সমন্বিত কৃষি ও আমার কথা

সমন্বিত কৃষি ও আমার কথা

আমাদের খাদ্য ব্যবস্থার ভয়াবহ পরিণতির কথা আমি গত প্রায় দুই দশক ধরে বলে আসছি বিভিন্ন সেমিনারে, আলোচনায় এবং লেখায়। বলে আসছি যে, আমাদের বর্তমান খাদ্য ব্যবস্থা যেভাবে মানুষ এবং মাটির জন্য বিষাক্ত ও অস্বাস্থ্যকর হচ্ছে এবং যেভাবে প্রকৃতি, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও প্রতিবেশ ধ্বংসপ্রাপ্ত হচ্ছে তা যদি বদলানো না যায় তবে দীর্ঘমেয়াদে আমাদের অস্তিস্তও বিপন্ন হয়ে পড়বে। কিন্তু গরিবের কথা কেউ শোনে না। সবাই শুধু বলে, “জমি কমছে, মানুষ বাড়ছে। কাজেই ফলনের উলম্ব বৃদ্ধি ছাড়া গত্যন্তর নেই।”
এরূপ বক্তব্যের উত্তরে আমি বলি, ফলন বাড়ানোর চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে আমাদের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করা। কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই কেউ এ কথায় কান দিতে চায় না। কারণটাও স্পষ্ট। রমজানের রোজা যে জাতির খাদ্যাসক্তি কমাতে পারে না, বরং বাড়িয়ে দেয়, সে জাতি খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের কথা শুনবে কেন। আরও একটা কারণ আছে, সেটা হচ্ছে, মানুষের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন সহজ কোন ব্যাপার নয়। এজন্য কমপক্ষে এক জেনারেশন সময় লাগবে। অর্থাৎ আজকে শুরু করলে এবং একটা প্রজন্মকে সঠিক ও স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যাভ্যাসে অভ্যস্থ করতে পারলে তবেই কেবল প্রজন্মান্তরে চূড়ান্ত সুফল আসতে পারে। সুতরাং এতো দীর্ঘ সমাধান কে মানতে চাইবে। কিন্তু যার পরিণতি কেবল ধ্বংস তা সম্যক উপলব্ধিতে নিলে সবাই মানতে বাধ্য হতো যে, এছাড়া বিকল্প কোন পথ খোলা নেই।
আরও বলতাম, আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী “সমন্বিত কৃষি ব্যবস্থা” ফিরিয়ে আনার কথা। কিন্তু দেশের প্রায় সকল নীতিনির্ধারক ও কৃষি-বিশেষজ্ঞমহল সর্বশক্তি নিয়োগ করে আসছেন আমাদের নিজস্ব সমন্বিত কৃষি ব্যবস্থার যেটুকু অবশিষ্ট আছে তার সবটুকু ধ্বংস করে দিয়ে বিদেশি মনোকালচারনির্ভর “হাই ইনপুট, হাই আউটপুট” ধারণার কৃষি প্রবর্তনে। কারণ ওই একটাই। খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে হবে। এজন্য লক্ষ লক্ষ টন রাসায়নিক সার, হাজার হাজার টন কীটনাশক বিষের সাথে নতুন করে যুক্ত আগাছানাশক, গ্রোথ প্রমোটার হরমোন ইত্যাদি ঢালা হচ্ছে আমাদের মাটি ও পরিবেশে। ফলাফল যা হওয়ার তাই হচ্ছে। আমরা যাদের প্রযুক্তির ডাম্পিং ভাগাড়ে পরিণত হয়েছি, তারা কিন্তু দ্রুতগতিতে জৈব কৃষির দিকে ছুটছে। জৈব কৃষি প্রবর্তনে তারা অধিক হারে ভর্তুকি ও রাষ্ট্রীয় প্রণোদনা দিচ্ছে।
