একুশ শতকের গ্রাম

একুশ শতকের গ্রাম

আমাদের ছোট গাঁয়ে ছোট-বড় ঘর,
কেহ রয় কুড়েঘরে, কেহ দালানের ভিতর।

মিলেমিশে থাকে না কেউ, বাড়িতেছে অমিল,
একে অপরের ভয়ে দুয়ারে দেয় খিল।

খেলার বয়সী শিশু খেলিতে না পায়,
প্রভাতে উঠিয়া সব কোচিংয়েতে যায়।

আমাদের গ্রামটি যেন বিমাতা সমান,
সবাই মিলে তিলে তিলে বধিছে তার প্রাণ।

মাঠে মাঠে ইটভাটা, ফসলজমিতে বিষ,
কীট, পাখি, প্রজাপতি—মরিছে সব নিঃশেষ।

খাল-বিল, নদী-নালা শুকায়ে জলহীন,
পাবদা, শোল, টেংরা, পুটি হইয়াছে বিলীন।

শাইল, বিন্নী, কুমড়ি, বালাম হারাইলো কবে,
মাঠ ভরিল হাইব্রিড ধানে অধিক ফলনের লোভে।

আম, জাম, বট নেই, নেই বাঁশঝাড়,
টাকার গাছের লোভে সব কাটিয়া সাবাড়।

বিজলীতে গেছে দূরে অমাবস্যার রাতি,
এখন আর দেখা যায় না জোনাকির বাতি।

আজও সকালে সোনার রবি পূব দিকেই উঠে,
নাহি ডাকে পাখি আর, নাহি ফুল ফোটে।
…………
ঝিনাইদহ। ২৪.০১.২০১৭

এলোমেলো জীবন

এলোমেলো জীবন

জীবনটা কেন এমন এলোমেলো?
কালবোশেখির সাইক্লোন কিংবা
সামান্য বাউড়ি বাতাসেই নুয়ে পড়ে।

সুন্দর, পরিপাটি জীবন কি হয় কখনো?
হাসি-আনন্দে ভরা, শুধুই আলোকময়?

চারপাশে দেখি কত রঙিন জীবন,
ঝলমলে, নয়নভোলা,
বাহারি আলোর ঝাড়বাতির মতো।

যা দেখা যায়, সেটাই কি সত্য সবসময়?
ভিতর আর বাহির কি এক হয়?

কন্টকময়, সর্পিল, বন্ধুর জীবনের পথ—
এই জীবনটার তরে আমরা বাঁচি আমরণ,
কত লড়াই, কত সংগ্রাম বুকে নিয়ে।

এই তো জীবন—
বড্ড এলোমেলো।

———
ঝিনাইদহ; ৩০/৬/১৮

নিত্য দূর্ভাবনায় বসবাস

নিত্য দূর্ভাবনায় বসবাস

ভাল্লাগেনা কোনো কিছু
দুর্ভাগ্য ছাড়ে না যে পিছু,
বড্ড জটিল এই সংসার।

যখনই দেখি ক্ষীণ আলো,
ঘনিয়ে আসে আধার কালো,
জাপটে ধরে চারিধার।

কী করিব বিমূঢ় আমি,
দূরভাবনায় কাটে দিবাযামী,
পাই না খুঁজে কূল-কিনার।

খুঁজে ফিরি তীরের দেখা,
অথৈ সাগরে একা একা,
নিয়ে ভয় তলিয়ে যাওয়ার।
—————
ঝিনাইদহ; ২৬.০৬.২০১৮

বহুরূপি জীবন-আকাশ

বহুরূপি জীবন-আকাশ

জীবনটা যেন আকাশের মতো
দুচোখের সীমানাজুড়ে অসীম শূন্যতা,
ক্ষণে ক্ষণে বদলায় রং, রূপ।

গোধূলিবেলায় স্বর্ণালী মেঘসন্ধ্যায়
রাঙা আভায় ঝলকানো চারিধার,
জুড়ায় নয়ন, নেচে ওঠে মন।

কখনো সুনীল জমিনে
থরে থরে সাজানো তারার বাগান,
কখনো বা বসে হেথা চাঁদের হাট,
ভেসে বেড়ায় সাদা মেঘের ভেলা।

