে;
আঘাতে আঘাতে জর্জরিত হয়ে
ব্যথা-বেদনায় কুঁকড়ে যাওয়া আছে,
আর আছে অনুক্ষণ মৃত্যুর হাতছানি।

এত কিছুর মাঝেও বেঁচে থাকার আনন্দ আছে—
হঠাৎ আলোর ঝলকানির মতো।
ক্ষণস্থায়ী লড়াই জেতার আনন্দ-সুখ আছে,
সেই সুখের মায়ায়, স্বজনের ভালোবাসায়,
বেঁচে থাকার প্রাণপণ চেষ্টাও আছে—
এই তো মায়াময় মানবজীবন।

ময়মনসিংহ ।।

মানুষ হওয়া কারে বলে

মানুষ হওয়া কারে বলে

আমার তো আছেই উলম্ব দেহের গড়ন,
চলি দুই পায়ে, আছে দুটি হাত,
খাই না তো লতা-গুল্ম-ঘাস,
আছে হাসি-ক্রন্দন, আছে প্রেমময় মন,
আছে বুকভরা আশা, দু’চোখে স্বপন,
আমি বাঁধি ঘর, লয়ে আপনজন।

জ্ঞান-গরিমা, বুদ্ধিতে আমিই জীবশ্রেষ্ঠ।
একদা অসহায় এই আমারই দর্পে আজ
বিশাল ডাইনোসর থেকে সর্প-বিষধর,
সিংহ, ব্যাঘ্র—যত হিংস্র চতুষ্পদ,
দিনে দিনে হচ্ছে বিলীন, অন্তরীণ।
গোটা জীবজগৎ, ভূ-মণ্ডল আজ
লুটায় আমারই যুগল পদতলে।

এ ধরাভূমে আমিই শ্রেষ্ঠ, আমিই সত্য,
সর্বত্র আমারই একচ্ছত্র আধিপত্য।
জগতের যা কিছু সম্পদ—স্থাবর, অস্থাবর,
সব আমারই ভোগ্য, আমারই সব।
মানুষ হয়েছি আমি, গড়েছি নাকি সভ্যতাও।

তবুও তোমরা যে বলো মানুষ হতে—
মানুষ হওয়া কারে বলে, কোন পথে?
—————–
ঝিনাইদহ ।।

বড় নির্মম এই বেঁচে থাকা

বড় নির্মম এই বেঁচে থাকা

বড় নির্মম এই বেঁচে থাকা

মনুষ্যরূপ ধরে চতুষ্পদ জন্তুর মতো,
জীবনভর কাড়াকাড়িতে উদরপূর্তি,
যৌন তাড়নায় বংশবিস্তার,
অতঃপর একদিন সবকিছু পেছনে ফেলে
নিভৃতে নীরব প্রস্থান—
এই তো ক্ষণিকের জীবন।

বড় অসহ্য এ বেঁচে থাকা।

নিজের স্বার্থে গড়া পরাবাস্তবতার ভাগাড়ে
মনুষ্যের পরমধন বিবেকটাকে
আস্তাকুঁড়ে ছুড়ে ফেলে একাকার হয়ে যাও
বিবেকহীন হিংস্র পশুর কাতারে।

আর যদি তা না পারো,
মানুষ হওয়ার ইচ্ছেটা যদি হয় বড়,
তবে অবধারিতভাবেই আসবে নেমে
নির্মম গঞ্জনা, যন্ত্রণা সারা জীবনভর—
বড্ড নির্মম এভাবে বেঁচে থাকা।

ঝিনাইদহ ।।