অথচ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. আলতাফ হোসেন স্যার সুদীর্ঘ ২৫ বছর ধরে গবেষণা করে দেখিয়েছেন, “সমন্বিত কৃষি ব্যবস্থা” কীভাবে দেশের কৃষিকে আরও বেশি উৎপাদনশীল ও স্থায়িত্বশীল করতে পারে। কিন্তু তাঁর এই সুদীর্ঘ গবেষণার ফলাফলকে কাজে লাগানো তো দূরের কথা, বাকৃবির কৃষিতত্ত্ব বিভাগে কাউকে খুঁজে পাইনি, যিনি এই গবেষণাকর্মকে ধারণ করে এগিয়ে নিচ্ছেন। অবশ্য এটা এমন এক জটিল এবং প্রায়োগিক গবেষণা, যা আলতাফ স্যার পেরেছিলেন “খামারকুঞ্জ” নামের এক বিশাল প্রকল্পের মাধ্যমে, উনার অবসর গ্রহণের সাথে সাথে যার ইতি ঘটেছে।
কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার এক সহপাঠী বন্ধু ছিলো যার নাম খন্দকার মোসাদ্দেক আল মামুন। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালেই সে তাদের কুড়িগ্রামের পৈত্রিক জমিতে একটি সমন্বিত কৃষি খামার গড়ে তোলার স্বপ্নের কথা আমাদেরকে শুনাতো। মায়ের নামে নামও তখনই ঠিক করে ফেলেছিলো “তনু সমন্বিত কৃষি খামার” সংক্ষেপে টিয়া ফার্ম”। সেসময় আমি নিজেও এটাকে পাগলামি বলে তেমন গুরুত্ব দেইনি। কিন্তু সে এতোটাই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলো যে, সত্যি সত্যি কৃষি বিষয়ে অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা দিয়েই খামারের কাজ শুরু করতে নেমে গেলো। কিন্তু বাধ সাধলো তার পরিবার। ক্যাডেট কলে পড়ুয়া যে ছেলের সেনা কর্মকর্তা কিংবা ডাক্তার—ঞ্জিনিয়ার হওয়ার কথা সে যদি কৃষক হতে চায় সেটা এদেশের কোন পরিবারের মেনে নেওয়ার কথা নয়। তবুও তার ইষ্পাতকঠিন পণ আর তার কৃষিপ্রেমি জেলার বড় ভাইয়ের সমর্থনে পরিবারের মতের বিরূদ্ধে গিয়ে উক্ত খামার গড়ে তোলার কঠিন সংগ্রামে আত্মনিয়োগ করেছিলো। তবে পারিবারিক জমিতে তাকে নামতে দেওয়া হয়নি। ধরলার চরে পানির দামে বড় ভাইয়ের কিনে দেওয়া কয়েক বিঘা জমিতেই তাকে খামারটা শুরু করতে হয়েছিলো।
ওদিকে আমিও তখন নিজের ক্যারিয়ারের কথা ভুলে স্থায়িত্বশীল কৃষি নিয়ে কাজ করার প্রত্যয়ে উন্নয়ন ধারা নামের এক অখ্যাত তৃণমূল সংস্থায় এক পাগলামি কর্ম শুরু করে দিয়েছিলাম। অনেকদিন আমাদের মধ্যে তেমন কোন যোগাযোগ ছিলোনা। শুধু জানতাম যে, সে খামারের কাজ করছে। বছর দশেক পর আমি আমার কাজের অংশ হিসেবে সারা বাংলাদেশ থেকে স্থায়িত্বশীল কৃষি ও জীবনযাত্রার সফলতার গল্প নিয়ে “স্থায়িত্বশীল জীবন জীবিকার সন্ধানে” শীর্ষক একটি কেইস স্টাডির কাজে হাত দিয়েছি। তখন মনে হলো, মামুনের খামারের উপর একটা কেইস স্টাডি করি। সেই কাজের সূত্রে মামুনের খামার পরিদর্শনে গিয়ে এক ঝলক আলোক রশ্মির মতো স্থায়িত্বশীল কৃষির একটি ভবিষ্যত রূপরেখা দেখে অভাবনীয় অভিভূত এবং আশান্বিত হয়েছিলাম। আমি ওর খামারের ওপর একটি কেইস স্টাডি করেছিলাম যা বাংলা ও ইংরেজিতে “স্থায়িত্বশীল জীবন-জীবিকার সন্ধানে” শীর্ষক পুস্তক আকারে অন্য অনেকগুলো কেইস স্টাডির সাথে বাংলা ও ইংরেজিতে উন্নয়ন ধারা কর্তৃক প্রকাশিত হয়েছিলো। যদিও মামুনের খামারটা সম্পূর্ণ জৈব খামার ছিলো না, তবে মামুনের সঙ্গে পরিকল্পনা করেছিলাম এবং সেও একমত হয়েছিলো যে, এটাকে এটাকে একটি সমন্বিত জৈব খামারে রূপান্তরিত করা হবে। কাজও এগোচ্ছিল। খামারটাকে আমার স্বপ্নের সমন্বিত জৈব খামারে রূপান্তরিত করতে করণীয়গুলো চিহ্নিত করেছিলাম। আমাদের তৎকালীন দাতা সংস্থা “ব্রেড ফর দ্য ওয়ার্ড”-এর প্রতিনিদিদের সাথে এই খামারের ওপর আমার পিএইচডি গবেষণার ব্যাপারে প্রাথমিক আলাপও শুরু করেছিলাম।