কখনো ছেয়ে যায় কাজলকালো মেঘে,
ঝড়-ঝঞ্ঝা, কালবৈশাখী তছনছ করে সব,
একে একে নিভে যায় সব আলো,
নিকষ কালো আধারে ঘিরে ধরে চারিধার।

এমনি বহুরূপী জীবন-আকাশ,
সেই আকাশেই মানবের চির পথচলা।
———————
ঢাকা, ২৪.৫.২০১৮

দুঃসময়ের ভাবনা

দুঃসময়ের ভাবনা

মাঝে মাঝে যেন পাই মরণের আলিঙ্গন,
মনে হয়, এই বুঝি সব শেষ।
হতাশার শকুনেরা ঘিরে ধরে চারিধার।
কিছুই হলো না করা, যা কিছু করার ছিল;
কিছুই হলো না বলা, যা কিছু বলার ছিল।

চাইনি তো আমি খুব বেশি কিছু,
সবাই যা চায়, ছুটে নিরন্তর যার পিছু,
চাইনি তো কভু তেমন কিছু।
শুধু দুচোখ জুড়ে স্বপ্ন ছিল—
রেখে দিয়ে যাব খানিক পদচিহ্ন
পৃথিবীর বুকে, যাতে অনাদিকালের মানুষ
হয়তো একটু কৌতূহল ভরে জিজ্ঞাসিবে,
“এ কাহার পথচলা, কে সেই পথিক!”

গুরুর কথা শিরোধার্য মেনে
এই কণ্টকাকীর্ণ ধরণীর পথ হতে
দু-একটি কাঁটা দূর করে দিয়ে ছুটি নেব—
এর চেয়ে বেশি কিছু চাইনি তো কভু।

তবু ক্ষমা করো, প্রভু,
ভুল যদি করে থাকি কিছু,
যদি এই চাওয়া হয় খুব বেশি কিছু।
পাই কি বা না পাই কিছু, এই জীবনরথে
সবাই যে যাবে, যেতে হবে একই পথে।
—————
হাসান ক্লিনিক, ঝিনাইদহ ।। ১২.৫.১৮

উৎসবের ধর্ম

উৎসবের ধর্ম

বাংলা নববর্ষ কি আমাদের?
হিন্দুর, না মুসলিমের?
মঙ্গল শোভাযাত্রা কার উৎসব?
এই বাদানুবাদ চলছে অবিরাম।
বিভক্ত জাতির বিভক্তির দেয়াল
দৃঢ় থেকে হচ্ছে দৃঢ়তর।
বাড়ছে হিংসা-বিদ্বেষ, জঙ্গিপনা,
মনে নিয়ে ভয়-ভীতি অনুক্ষণ—
কিসের উৎসব তবে?

বারো মাসে তেরো পার্বণের দেশে
কোন উৎসবটা মুসলমানের?
কোনটা হিন্দুর, বৌদ্ধের বা খ্রিস্টানের?
কোনটা নিখাদ ধর্মীয়, কোনটা বা সকলের?

বহমান কালের ধারায়
উৎসবে মিশেছে ধর্মাচার,
উৎসব আর ধর্ম মিলেমিশে একাকার
হয়ে গেছে প্রশ্নহীনভাবে।

উৎসবের কি ধর্ম আছে কোনো,
নিরেট আনন্দ দান ছাড়া?
আমাদের বহু পরিচয়, বহু বিশ্বাস
মিলেমিশে যায় উৎসবে—
কেন আজ এত প্রশ্ন তবে?

চৈত্রসংক্রান্তি, নববর্ষ,
পৌষ-পার্বণ, নবান্ন,
জারি-সারি-ভাটিয়ালি, পালাপার্বণ,
নাচ-গান, যাত্রাপালা কিংবা
হালের ব্যান্ডসংগীত, নাটক, চলচ্চিত্র—
কোনটা মুসলমানের জন্য?
কোনটা হিন্দুর, কোনটা বা অন্যের?

তবে হ্যাঁ, প্রশ্ন যখন উঠেছে আজ,
উৎসবের রূপ, রং, সাজ
ধর্মীয় প্রভাবমুক্ত হয়ে
সার্বজনীন হয়ে উঠুক;
নির্মল আনন্দের উৎস হোক,
যা এ অস্থির, বিষময় সমাজে
সুস্থতার সঙ্গে বেঁচে থাকার জন্য
বড্ড বেশি প্রয়োজন।
———
ঝিনাইদহ
০১ বৈশাখ ১৪২৫