ভেবে দেখলাম, আমার পিএইডি গবেষণার গাইড হওয়ার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তিটি হচ্ছেন ড. আলতাফ হোসেন স্যার। সেই সূত্রে গেলাম বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু বিধিবাম! আমার যখন এমন চিন্তা মাথায় এলো, দূর্ভাগ্যজনকভাবে ততদিনে আলতাফ স্যার “খামারকুঞ্জ” প্রকল্প শেষ করে অবসরে চলে গেছেন। উনার অবসরে যাওয়ার হতাশাজনক সংবাদটা শুনে অত্যন্ত হতোদ্দম হয়ে পড়লাম। তবুও উনার সাথে দেখা করতে গেলাম উনার কেওয়াটখালির বাসায়। স্যার তখন আক্ষেপ করে বলেছিলেন, “আমি গবেষণায় প্রমাণ করে দেখিয়েছি যে, সমন্বিত খামার ব্যবস্থা মনোকালচার থেকে অনেক বেশি লাভজনক। কিন্তু সরকার এই গবেষণা থেকে শুধু সামান্য একটু অংশ নিয়ে ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্প নিয়েছে।” এই প্রকল্পের ফলাফল এখন সবারই জানা।
তবুও আশা ছাড়িনি। আমার পিএইচডি গবেষণার বিকল্প গাইড খুজতে থাকলাম। আমাদের শহীদ নাজমূল আহসান হলের বড় ভাই, বঙ্গবন্ধু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. তোফাজ্জল ইসলাম (শাহীন) ভাইয়ের সাথে কথা বললাম। কিন্তু শাহীন ভাই-এর গবেষণার ক্ষেত্র ছিলো আমার বিষয় থেকে অনেক ভিন্ন। তিনি তখন গমের ব্লাস্ট রোগ এবং বায়োটেকনোলজি নিয়ে গবেষণায় ভীষণ ব্যস্ত। তবুও উনাকে কিংবা বিকল্প কাউকে নিয়ে এগুতে মনস্থ করলাম। যেহেতু সমন্বিত খামারের অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা গবেষণার একটি প্রধান বিষয় হতো তাই কো-গাইড হিসেবে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক বড় ভাই কৃষি অর্থনীতি ও গ্রামীন সমাজবিজ্ঞান অনুষদের অধ্যাপক ড. জাহাঙ্গীর আলম (মুকুল) ভাই-এর সাথে কথা বললাম। উনি বললেন কেইস স্টাডি আকারেও পিএইডি গবেষণা হতে পারে। আমি শুনে অনেক আশান্বিত হলাম। কিন্তু আবারও বিধিবাম! বিনা মেঘে বজ্রাঘাতের মতো হঠাৎ জানতে পারলাম যে, মামুনের বড় ভাই যার জমিতে মানুষ খামারটা শুরু করেছিলো সেখান থেকে কোন এক অজ্ঞাত কারণে মামুনকে সরিয়ে দিয়ে উনি নিজে খামারের দ্বায়িত্ব নিয়ে নিয়েছে। যাহোক, সে এক লম্বা কাহিনি—অন্যত্র বলা যাবে।
বিকল্প ভাবতে থাকলাম। অনেক ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে, আমাদের গ্রামের বাড়ির বৃহৎ পরিবারের যে জমিজমা আছে, যাদের প্রায় সবাই অনুপস্থিত কৃষক, তাদের খণ্ড খণ্ড জমি একত্রিত করে সেখানেই একটি সমন্বিত খামার গড়ে তুলব। পরিবারের সবার সঙ্গে মিটিং হলো। সবাই একবাক্যে রাজিও হলো। আমিও পূর্ণোদ্যমে কাজে নেমে পড়লাম। কিন্তু আবারও বিনা মেঘে বজ্রপাতের মত মুনাফেকি করে বসলো এক চাচাতো ভাই। তার দলে আরও কয়েকজনকে ভিড়িয়ে শুরু করল গ্রাম্য রাজনীতি। চুক্তি সাক্ষরের দিন মত পাল্টে ফেললো। তবুও হাল না ছেড়ে আমার রক্তের সম্পর্কের মানুষদের নিয়েই প্ল্যান–বি নিয়ে এগুলাম। কিন্তু বিপর্যয় নিয়ে এলো করোনা মহামারি। আরও কিছু বাস্তবিক সমস্যা ছিল। খামার বন্ধ করে দিয়ে জীবিকার তাগিদে আবারও ফিরে যেতে হলো এনজিওর কাজে।
যাহোক, আবারও আস্তে আস্তে পুরোনো কাজে ফিরছি। পুরোনো মানুষদের সঙ্গে দেখা হচ্ছে, কথা হচ্ছে। লেখক-গবেষক আলতাফ পারভেজ ভাই ও নাগরিক উদ্যোগের কর্ণধার জাকির হোসেন ভাইয়ের অনুরোধে ২১ ‍ডিসেম্বর ২০২৪, কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে এক সেমিনারে এমন কিছু পুরোনো মানুষদের সঙ্গে দেখা হলো। সেমিনারের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনায় পুরোনো সেই কথাগুলোই নতুন করে আবার বলার চেষ্টা করেছি যে কথা খুব বেশি মানুষ শুনতে চায় না। সবাই চায় কড়কড়ে টাকা আর চকচকে উন্নয়ন। একই দিনে তুলা উন্নয়ন বোর্ড মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত একই ধরনের আরেকটি প্রোগ্রামে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানী ড. নাজিম উদ্দিন ভাই আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। বাংলাদেশে সম্ভবত তিনিই একমাত্র কৃষিবিজ্ঞানী যিনি জৈব কৃষি নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কাজ করছেন। উনার সাথে আমার বেশকিছু কাজের অভিজ্ঞতা হয়েছে। দুই প্রোগ্রাম একই দিনে হওয়ায় ওটাতেও একটু ডু মেরেছিলাম। ওখানেও অনেক পুরোনো মানুষের সঙ্গে দেখা হলো। কথায় কাজ কিছু হউক বা না হউক, কথাগুলো যে জারি আছে এতটুকুনই আশার কথা।
পাচই আগস্ট ২০২৪ তারিখে দেশে এক দারুণ আশাব্যঞ্জক অভ্যুত্থান ঘটে গেছে। দেশি-বিদেশি কর্পোরেট স্বার্থের শৃঙ্খল থেকে বেরিয়ে শ্রেফ দেশ ও জনগণের স্বার্থ সংরক্ষণের নতুন এক রাজনৈতিক বন্দোবস্ত গড়ে ওঠার প্রচুর সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। অবশ্য এর সঙ্গে ছায়ার মতো হাঁটছে হতাশাও। যেমন, আমার জন্য সবচেয়ে হতাশার ব্যাপার হচ্ছে—দেশের কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তা যে মারাত্মক হুমকির মুখে, তা নিয়ে ড. ইউনুস সরকারের কোনো মাথাব্যথা দেখা যাচ্ছে না। দেশের প্রায় অর্ধেক শ্রমশক্তি যে খাতে নিয়োজিত, সে খাতটি হাজারো সমস্যা ও সংকটে জর্জরিত। দেশের ১ কোটি ৬৯ লাখ ক্ষুদ্র কৃষক পরিবার, ৭২ লাখ ৮৭ হাজার ভূমিহীন পরিবার এবং ৯২ লাখ কৃষিশ্রমিক পরিবারের কথা এই সরকারের ভাবনায় আছে বলে মনে হয় না। কৃষকেরা গ্রামে থেকে গাধার মতো খেটে শহরে খাবার পাঠায়, আর শহুরে কর্তাগণ কতকিছু নিয়ে ভাবেন—কৃষকদের নিয়ে ভাবনার ফুরসত কই!
বাস্তবতা হলো গ্রামে থেকে আন্দোলন করা যায় না, করলেও তা পাত্তা না দিলেও চলে। তাই কৃষকেরা কখনও তাদের দাবীদাওয়া নিয়ে মাঠে নামেন না। তাছাড়া, কৃষকেরা কোনো সংগঠিত শক্তি নয়। বিচ্ছিন্ন কৃষক সংখ্যায় যতই বেশি হউক না কেন তারা শক্তিহীন, ক্ষমতাহীন। আর এটাতো সবার জানা, দুনিয়াটা শক্তের ভক্ত, নরমের যম।
ময়মনসিংহ ।। ২২/১২/২৪

আলু-পেঁয়াজ-চাষীর ঈদ

আলু-পেঁয়াজ-চাষীর ঈদ

দিকে দিকে শুনি ঈদের সাজ সাজ রব,
বাজারে, শপিং মলে মানুষের উপচে-পড়া ভিড়।
প্রিয় জিনিসটি কিনবে বলে ছুটছে সবাই ঊর্ধ্বশ্বাসে,
আড়ং-এর আড়ংবাজি নিয়ে তোলপাড় নেটদুনিয়া।

পত্রিকার পাতাজুড়ে শুধুই ঈদের খবর,
নাড়ির টানে জীবন হাতে ঘরমুখো মানুষের মিছিল।
ভবনে ভবনে আলোসজ্জা, চারদিকে পটকার শব্দ—
আজ ঈদ, বাংলার ঘরে ঘরে উৎসবের আমেজ।

কিন্তু কেমন কাটল লাখো আলুচাষীর ঈদ
কিংবা সেইসব হতভাগ্য পেঁয়াজচাষীর?
যাদের পরিবার বুকভরা আশা নিয়ে ভেবেছিল—
আলু বেচে, পেঁয়াজ বেচে এবার হবে নতুন শাড়ি, লুঙ্গি, জামা;
ঘি-ভাত না হোক, অন্তত জুটবে সেমাই-চিনি,
আর হাঁড়িতে উঠবে একটুখানি মাংসের ঝোল।

কেমন হলো আজ তাদের ঈদ?
জুটল কি নতুন জামা, একটু ভালো খাবার?
চাষীর ঘরের ছোট্ট শিশুটির মনে
জেগেছে কি ঈদের খুশির হিল্লোল?
সে কি নতুন সাজে, চকচকে চোখে,
হেসে-খেলে দল বেধে গিয়েছে ঈদগাহে?

আমি নিশ্চিত জানি—
‘সবই কপালের লিখন’ মনে মনে বলে
কাকভোরে উঠে গোয়ালঘর ঝাড় দিয়েছে সে।
পাশের খালের নোংরা হাঁটুজলে সেরে নিয়েছে স্নান,
নুন-লংকা দিয়ে পান্তাভাত মুখে তুলে
পুরোনো লুঙ্গি, আধছেঁড়া জামা
যা ছিল ঘরে, তাই গায়ে এঁটে
ছুটে গেছে ঈদগাহে—
সৃষ্টিকর্তার শুকরিয়া আদায় করতে।

এটাও নিশ্চিত জানি, সেই চাষীবউ
কাকভোরে উঠে ঘরদোর দিয়েছে ঝাড়,
গরু-ছাগল-কুঁকড়োগুলোকে খাইয়ে
বসে গেছে উনুনের ধারে।
হয়তো হাঁড়িতে নেই তেমন কিছুই,
তবু সন্তানের মুখের দিকে চেয়ে
চোখের জল গোপন করে জ্বালিয়েছে আগুন।
হয়তো একমুঠো চাল, একটু ডাল,
অথবা শাকপাতা দিয়ে
ঈদের দিনের রান্না সাজিয়েছে কোনোমতে।

হয়তো সেই চাষী ঈদগাহ থেকে ফিরে
চুপচাপ উঠোনের এক কোণে বসে
আবার কষেছে বেচে থাকার হিসেব-নিকেষ
আবার বুনেছে নতুন কোন ফসলের স্বপ্ন
হয়তো সন্তানের মাথায় হাত রেখে বলেছে –
“মন খারাপ করিস না, বাপ,
আগামী বছর আল্লাহ নিশ্চয় ভালো করবেন।”

এই আশাতেই বেঁচে থাকে চাষী,
এই আশাতেই কেটে যায় তার ঈদ,
এই আশাতেই বাংলার মাটি আজও
শস্যে শস্যে ভরে ওঠে।

তবু প্রশ্ন থেকে যায়—
যে মানুষটা সবার মুখে অন্ন তুলে দেয়,
তার ঘরেই কেন উৎসবের দিনে
এত অভাব, এত হাহাকার?
যে চাষীর ঘামে বাঁচে দেশ,
তার ঈদ কেন আজও
শুকনো পান্তা, আধছেঁড়া জামা
আর নীরব কান্নার ঈদ হয়ে থাকে?

ক্ষমতা ও দখলের রাজনীতি

ক্ষমতা ও দখলের রাজনীতি

ক্ষমতা আর দখলের মধ্যে… দারুণ সখ্যতা
যেমন মানিকজোড় সখ্যতা দেখি
উঠতি কিশোরী সখীদের মাঝে।

একবার ক্ষমতার দখল পেলেই—
সবকিছু দখল করা যায়… অবলীলায়!
দখলে আসে খাস জমি, জলাশয়
নামমাত্র মূল্যে মিলে রাজউকের লোভনীয় প্লট…
যেগুলো পাওয়ার কথা ছিলো বঞ্চিত যারা
যারাই এগুলোর সত্যিকার মালিক।

একবার ক্ষমতার দখল পেলেই—
দখল করা যায় নদী-নালা-খাল-বিল-পুকুর,
খেলার মাঠ, রাস্তাঘাট, রেলের জমি, শ্মশান ঘাট।
বাজার-হাট, টার্মিনাল, অটো-ট্যাম্পু-স্ট্যান্ড,
কিংবা ভোলাগঞ্জের সাদা পাথর।

একবার ক্ষমতা দখল করা গেলেই—
দখল করা যায় রাষ্ট্রের সবকিছু!
ইউনিয়ন কাউন্সিল থেকে সচিবালয়,
বঙ্গভবন, গণভবন, নিম্ন বা উচ্চ আদালত!
সুপ্রিম কোর্ট থেকে দুদক, পিএসসি,
এটর্নি অফিস থেকে অডিট অফিস—সব!!!

একবার ক্ষমতা দখল করা গেলেই—
দখল করা যায় ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে
ব্যাংক-বীমাসহ সকল আর্থিক প্রতিষ্ঠান।
এবং দেশের ছোটবড় সব টেন্ডার, ইজারা।
মাটি, আকাশ, বাতাস, সাগর, পাহাড়…
এমনকি আমজনতার মগজ অবধি!

এমন লোভনীয় যে দখলের রাজনীতি—
কে না চায়… এই ক্ষমতার তেলেসমাতি!
————————

ময়মনসিংহ ।। ১৬.৮.২৫

জীবনের দুর্গম পথে

জীবনের দুর্গম পথে

এই জগত সংসারে
মানবের তরে রয়েছে দু’টি পথ
একটা সত্যের আরেকটা অসত্যের।
হয়তোবা তাও নয় কারণ,
আদতে সত্যটা বড্ড আপেক্ষিক
নির্জলা সত্য খুঁজে মেলা ভার।

এ যেন বহুলকথিত পুলসিরাত!
তুমি কী যুধিষ্ঠির হতে চাও
সেতো কল্পকথার সৃষ্টি
অথচ বাস্তবে তা হতে গেলে
অনুক্ষণ মৃত্যুভয় বুকে নিয়ে
তীক্ষ্ণধার ছুরির উপর পথচলা!

তলদেশে গভীর গহীন অন্ধকার
পদে পদে রক্তাক্ত পদযুগল
মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে
কখনো যদি এগুবে এতটুকু
থেমে যাবে, পড়ে যাবে মুখ থুবরে
ভারসাম্য ধরে রেখে
বড্ড কঠিন এই পথচলা।

জীবন এমনি কন্টক শয্যাময়
পদে পদে বিপদ, শংকা আর ভয়।
তাই, বাঁচিতে চাহিনা এই কুৎসিত ভুবনে
সকলের আগে আমি মরিবারে চাই
এই কন্টক বনে এই নরকভূমে
একদন্ড আর বাচার সাধ নাই।
—————————–
ময়মনসিংহ ।। ২৫.১২.২০১৯

কোন গ্রামে এক সন্ধ্যায়

কোন গ্রামে এক সন্ধ্যায়

ইট-কাঠ-পাথরের খাচা ছেড়ে
একদিন এক গ্রামে
একটুখানি প্রকৃতির পরশে
পাখির কুজন ছাড়া নিস্তব্ধ সন্ধ্যায়
দূর থেকে ভেসে আসে মানুষের কন্ঠস্বর।

এখন তাদের অবকাশ কাল চলছে
তাই চাস্টলে আড্ডাবাজিতে ব্যস্ত সবাই
টেলিভিশনে চলছে নাটক-সিনেমা হরদম
সাথে দেশ-বিদেশের খবর
আর যত রাজা উজির মারার গল্প।

এঁরা সব আমজনতা
অধিকাংশই কৃষক অথবা
কৃষি শ্রমিক, অটো-ভ্যান চালক কিংবা
কৃষকের সহযোগী কোন পেশার মানুষ।
ওঁরা জানেনা, শহুরে কোন ফটকাবাজ এসে
গ্রামে গ্রামে তাদের এজেন্ট তৈরি করে
কৃষকের পকেট কাটার ফন্দি আঁটে।

এই এজেন্টদের গডফাদারূপে আছে
ছোট-বড় তথাকথিত জনপ্রতিনিধি
আছে হোন্ডা-গুন্ডা-অস্ত্র, অঢেল অর্থকড়ি
যাদের পকেটে থাকে ক্ষমতার উৎস পুলিশ-প্রশাসন।

কখনো সুষ্ঠু ভোট হলে ওরাই দেয় বাক্স ভরে
অথবা কখনো ভোট না দিলেও সমস্যা হয়না কোন
ওদের মনভোলানো বয়ান বিশ্বাস করে
ওদের শেখানো মুখরোচক শ্লোগানে
মুখরিত করে তুলে আকাশ বাতাস।
————–
নকলা ।। ১৫.০২.২০২৫